‘ইজ্জতে নববী’ : হেফাজত আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের জবানে

‘ইজ্জতে নববী’ : হেফাজত আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের জবানে

মুসান্না মেহবুব :

মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা মুসলিমদের অন্তরে কতটা প্রগাঢ়ভাবে থাকতে হয়, তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধে অংশগ্রহণকারী তৌহিদি জনতা। রাজাকারদের বিচারের নামে নাস্তিক-মুরতাদ ব্লগারদের নেতৃত্বে শাহবাগের জমায়েত থেকে যখন ইসলাম-বিরোধী শ্লোগান উঠল, বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামসহ ধর্মপ্রাণ মানুষ আশ্চর্য হলেন—১৬ কোটি তৌহিদি জনতার বাংলাদেশে এ হচ্ছেটা কী!

নবিজিকে নিয়ে কটূক্তি, তাঁর অনুপম জীবন এবং জীবনাদর্শে কলঙ্কলেপনের হীন চেষ্টা, ব্যঙ্গ যদিও আরও কয়েক বছর আগ থেকে বিভিন্ন ব্লগে চর্চিত হয়ে আসছিল ঘৃণ্যভাবে, কিন্তু শাহবাগের জমায়েত থেকে যখন অফলাইনেও এর চর্চা শুরু হলো, সাধারণ জনতার মধ্যে তা তুমুলভাবে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে ৫ মের লংমার্চে অংশগ্রহণকারী আবদুল কাদির ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে সে-সময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলছিলেন, আমি তখনও ব্লগ ইন্টারনেট এসব কিছু ভালোভাবে জানতাম না, ব্লগে যে নবিজিকে নিয়ে এমন হীনতর আলাপ চলছে বাংলাদেশের মাটিতে বসে, কল্পনাও করিনি। শাহবাগে রাজাকারদের বিচারের দাবিতে ব্লগাররা যখন একত্রিত হলো, এবং ইসলামের নানা বিষয়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করল, তখন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় নবিজির শানে সেইসব নাস্তিক ব্লগারদের অব্যাহত কটূক্তির বিস্তারিত পড়ে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই।

আবদুল কাদির বলেন, আমি তখন থেকেই কামনা করছিলাম, এইসব নাস্তিক-মুরতাদদের হীন ধৃষ্টতা বন্ধে এবং তাদের ফাঁসির দাবিতে ওলামায়ে কেরাম জোরদার কোনো আন্দোলন গড়ে তুলুন। আলহামদুলিল্লাহ, হেফাজতে ইসলাম তখন গর্জে উঠেছিল। আমরা নবিজির শানে বেয়াদবির প্রতিবাদ জানাতে এবং নাস্তিক-মুরতাদ যারা নবিজিকে নিয়ে কটাক্ষ করে আসছে তাদের ফাঁসির দাবিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করি হেফাজতের সবগুলো কর্মসূচিতে।

৫ ই মে হেফাজতের অবরোধে মৌলভীবাজার থেকে এসে শাপলা চত্বরে শরিক হয়েছিলেন মাওলানা জিয়া উদ্দীন। শাপলার ভয়াবহ কালো রাতে তিনি গুলিবিদ্ধও হয়েছিলেন। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, নবিজির যে শান ও মান আল্লাহ তাআলা দান করেছেন দুনিয়া ও আখেরাতে, কোনো ধর্মবিদ্বেষী বা নাস্তিক-মুরতাদ কটূক্তি করে তার বিন্দুমাত্রও কমাতে পারবে না। কিন্তু নবিজির প্রতি প্রকৃত প্রতিটা মুসলমানের হৃদয়ে অন্যরকম এক ভালোবাসা প্রোথিত, তাই নবিজির শান নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে তাদের শরীরে আগুন ধরে যায়। নবিজির শানে নূন্যতম বেয়াদবিও কোনো মুসলমান সহ্য করতে পারে না। আর সহ্য করতে না পারাটাই ঈমানের দাবি। হেফাজতে ইসলামের আহ্বানে আমরা এ কারণেই জেগে উঠেছিলাম।

