ইসকনের ধর্ম, সেবা ও সম্প্রীতির নমুনা

ইসকনের ধর্ম, সেবা ও সম্প্রীতির নমুনা

আশরাফ উদ্দীন খান :

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক প্রচার মাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মাঝে একটি প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা সংঘ হিসাবে বহুল আলোচিত একটি নাম হচ্ছে ‘ইসকন’। শব্দটি একটি সংগঠনের সংক্ষিপ্ত শিরোনাম, যার পুরো নাম হচ্ছে (International Society for Krishna Consciousness) যার বাংলা “আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ”। ইসকনকে পশ্চিমা দুনিয়াতে ‘হরে কৃষ্ণ মুভমেন্ট বা হরে কৃষ্ণ আন্দোলন’ নামে অধিকহারে মানুষ চিনে ও জানে। নাম থেকে বাহ্যিকভাবে অনুমান করা যায় যে, এটা একটি আন্তর্জাতিক সংঘ যাদের কাজ হচ্ছে ‘কৃষ্ণ’-এর ধ্যান-ধারণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া।

মূলভিত্তি ও ভাবনা 

হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, কৃষ্ণ হল হিন্দু ধর্মানুসারীদের আরাধ্য বিশিষ্ট একজন দেবতা। যিনি ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার রূপে খ্যাত। কখনো কখনো তাকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর (‘পরম সত্ত্বা’) অভিধায় ভূষিত করা হয় এবং হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ ভগবদ্গীতা বা গীতার প্রবর্তক হিসাবে মান্য করা হয়। বিভিন্ন হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, তিনি ধর্মরাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দানকারী একজন প্রাচীন ভারতীয় রাজপুত্র ও রাজা।

খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীর পূর্বযুগে প্রচলিত কৃষ্ণধর্ম প্রাচীন বৈদিক ধর্মজ হয়েও খ্রিস্টীয় যুগের শুরু থেকেই ভক্তিবাদের মায়াবী চেতনায় ‘ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারী’ হয়ে উঠেছেন উপাস্য অবতার। একাধিক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে তাকে বিষ্ণুর অবতার রূপে গণ্য করা হয়; অন্যদিকে কৃষ্ণ ধর্মের অন্যান্য সম্প্রদায়গুলিতে তাকে স্বয়ং ভগবান মর্যাদা দেওয়া হয়। কিন্তু এই কৃষ্ণের অনুসারীগণ সনাতন হিন্দু শাস্ত্রের মূল বেদ এর মূল কান্ডারীউপনিষদ। (বাংলা উপকিপিডিয়া_কৃষ্ণ)

প্রসার ও বিস্তৃতি 

বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে সারা বিশ্বে ইসকনের ৫০০০০ টিরও বেশি মন্দির এবং কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি খামার সংগঠন (কয়েকটি স্বনিযুক্তি প্রকল্প সহ), ৫৪টি বিদ্যালয় ও ৯০টি ভোজনালয়। বর্তমানে পূর্ব ইউরোপে (সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর) ও ভারতে এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে ইসকনের প্রধান মন্দির হচ্ছে ইসকন স্বামীবাগ আশ্রম, ৭৯, ৭৯/১ স্বামীবাগ রোড, স্বামীবাগ, ঢাকা-১১০০”। (বাংলা উইকিপিডিয়া_ইসকন)

এই ইসকন সম্পর্কে সাধারণভাবে তেমন বেশীকিছু জানা ছিল না। কয়েকটি ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা প্রথম আলোচনাতে আসে। এরমধ্যে প্রথমটি ছিল– ২০১৬ সালে সিলেটের কাজলশাহ জামে মসজিদের জুমআর মুসল্লিদের সাথে সিলেট শহরের ইসকন ভক্তদের মাঝে সংঘর্ষ। এরপর চলতি বছরের জুলাই মাসে চট্রগ্রামের প্রায় ৩০টি বিদ্যালয়ে ইসকন তাদের রথযাত্রা উপলক্ষে সাপ্তাহব্যাপী ‘ফুড ফর লাইফ’ কর্মসুচির মাধ্যমে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মাঝে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ নামজপের মাধ্যমে দেবতার নামে উৎসর্গকৃত প্রসাদ বিতরণের ঘটনা, যা সেই সময়ে সামাজিক প্রচার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায়। আরেকটি ঘটনা ক্ষমতাশীল দলের কয়েকজন প্রভাবশালী দায়িত্বশীল ব্যক্তির সাথে ইসকনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া।

