ও মেরা নাবী

ও মেরা নাবী

আহমাদ সাব্বির :

আজকালকার দিনরাত্রিগুলি আমার কী মুগ্ধকর! প্রতি ক্ষণ প্রতি মুহূর্ত প্রতিটি কাল কী অপার বিস্ময়ের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে! মাঝেমধ্যে ভীষণ অবাক হই, ভাবিত হই, আবেগে তাড়িত হই, আনন্দে শিহরিত হই, দৈবাৎ শরীরে চিমটি কেটে দেখি— স্বপ্ন নয় তো! স্বপ্নের মতোই মনে হয় সব৷ নতুবা কী যোগ্যতা ছিল আমার, যে, আপনার সাথে কাল কাটাবো! কী ন্যায্যতা ছিল আমার, যে সারাক্ষণ আপনার মধুরতম বাণী সমগ্র কান পেতে নেবো! এমন হৃদয় তো আমার ছিল না, যে হৃদয় আপনাকে ধারণের ক্ষমতা রাখে! এমন আঙুল তো ছিল না আমার, যে আঙুল আপনার মহান বাণীর লিখিত রূপ ছুঁয়ে দেখতে পারে! কৃতজ্ঞতা সেই মহান রবের প্রতি যিনি আমাকে কবুল করেছেন আপনার বাণী উচ্চারিত হয় যে দরসগাহে সেখানে শামিল হতে৷ আপনার কথামালার আধার যে অনুপম গ্রন্থরাজি তা চোখ মেলে দেখতে৷

যদি বলি বিশ্বাস করবেন! যখন উস্তাদজি উচ্চারণ করেন ‘কালান নাবিয়্যূ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ আমি যেন আপনাকে দেখে উঠি৷ হেরা গুহায় প্রথমবার প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত আপনি যখন কম্পিত দেহে ঘরে ফিরলেন; আম্মাজান খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদকে বললেন— “আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর! আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত করো! আমি নিজের ব্যাপারে শংকা বোধ করছি” তখন আমিও যেন ছিলাম, ওই গৃহেরই কোন এক কোণে৷ আপনার হৃদয়ের কম্পন আমাকেও যেন স্পর্শ করেছে; আমিও শঙ্কিত হতে দেখেছি নিজেকে৷ আমি যেন প্রতক্ষে শুনতে পেলাম আম্মাজান আপনাকে সান্ত্বনা দিতে বলছেন—“ আল্লাহর কসম, কখওনই নয়৷ আল্লাহ আপনাকে কখনও লাঞ্চিত করবেন না৷ আপনি তো আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন৷ অসহায় দুস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন, এবং হক পথের দুর্দশাগ্রস্তকে সহযোগিতা করেন৷”

আম্মাজানের মুখে আপনার এ গুণের কথা শুনে সেদিনই আমি মনস্থির করে নিয়েছি— আমিও জীবনভর অসহায়ের পাশে দাড়াবার চেষ্টা করে যাব৷ মেহমানের যথার্থ সম্মান করব৷ প্রাণপণ লড়ে যাব হক পথে দুর্দশা গ্রস্তদের জন্য৷

জানেন, আপনার থেকে আমি লাজুকতা শিখেছি৷ শিখেছি পিতামাতার সাথে উত্তম ব্যবহার করা৷ আপনিই তো বলেছেন— আল্লাহর কাছে সবচে’ পছন্দনীয় কাজ হলো পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা৷ যেদিন জেনেছি যে আপনি বলেছেন— তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে সেদিন থেকে আমি আমূল বদলে গেছি৷ আমি প্রাণপণ চেষ্টা করতে শিখেছি— আমার প্রতিবেশি আমার হাত এবং আমার মুখ থেকে যেন নিরাপদ থাকে৷ আপনি মিথ্যা বলা ঘৃণা করতেন তাই আমি মিথ্যা ছেড়ে দিয়েছি৷ আপনি কখনও প্রতিশ্রুতির ব্যতয় করতেন না৷ ওই ইহুদির ঘটনা আমি জেনেছি যে আসবার কথা বলে আপনাকে দাড় করিয়ে রেখে যায়৷ আপনি তার অপেক্ষায় থাকবেন— ওয়াদা করার কারণে তিনিদিন ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ এটা জানার পর কারও সাথে ওয়াদাখেলাপি করতে না আমার বুকের ভেতর কেমন কেঁপে কেঁপে ওঠে!