তিনি বলেন, এ দেশ মুসলমানদের, এখানকার সিংহভাগ নাগরিকের হৃদয়ের সিংহাসনে সমাসীন নবিয়ে মুস্তফা হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। নবিজিকে কটাক্ষ করা মানে এ সমস্ত নাগরিকের হৃদয়ে কুঠারাঘাত করা। গুটিকয়েক ইসলাম-বিদ্বেষী সিংহভাগ মুসলমানের দেশে বসে লাগাতার এমন কুঠারাঘাত করেই যাবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো ছিল না। তাই আমরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে নেমে এসেছিলাম রাজপথে।

নিজের গুলিবিদ্ধ হবার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মাওলানা জিয়া বলেন, এটা আমার জীবনের পরম সৌভাগ্য হিসেবেই আমি জ্ঞান করি। নবিজির শত্রুদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে গুলিবিদ্ধ হয়েছি, রক্ত ঝরাতে পেরেছি, এটা ভাবলে আমি তৃপ্তি বোধ করি। নবিজির জন্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে যদি জীবনটাও যদি চলে যেত, কোনো পরোয়া ছিল না। বরং এ আমার আরও বড় সৌভাগ্য এবং নাজাতের ওসিলা হতো।

নবিজির প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনে নিজেকে কুরবান করার অভিপ্রায় নিয়ে এমন আরও অসংখ্য নবিপ্রেমিক সেদিন ছিলেন শাপলার সেই ঐতিহাসিক জমায়েতে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাওলানা নাঈম এমনই একজন বেপরোয়া নবিপ্রেমিকের গল্প বলেছেন ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের কাছে। হেফাজতের অবরোধের সময় তিনি রাজধানীর মাদানীনগর মাদরাসায় পড়তেন। অবরোধের রাতে মাদানীনগর মাদরাসার ছাত্রদের একটি গ্রুপের দায়িত্ব ছিল ইত্তেফাক মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেডে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায়। তওহিদি জনতা উত্তেজিত হয়ে যাতে পুলিশের ওপর চড়াও না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছিল তাদেরকে। মাওলানা নাঈমও ছিলেন সে গ্রুপে।

নাঈম বলেন, পুলিশ যখন আক্রমণ শুরু করে, তার খানিক আগে কাফনের কাপড় পরা এক তরুণকে দেখতে পান তিনি। ব্যারিকেডের ওপাশ থেকে পুলিশ নানা ধরনের হম্বিতম্বি করছিল আগ থেকেই। কাফন পরা তরুণ আক্রোশে ফেটে পড়ছিল। সে বারবার ব্যারিকেডের ওদিকে যেতে চাচ্ছিল, আমরা জোর করে তাকে আটকে রাখছি। তারপর পুলিশ যখন আক্রমণ শুরু করল, আমাদেরকে ধাওয়া দিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দিচ্ছিল, গুলির মুহুর্মুহু আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল চারপাশ, আমরা নিরস্ত্র বিধায় দৌড়ে পিছু হটে এলাম। কিন্তু কাফন পরা যুবককে দেখলাম সে পুলিশের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে প্রবল আক্রোশে।

তিনি বলেন, জানি না নবিপ্রেমিক সেই যুবকটির কী হাল হয়েছিল তারপর, বেঁচে আছে নাকি শাহাদতের অমীয় সুধা পান করেছে আল্লাহ ভালো জানেন। কিন্তু নবিপ্রেমের যে দ্যোতি দেখেছিলাম সেদিন তাঁর ভেতর, এমন দ্যোতি হয়তো আর কখনও দেখা হবে না আমার।

আগের সংবাদমাহফিল ও মসজিদে সিরাত চর্চার মূল্যায়ন
পরবর্তি সংবাদও মেরা নাবী