নিজের মুখোমুখি সংলাপ : মুসলিম সভ্যতার শ্রেষ্ঠ পাঁচ আত্নজীবনী

নিজের মুখোমুখি সংলাপ : মুসলিম সভ্যতার শ্রেষ্ঠ পাঁচ আত্নজীবনী

মুজাহিদুল ইসলাম :

ইবনে বুলুক্কিনের আত্মজীবনী

এগারোশ শতাব্দীর গ্রানাডায় উমাইয়া শাসনের পতনের আগে ক্ষমতায় আসে তায়েফী সম্প্রদায়ের আব্দুল্লাহ ইবনে বুলুক্কিন নামের এক যুবক। শাহী মহলে রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষার আগাগোড়াসহ ইউসুফ বিন তাশফীনের হাতে গ্রানাডার পতন ও সদাচারের সবকিছু তুলে এনেছেন নিজের আত্মজীবনীতে। সে সময়ের বিশ্বশিক্ষাকেন্দ্র স্পেনের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলিত রীতি অনুসারে প্রাইমারী সম্পন্ন করা ছাড়া কিভাবে রাজকীয় পরিবার তাকে জগত সম্পর্কে ধারণা দিয়েছে , তিনি তা তুলে ধরে বলেন, ‘তার দাদা তাকে প্রাইমারী হতে বের করে এনে বলেন, ‘যতটুকু লেখা ও কুরআন পড়েছো, তোমার জন্য যথেষ্ঠ। বর্তমান ফেতনার সময় আমার রাজ্যে যা হচ্ছে এবং আমার থেকে যা শিখতে পারো তোমার মাথায় সব জমা করতে থাকো। কারণ, সময়টা এখন খুবই বাজে আর রাজাবাদশারা তাদের সন্তানদের সবকিছু শিক্ষা দিবে, সে সময়ও কম।’

পলাশী থেকে নিয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনগণের বিরাগভাজন হওয়া সত্ত্বেও শত্রু শক্তির ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ক্ষমতার বাগডোর ধরে রাখার নীতি সেকালেও ছিল, যা স্বীকার না করলেও ইবনে বুলুক্কিনের আত্মজীবনী থেকে বেরিয়ে আসে। ক্ষমতা ধরে রাখতে পাশের খৃস্টান রাজা থেকে সহযোগিতা গ্রহণ করা, ইউসুফ বিন তাশফীনের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং খ্রিস্টানদের নিকট ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াকে তিনি শ্রেয় মনে করতেন বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো কোন মুসলিমের হাতে গ্রানাডা ছেড়ে দিব না।’

তবে এই ইউসুফ বিন তাশফীনের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তার থেকে পাওয়া আনুকূল্য ও নিরাপত্তার কথা তিনি নিজেই স্বীকার করে বলেছেন, ‘তিনি আমাদেরকে আগমাতে বসবাস করার নির্দেশ দিলেন। আমরা মুসলিম আমির থেকে সর্বোত্তম আচরণ পেয়েছি, আমরা তাকে আল্লাহর পরে মানুষের মধ্যে আমাদের প্রতি সবচে দয়ার্দ্র পেয়েছি।’ ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর চরম দরিদ্র অবস্থার কথা বড্ড করুণ সুরে বলেন, ‘আমাদের পরিধেয় কাপড় বিক্রি করাটাই আমাদের সবচে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।’

জীবনের শেষ সময়ে নির্বাসনভূমিতে হতাশার শিকার না হয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেব আগমাতে জ্ঞানার্জন ও মদ্যপান ছেড়ে দ্বীনের পথে অগ্রসর হওয়াকেই একমাত্র পুঁজি বানিয়ে দুনিয়া ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হন। তিনি বলেন, ‘পূর্বজীবনের স্বরণ আমার হতাশা আর কষ্টকে হ্রাস করার পরিবর্তে শুধু বাড়িয়ে তুলবে। আমাদের প্রদেয় মাসিক ভাতা ছাড়া আর কোন আশা নেই, এখন শুধু আশা, পরপারের জন্য নেক আমল, যা আযাত হতে রক্ষা করবে এবং সাওয়াবের ব্যবস্থা করবে।’