ইতিহাস 

‘ইসকন গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের অনুগামী। উক্ত মতটি খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্রবর্তিত হয় এবং ১৯৩০-এর দশক থেকে পাশ্চাত্য সমাজে ধর্মান্তকরণের কাজ শুরু করে। ইসকন একটি হিন্দু ধর্মভিত্তিক সংগঠন। ভক্তিযোগ এই সংগঠনের মূল উপজীব্য। স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণকে তুষ্ট করাই এই প্রতিষ্ঠানের ভক্তদের জীবনের মূল লক্ষ্য বলে বিবেচিত হয়। ১৯৬৬ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। ইসকনের মূল ধর্মবিশ্বাসটি শ্রীমদ্ভাগবত ও ভগবদ্গীতা গ্রন্থদ্বয়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।’। (বাংলাপিডিয়া_ইসকন)

অতি অল্প সময়ের মধ্যে সংগঠনটি ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে উঠে। ষাটের দশকের হতাশাগ্রস্ত পশ্চিমা সমাজে যোগব্যায়াম এবং ধ্যান করার প্রাচীন ভারতীয় রীতিকে অভয়চরণারবিন্দ হরে কৃষ্ণ কীর্তনের সুরে অনেকের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলেন।

ষাটের দশকের পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গীতজগতের কিংবদন্তি জর্জ হ্যারিসন এবং জন লেননের সাহায্য নিয়ে তিনি কয়েকটি জনপ্রিয় কীর্তনের অ্যালবাম তৈরি করেন। বিটল-সখ্যাত জর্জ হ্যারিসনের সুপারহিট অ্যালবাম মাই সুইট লর্ড এবং জন লেননের গিভ পিস অ্যা চান্স অ্যালবামের সাথে হরে কৃষ্ণ লিরিক্স যোগ করার ফলে ইসকন এবং হরে কৃষ্ণ ইউরোপ-আমেরিকার মানুষের মুখে মুখে ভাসতে থাকে।

মার্কিন পপ তারকাদের কল্যাণে আরো অনেক নামীদামি তারকা, প্রভাবশালী লোকজন এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ইসকন সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ফলে অভয় করনারাভিন্দকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। যে অভয় একদিন শূন্য হাতে মার্কিন মুল্লুকের নিউ ইয়র্ক শহরে পা রেখেছিলেন, সেই তিনি ধর্মের নামে এত বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন; যার আর্থিক মূল্য দেখে দুনিয়া কাঁপানো সফল ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত হতবাক হয়ে পড়লেন। বর্তমানে ইসকন নামের প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন মন্দির, ধ্যানগৃহ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং তীর্থকেন্দ্রের মাধ্যমে সারা দুনিয়ার শত শত দেশের কয়েক হাজার স্থানে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে।

ফুড ফর লাইফ 

ইসকনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তারা সনাতন ধর্মের অনুসারী। তারা হরে কৃষ্ণ নামের গুণকীর্তন করে এবং হিন্দু ধর্মের বিধানাবলীর আলোকে জীবন পরিচালনা করে। তারা তাদের মন্দিরে কীর্তন-ভজন প্রভৃতি গান গেয়ে নিজেদের ধর্মাচার চর্চা করে। তাদের পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অনাথ আশ্রমে দরিদ্র ও অসহায় ছেলেদেরকে আশ্রয় দেয়া হয় এবং শিক্ষিত করে গড়ে তোলা হয়। তাদের মন্দিরগুলোতে যেকোনো ধর্মের যেকোনো বয়সের ক্ষুধার্ত লোক গিয়ে দিনের পর দিন বিনামূল্যে খাবার খেতে পারে। তারা আর্তমানবতার সেবায় কাজ করে এবং তাদের ফুড ফর লাইফ অর্থাৎ জীবনের জন্য খাদ্য কর্মসূচির আওতায় তারা সারা বছর বিভিন্ন দারিদ্র্যপীড়িত এলাকাতে গিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের মধ্যে নিয়মিত খাদ্য বিতরণ করে।

অভিযোগ ও আপত্তি 

ইসকন সম্পর্কে উল্লিখিত তথ্য পর্যালোচনা করলে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সারা দুনিয়ায় প্রশংসার বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রশংসা তো দূরের কথা, উল্টো তাদেরকে নিয়ে সেই ষাটের দশক থেকে কিরূপ সমালোচনা চলছে তা বুঝতে হলে নিউ ইয়র্কের মার্কিন ফেডারেল কোর্টের কয়েকটি আলোচিত মামলা সম্পর্কে জানতে হবে।