আপনার রূপ সৌন্দর্যের কথা যখন পড়ি নিজেকে স্থির রাখতে পারি না৷ আবেগে তুমুল আন্দোলিত হই৷ এত সুন্দর ছিলেন আপনি! আমার কল্পনা আপনাকে ভেবে নিতে ব্যর্থ হয়৷ মনের ক্যানভাসে আপনার ছবি এঁকে উঠতে পারি না ঠিকঠিক৷ যে মুখাবয়ব কল্পনা করি, বুঝি— আপনি তেমন নন৷ কোন্ সে কল্পনাক্ষম ব্যক্তি আছে যে আপনাকে আঁকবে৷ আপনি ছিলেন গৌরবর্ণের৷ ধবধবে সাদা ছিলেন না আবার একেবারে বাদামী বর্ণেরও ছিলেন না৷ মধ্যমাকৃতির ছিলেন৷ একদম লম্বা না আবার একদমই বেঁটে না৷ আপনার ঘন চুল কাঁধ পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল৷ আপনার বাহ্যিক সৌন্দর্যের বর্ণনা যারা দিয়েছেন তারা আলঙ্কারিক ভাষা সাহিত্যের অধিকারী হওয়া সত্বেও সে শব্দমালা খুঁজে পাননি যে শব্দে আপনার রূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়া যায়৷ কেউ বলেছেন আপনি ছিলেন চাঁদের মতো ৷একজন তো বড় অবাক করা কথা বলেছেন— “আমি একবার পূর্ণিমা রাত্রির স্নিগ্ধ আলোতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লাল চাদর ও লুঙ্গি পরিহিত দেখলাম৷ তখন আমি একবার তাঁর দিকে ও একবার চাঁদের দিকে তাকাতে থাকলাম৷ মনে হলো তিনি আমার কাছে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে অধিকতর চমৎকার৷” বস্তুত আপনার তুলনা ছিলেন আপনিই৷ স্রষ্টার সৃষ্টিতে আর কেউ নেই আপনার চেয়ে সুন্দর৷ আমার কি সাধ্য আপনার সৌন্দর্য আঁকি!

আপনাকে বলি— কি মনোহর আমার এইসব দিনরাত্রি! আপনার অত্যাশ্চর্য বাণী সমগ্র ধারণ করেছে যেসব গ্রন্থরাজি সেই বুখারি, মুসলিম তিরমিযী নাসায়ী ইবনে মাজাহ আবু দাউদ ইত্যাদি গ্রন্তমালার ভেতর ডুবে থাকে আমার তাবৎ মুহূর্তগুলি৷ ঘুম থেকে জেগে মেলে ধরি এসব চোখের সামনে, ঘুমুতে যাবার কালে শেষ কথা হয় এদেরই কারও সাথে৷ শয়নে স্বপনে জাগরণে রাত্রিদিনের ভাবনা কেবল এই মধুমাখা গ্রন্থগুলি৷ যার প্রতিটি হরফে আমি আপনাকে অনুভব করে উঠি৷ যার প্রতিটি পাতায় দেখি আপনারই মুখচ্ছবি৷ এই বেশ ভালো আছি৷ যেন জীবন বয়ে চলছে নিরবধি আপনারই সাথে, আপনারই নরোম কোমল স্নিগ্ধ ভালোবাসা গায়ে মেখে৷

তবে সময়ে সময়ে আমি খানিক বিষণ্ন হয়ে পড়ি৷ যখন বুখারী কিম্বা মুসলিমের কোন বর্ণনায় পড়ি যে আপনি বলেছেন— “তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষ অপেক্ষা অধিক ভালোবাসার পাত্র না হই৷” তখন ভয়ে আমার শরীর শিউরে ওঠে৷ আমি গভীর ভাবনাতে তলিয়ে যাই৷ আমি সিদ্ধান্তে স্থীর হতে পারি না— আপনাকে ঠিক কতোটা ভালোবাসতে পেরেছি! আমার বাবার চাইতে অধিক? মায়ের চাইতে? পৃথিবীতে আর কি কিছু নেই যাকে আমি ভালোবাসি আপনার চাইতে বেশি? আমি আর ভাবতে পারি না৷ অসহায় বোধ করি৷ নিজেকে অপরাধী ভেবে আলপিনে খোঁচা লাগা বেলুনের মতো চুপসে পড়ি৷ আমি তো আপনাকে আবু সুফিয়ান-কন্যা উম্মে হাবিবার মতো ভালোবাসতে পারিনি! পারিনি সুমাইয়া বিনতে কায়েসের মতো ভালোবাসতে— যার স্বামী সন্তান উহূদের রনাঙ্গনে জখমী হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু সে বেচাইন আপনার জন্যে৷ তার অধিক উদ্বেগ ছিল আপনার জখমের কথা ভেবে! এই সেদিনের বালক আবদুল কাইয়্যূম আপনার প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসার যে নজরানা পেশ করলো আমি সেটুকুও পারিনি৷

সময়ে সময়ে লজ্জায় আমি মুষড়ে পড়ি৷ হাদীস-গ্রন্থের পাতা ওল্টাতে যখন আমার প্রতি আপনার ভালোবাসার কথা পড়ি, পড়ি উম্মাহর প্রতি আপনার মমত্বপূর্ণ উদ্বেগের কথা ভীষণ লজ্জিত বোধ করি৷ এই আমার জন্যই তো আপনি রক্ত ঝরিয়েছিলেন তায়েফে, এই আমার জন্যই তো আপনি নিরবে সয়ে গেছেন কত অবিবেচকের বিবেচনাহীন কটুক্তি! কত আপন ভেবেছেন আপনি আমাকে! কত অশ্রু ঝরিয়েছেন আপনি আমার কল্যাণকামনার্থে! অথচ এখনও নিরেট হয়নি আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা! আপনাকে নিয়ে কেউ বিরূপ মন্তব্য করলে সেভাবে কেঁদে ওঠে না আমার মন যেভাবে কেঁদে উঠতো আবু বকর ওমর কিম্বা একজন হামজার হৃদয়৷

হে রাসুল!
আমায় ক্ষমা করুন৷ কবুল করুন৷ আপনার কদমে আজ নিবেদন করছি আমার ভালোবাসার সহস্র বকুল!

আগের সংবাদ‘ইজ্জতে নববী’ : হেফাজত আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের জবানে
পরবর্তি সংবাদআল-মাগাজি : মহানবীর (স.) সর্বপ্রাচীন পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