উসামা বিন মুরশিদের আত্মজীবনী

অন্যদিকে বারোশত শতাব্দীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সেনা কমান্ডার বিখ্যাত ঘোড়ওসার উসামা বিন মুরশিদ তার লিখিত আত্মজীবনী ই’তেবার গ্রন্থে সে সময়ের সাধারণ চরিত্র সাহসিকতার এক উপখ্যান তুলে ধরেছেন। দেখিয়েছেন বাড়ির নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে দাস-দাসীরা পর্যন্ত সাহসিকতার কী চরম পরাকষ্ঠা দেখিয়েছে।

এ বইয়ের লেখক গল্পবীর উসামা জ্ঞান, সাহসিকতা এবং দ্বীনদারীতে ছিলেন অদ্বিতীয়। কুরআন লেখার জন্য তার পিতা কর্তৃক ভাইয়ের অনুকূলে রাজত্ব ত্যাগের নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত পেশ করেন। তার পিতা মারা যাওয়ার সময় তীরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ নিজ হাতে লেখা কুরআনের ৪৩টি নুসখাহ রেখে যান। উসামা বলেন, ‘তিনি চমৎকার হস্তাক্ষরে লিখতেন, অথচ তার হাতের ঐ আঘাত তাকে কোন প্রভাব ফেলতো না। তিনি কুরআন ছাড়া কিছু লিখতেন না, কুরআনের শেষে কুরআন সংশ্লিষ্ট নাসিখ-মানসুখ, কুরআনী গরীব-শায কিরাআত, শানে নুযুল ও ফিকহ বিভিন্ন ধরনের কালি দ্বারা “বড় তাফসীর” শিরোনামে লিখতেন।

আর সাহসিকতার গল্প তো এ পরিবারের সাধারণ চরিত্র। তাদের সন্তানদের বিনোদনই থাকতো সাপ ও সিংহ শিকার করা। তার জীবনে শত্রুর সাথে এমন কোন সাক্ষাৎ হয়নি, যেখানে তিনি পিছু হটেছেন। এক লড়াইয়ে তার পিতা তাকে বলেন, তোমার সাথে যারা আছে, তাদের নিয়ে শত্রুদের ওপর নিজেকে নিক্ষেপ করো।

তাদের এ সাহসিকতা বাড়ির নারীদেরও ছিল। উসামার কোন এক ফুফু তার চাচাতো ভাইকে বলেন, বাড়ির মহিলাদের সামনে পরাজিত হওয়ার ব্যপারে দ্বিতীয় বার চিন্তা করো।

উসামা সমসাময়িক সময়ের চিত্রায়নে কোন পক্ষপাত্বি করেননি। কোন এক খ্রিস্টান তাকে বলেন, ইংরেজদের চিকিৎসা ব্যবস্থা পশ্চাৎপদ। কিন্তু বিপরীতে তিনি তার ই’তিবার গ্রন্থে বলেন, ‘খ্রিস্টান কর্তৃক ইংরেজদের চিকিৎসার ব্যপারে পশ্চাৎপদতার অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়। আমি তাদের দাবির বিপরীত পেয়েছি। যারা ইংরেজদের অভিশাপ দেয়, অথচ তাদের পা ফুলে গেলে কোন ইংরেজ চিকিৎসক ছাড়া কেউ মুক্তি দিতে পারে না।’