১৯৭৬ সালে নিউ ইয়র্ক সুপ্রিম কোর্টে ‘জনগণ বনাম মার্ফি’ মামলায় যদিও রায় প্রদান করেন, হরে কৃষ্ণ মতবাদ একটি ভালো ধর্মীয় বিশ্বাস; কিন্তু মামলার প্রেক্ষাপট এবং বাদিদের অভিযোগ আজও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ইসকনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। ওই মামলায় দু’জন মার্কিন নাগরিক আদালতে ইসকনের বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ দায়ের করেন যে, ইসকনের ধর্মগুরুরা তাদের কোমলমতি শিশুসন্তানদের ব্রেনওয়াশ করে প্রথমে তাদেরকে পরিবার থেকে আলাদা করেছে এবং পরবর্তীকালে ধর্মান্তরিত করেছে।

উপরোল্লিখিত ঘটনার পর ১৯৮৭ সালে আরেকটি মামলায় ইসকন নেতা কির্তানন্দের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে হত্যা মামলার চার্জ গঠন হয় এবং তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বিরাট এক অপরাধী গ্যাং গড়ে তুলেছে যাকে অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় র‌্যাকেটারিং (Racketeering) বলা হয়। অপরাধী কির্তানন্দ আট বছর জেল খাটার পর বের হয়ে আসেন এই ভিত্তিতে যে, আদালত পরবর্তী সময়ে সন্তষ্ট হয় যে, আসামির সাথে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই। আদালত কির্তানন্দ এবং তার ৫০০ সহযোগীকে প্রতারণার দায়েও অভিযুক্ত করেন।

ইসকন সম্পর্কে উল্লিখিত দু’টি সাড়া জাগানো মামলার বাইরে সত্তর এবং আশির দশকে শিশু নির্যাতন এবং শিশু বলাৎকারের একাধিক মামলা দায়ের করা হয়, যেগুলোর মধ্যে টারলি কেস (Turley Case) সারা দুনিয়ায় হইচই ফেলে দেয়। ২০০৪ সালে এই মামলার নিষ্পত্তি হয়। বাদির পক্ষে আদালতের রায় ছিল যে, ইসকনকে ৯০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশী ঢাকায় প্রায় সাত হাজার ৬০০ কোটি টাকা বাদিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ইসকন এ অবস্থায় নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে এবং দেড় কোটি ডলার, অর্থাৎ ১২৭ কোটি টাকা পরিশোধ করে রক্ষা পায়।

ইসকনের কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতবর্ষের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। হিন্দুরা মনে করছে যে, ইসকন বিকৃত ধর্মমত প্রচার করে হিন্দুইজমের সর্বনাশ করছে। ইসকন প্রচার করছে, তাদের ধর্মে বর্ণিত ৩৩ কোটি দেবতার মধ্যে প্রধান দেবতা হলো কৃষ্ণ। তাদের মতে কৃষ্ণ হলো আদি ও একক দেবতা। কৃষ্ণ থেকেই বাকি দেবতাদের সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীতে মানবরূপে যত দেবতা এসেছেন, তারা সবাই কৃষ্ণের অবতার বা কৃষ্ণজাত সৃষ্টি। ইসকনের হরে কৃষ্ণ মতবাদের সাথে কোনো হিন্দু সংগঠনই একমত নয়। হিন্দুরা সেই অনাদিকাল থেকে শিবকেই প্রধান দেবতা মেনে আসছে। সুতরাং হরে কৃষ্ণ মতবাদ পুরো হিন্দুইজমের ওপরই আঘাত হেনেছে বলে হিন্দুরা অভিযোগ করছে। (ইসকন আসলে কতটা ভয়ংকর, গোলাম মাওলা রনি, নয়া দিগন্ত, ২৪ অক্টোবর, ২০১৯)

ইসকন ও বিশ্ব রাজনীতি 

ইসকনের বিষয়টি সামনে আসার পরে যে বিষয়টি নিয়ে বেশী আশংকা বোধ করা হচ্ছে সেটা এই যে, প্রতিষ্ঠানটি ধর্ম ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি নিয়ে দেশের রাজনীতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। অনেকেই ধারণা করছেন যে, প্রতিবেশী ভারতের সাম্রাজ্যবাদী কোন দূর উদ্দেশ্য নিয়ে ইসকন এই দেশে কাজ করছে। সারা দুনিয়ায় যারা ইসকন পরিচালনা করছেন, তারা সব সময় দেশী-বিদেশী রাষ্ট্রশক্তি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যম এবং পৃথিবীর প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তিদের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন, যা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মীয় সংগঠন কল্পনাও করতে পারে না। ফলে পৃথিবীব্যাপী ইসকনের সদস্য সংখ্যা যেমন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তেমনি সংগঠন হিসেবে ইসকনের প্রভাব-প্রতিপত্তি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। (ইসকন আসলে কতটা ভয়ংকর, গোলাম মাওলা রনি, নয়া দিগন্ত, ২৪ অক্টোবর, ২০১৯)

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেশক গৌতম দাস ‘ইসকন কি এখনো কৃষ্ণপ্রেম বিতরণেই আছে?’ এর প্রশ্নের উত্তরে লেখেন, ‘স্বভাবতই আগের আমেরিকান ইসকন, আগের কৃষ্ণপ্রেম বিলানো ইসকন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের খাঁচায় বিরহ একাকিত্বে আটকে থাকা সাদা আমেরিকানদের মুক্ত করতে আসা ইসকন আগের নেতৃত্ব এক থাকেনি। সেই ইসকনের মৃত্যু হয়। ফোকাস বদলে যায়। নতুন ইসকন জন্ম নেয় যার কাজ ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার হওয়া। তাই এর তৎপরতার ক্ষেত্রে এখন আর পশ্চিমা দেশ থাকেনি, বাংলাদেশও। এ ছাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা ভৌগোলিক পকেটের হিন্দুদের উপস্থিতি থাকলেই তাদের ভারত রাষ্ট্র-সরকারের নীতি ও স্বার্থের পক্ষে জড়ো করা, হিন্দুত্ব জাগিয়ে তোলা, কমপক্ষে সহানুভূতিশীল করে তোলা- এসবই ইসকনের কাজ হয়ে ওঠে।
বাস্তবে ইসকন এখন কৃষ্ণপ্রেম বিলানোর চেয়ে ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বাস্তবায়নের পার্টনার। ওইদিকে সাধারণভাবে বললে কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো বিদেশী রাষ্ট্রে নিজ দেশের নীতি বা স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি পেতে বা চাইতেই পারে না। সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন নেয়া ছাড়াও বিদেশী অর্থ আনার অনুমোদনই পেতে পারে না। বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থ বলে কিছু নিয়ে তৎপরতা চালানো অথবা ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুনীতি নিয়ে তৎপরতা- এর কোনোটাই ইসকন বা কোনো এনজিওকে বাংলাদেশে করতেই দিতে পারে না। এটা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী হবে, তাই। (গৌতম দাস, ইসকন কি এখনো কৃষ্ণপ্রেম বিতরণেই আছে, নয়া দিগন্ত, ২৬ অক্টোবর, ২০১৯)

ইসকন ও বাংলাদেশ 

আবু রুশদের লেখা—“বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানদের কথা-বাংলাদেশে ‘র’ ” বইয়ে লেখা আছে, ‘ইসকন নামে একটি সংগঠন বাংলাদেশে কাজ করছে। এর সদর দফতর নদীয়া জেলার পাশে মায়াপুরে। মূলত এটা ইহুদীদের একটি সংগঠন বলে জানা গেছে। এই সংগঠনের প্রধান কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে উস্কানিমূলক ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি।”. (বই- বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানদের কথা- বাংলাদেশে ‘র’ পৃষ্ঠা: ১৭১)

‘ইসকনের সৃষ্টি কিন্তু ভারতে নয় আমেরিকার নিউইয়র্কে। ৫০ বছর আগে, ১৯৬৬ সালে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতার নাম অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। অবাক হওয়ার মত বিষয়, এ ব্যক্তি ভারতে কোন হিন্দু শিক্ষালয়ে লেখাপড়া করেনি, লেখাপড়া করেছে খ্রিস্টানদের চার্চে। পেশায় সে ছিলো ফার্মাসিউটিকাল ব্যবসায়ী, কিন্তু হঠাৎ করেই তার মাথায় কেন হিন্দু ধর্মের নতুন সংস্করণের ভূত চাপলো, কিংবা কোন শিক্ষাবলে চাপলো তা সত্যিই চিন্তার বিষয়। স্বামী প্রভুপাদ নতুন ধরনের হিন্দু সংগঠন চালু করতেই প্রথমেই তাতে বাধা দিয়েছিলো মূল ধারার সনাতন হিন্দুরা। অধিকাংশ হিন্দুই তার বিরুদ্ধচারণ শুরু করে। কিন্তু সেই সময় স্বামী প্রভুপাদের পাশে এসে দাড়ায় জে. স্টিলসন জুডা, হারভে কক্স, ল্যারি শিন ও টমাস হপকিন্স-এর মত চিহ্নিত ইহুদী-খ্রিস্টান এজেন্টরা।