বর্তমান সময়ে রোগীর কষ্ট লাঘবে পশ্চিমের কোথাও কোথাও দূরারোগ্য রোগীর কষ্ট দূরীকরণে ঔষধের মৃত্যুর আইনী অনুমোদন আছে। উসামার ই’তিবার গ্রন্থে কোন এক পোপের কৃতিত্বের কথা তুলে আনেন। তিনি লেখেন, এক পাদ্রী এক রোগীকে শ্বাসরুদ্ধ করে রাখেন, একপর্যায়ে সে মারা যায়। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন, সে কষ্ট পেত, এখন সে শান্তি পেল।

তাছাড়া শৈশব থেকে পশুপ্রেমী এ মানুষটি তার গ্রন্থে প্রাণীদের চরিত্র নিয়েও আলোচনায় বলেন, ‘সিংহের মধ্যে যা দেখেছি, তা আমি কল্পনাও করিনি। আমি মনে করি না, সিংহ মানুষের মতো। ওদের মধ্যে সাহসীও আছে, ভীরুও আছে।’

দীর্ঘ ৯৬ বছর জীবন পাওয়া এ বীর তার পাঠককে ক্রুসেডারদের অধীনে বায়তুল মুকাদ্দাসের চিত্র অঙ্কন করে দেখান।

ইবনুল আদীমের আত্মজীবনী

১৩ শতাব্দীর সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে জন্মগ্রহণকারী এ ক্ষণজন্মা পুরুষ প্রিয় বন্ধু তৎকালীন ইতিহাসবিদ ইয়াকুত হামাবীর অনুরোধে নিজ জীবনীর কিছু অংশ লিখে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তিনি তার নিজের জন্ম ও শিক্ষকের ভবিষ্যৎবাণী সত্য প্রতিপন্ন হওয়ার বিষয়ে বলেন, ‘আমি হিজরী ৫৮৮, জিলহজ মাসে জন্মগ্রহণ করি। সাত বছর বয়সে মকতবে শিক্ষকের সামনে আমাকে বসানো হয়। তিনি আমার সামনে শিশুদের মতো রেখা টানলেন, আমি কলম নিয়ে তিনি যেমন ‘বিসমি’ লিখলেন, আমিও লিখলাম। আমার লেখা শিক্ষকের লেখার মত হলে শিক্ষক মুগ্ধ হয়ে বললেন, এই ছেলে জীবিত থাকলে বিশ্বে তার থেকে বড় কোন লেখক থাকবে না।’

আবু শামাহের আত্মজীবনী

১৩ শতাব্দীর দামেশকের ইলমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই আলোক দিপাধারের আত্মজীবনীকে নুরুদ্দিন জঙ্গী ও সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর জীবনীর জন্য সবচে মৌলিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি তার জীবনীতে সম্বোধনের ক্ষেত্রে উত্তম পুরুষ ব্যবহার না করে তৃতীয় পুরুষ ব্যবহার করে সাহিত্যে নতুন ধারার প্রচলন করেন।

শৈশব থেকেই তিনি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব ও মনোযোগ দিতেন। তিনি বলেন, ‘কিতাব-পত্র পড়া ছাড়াও অল্প বয়সেই তিনি কুরআন মুখস্থ করতে শুরু করতে শুরু করেন। এমনকি তিনি কুরআনের হাফেজ হয়েছেন, পিতাকে জানানোর পরই তিনি জানতে পারেন।’

মায়ের কথা লিখতে গিয়ে তিনি বলেন, লেখকের মা শৈশবেই তাকে জানান, শৈশবে তিনি খুবই গুরুত্বের সাথে মকতবে যেতেন, অথচ অন্য বাচ্চারা যেতে অনাগ্রহী থাকতো। এতে তার পিতা বিস্মিত হলে তার মা স্বামীকে জানান, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই। আমি যখন তাকে গর্ভে ধারণ করি, স্বপ্নে দেখলাম, আকাশে পূর্ণ চাঁদ উঠেছে। আর আমি যেন চাঁদের সমান্তরাল কোন এক উঁচু মিনার হতে আযান দিচ্ছি। কোন এক স্বপ্ন ব্যখ্যাকারী জানান, তুমি এমন এক সন্তান জন্ম দিবে, পৃথিবী যার জ্ঞান ও কল্যাণের প্রতি ঋণী থাকবে।’