ইসকন একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠন। সংগঠনটি মুলত এনজিও টাইপ। এরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের দলে ভিড়িয়ে দল ভারি করে। এ কারণে তাদের আস্তানাগুলো হয় নিম্নবর্ণের হিন্দুদের আস্তানার পাশে। যেমন ঢাকা শহরে স্বামীবাগ মন্দিরের পাশে ইসকন মন্দির হওয়ার কারণ, স্বামীবাগে রয়েছে বিশাল মেথর পট্টি। এই মেথর পট্টির নিচুবর্ণের হিন্দুদের নিয়ে তারা দল ভারি করে। সিলেটেও ইসকনদের প্রভাব বেশি। কারণ চা শ্রমিকদের একটি বিরাট অংশ নিচু বর্ণের হিন্দু। এদেরকে দলে নিয়ে সহজে কাজ করে তারা।

বাংলাদেশে ইসকনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য 

১. বাংলাদেশে সনাতন মন্দিরগুলো দখল করা এবং সনাতনদের বিতাড়িত করা। যেমন স্বামীবাগের মন্দিরটি আগে সনাতনদের ছিলো, পরে ইসকনরা কেড়ে আগেরদের ভাগিয়ে দেয়। এছাড়া পঞ্চগড়েও সনাতনদের পিটিয়ে এলাকাছাড়া করে ইসকনরা। ঠাকুরগাও-এ সনাতন হিন্দুকে হত্যা করে মন্দির দখল করে ইসকন। এছাড়া অতিসম্প্রতি সিলেটের জগন্নাথপুরে সনাতনদের রথযাত্রায় হামলা চালিয়েছে ইসকন নেতা মিণ্টু ধর।
২. বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে সাম্প্রদায়িক হামলা করা, যাতে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়। বেশ কয়েক বছর আগে ঢাকাস্থ স্বামীবাগে মসজিদের তারাবীর নামাজ বন্ধ করে দিয়েছিলো ইসকন পুলিশ ডেকে।
৩. বাংলাদেশে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সংগঠন তৈরি করে উগ্রহিন্দুত্ববাদের বিস্তৃতি ঘটানো।
৪. বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে চাকুরীতে প্রচুর সনাতন ধর্মীরা প্রবেশের অন্যতম কারণ-ইসকন হিন্দুদের প্রবেশ করানোর জন্য প্রচুর ইনভেস্ট করে। (ইসকন কি? এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও যোগানদাতা_জি এম শরীফ মাছুম বিল্লাহ, দৈনিক সময়ের কণ্ঠ, ২১ জুলাই)

ইসকনের শুরু হয়েছিল কৃষ্ণের ধ্যান-ধারণার প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে। পরবর্তীতে ‘ফুড ফর লাইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে আত্বমানবতার সেবা শুরু করে। তাই অনেকেই মনে করে থাকতে পারে যে, ইসকন একটি ধর্মীয় ও দাতব্য সংগঠন, এর মধ্যে রাজনীতি ও দেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ টেনে যারা কথা বলেন তাদের কথাকে কারো কাছে অতিরঞ্জন মনে হতে পারে। তবে এই উপমহাদেশের ইতিহাস- ঐতিহ্য ও ইসকন কেন্দ্রিক কিছু ঘটনা-প্রবাহের বিচার-বিশ্লেষণ করে, দেশের রাজনীতি ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গ নিয়ে সচেতন ও সতর্ক হওয়া দেশ প্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের দেশ প্রেমের একটি মৌলিক অংশ।

আগের সংবাদওপারে চলে গেলেন সাদেক হোসেন খোকা
পরবর্তি সংবাদ‘কিশোর আলো’র অনুষ্ঠানে নিহতের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের দাবি ইসলামী ছাত্র খেলাফতের