আব্দুল কাদিরের আত্মজীবনী

সপ্তদশ শতাব্দীর আব্দুল কাদির আরবের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। রাসূলের বংশধর। তার পিতা আরব থেকে ভারতের গুজরাটে আসেন। স্বাভাবিকভাবে তার আত্মজীবনীতে তার বর্ণনা ভঙ্গির মধ্যে উন্নাসিক ভাব মনেও হলেও আল্লাহ তাকে যে যোগ্যতা দিয়েছেন, তা প্রকাশে তাকে এ পন্থা অবলম্বন করতেই হতো।

তিনি তার নিজের নামকরণে পিতার স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার জন্মের প্রায় পনের দিন আগে বাবা স্বপ্নে আব্দুল কাদির জিলানীসহ কয়েকজন বুযুর্গকে দেখলেন। আব্দুল কাদির জিলানী আমার বাবার নিকট কিছু একটা চাচ্ছিলেন। তাই জন্মের পর বাবা আমার নাম আব্দুল কাদির রাখেন।’

কিতাব মুখস্থ করলে পিতা জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন শুনে শৈশবে কিতাব মুখস্থের বিষয়ে বলেন, ‘শুনতে পেলাম আমার পিতা বলেছেন, যে গাজালির ইহইয়ায়ে উলুমুদ্দিন মুখস্থ করবে, আমি আল্লাহর নিকট তার জান্নাতের নিশ্চয়তা দিবো। জান্নাতের লোভে আমি কিতাবটি মুখস্ত করেছি। সকল প্রশংসা আল্লাহর।’

নিজের মায়ের মৃত্যুর মুহুর্ত নিয়ে বলেন, ‘আমার মা শুক্রবার ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তার সর্বশেষ কথা ছিল, কালিমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’

চতুর্থ শতাব্দীর আত্তার, পঞ্চম শতাব্দীর আবু হাইয়্যান, ষষ্ঠ শতাব্দীর উমারাহ বিন আলী, সপ্তম শতাব্দীর আবু শামাহ, অষ্টম শতাব্দীর ইমাম যাহাবী, নবম শতাব্দীর ফাসী ও ইবনু হাজর, দশম শতাব্দীর সাখাবী, সুয়ুতী ও ইবনু তুলুন, একাদশ শতাব্দীর নাজমুদ্দিন গাজ্জী, দাদশ শতাব্দীর মুহাম্মাদ বিন মুসতাফা মুসিলী, এয়োদশ শতাব্দীর শাওকানী, আলুসী, লাকনাবী, চতুর্দশ শতাব্দীর মুহাম্মাদ আব্দুহ ও আহমাদ শাওকী, যিরিকলী, রশীদ রেজা, তাহা হুসাইনসহ অসংখ্য আত্মজীবনী মুসলিম সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

আত্মজীবনীর এ গল্প তো শেষ হবার নয়। ইসলামের ইতিহাসে তো প্রতি যুগে প্রতিটি জায়গায় অসংখ্য সফল ব্যক্তি রয়েছেন। তারা তাদের সব নির্যাস তুলে এনেছেন তাদের লেখনীতে। যা একজন অতীত পরিভ্রমণকারী মানুষকে নিয়ে যাবে সে যুগের পরিবেশ ও বাস্তবতায়, নিয়ে যাবে মানুষের অন্তরজগতে। উদ্বুদ্ধ করবে কিভাবে একজন মানুষ পথের আলো পায়।

আগের সংবাদইজতেমার আখেরি মোনাজাতের দিন বন্ধ থাকবে যেসব সড়ক
পরবর্তি সংবাদইজতেমায় বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে ভোগান্তি