ইসমাইল হোসেন সিরাজী : বাংলার রাজনীতি ও সাহিত্যের উত্তম পুরুষ

হামমাদ রাগিব

একাধারে কবি, লেখক, বাগ্মী ও তুখোড় রাজনীতিবিদ ছিলেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। ছিলেন বাংলার মুসলিম রাজনীতি ও সাহিত্যের উত্তম পুরুষ। উপমহাদেশের খ্যাতিমান দুই মুসলিম মনীষী আল্লামা শিবলি নোমানি (১৮৫৭-১৯১৪) ও আল্লামা ইকবালের (১৮৭৬-১৯৩৮) ভাবশিষ্য ছিলেন। এই দুই চিন্তানায়কের ভাবাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মুসলিম বাংলার ঝিমিয়ে পড়া চেতনার পুনরুজ্জীবনে অসামান্য অবদান রেখেছেন তিনি।

১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জুলাই সৈয়দ ইসমাইল হোসেনের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলায়। সিরাজগঞ্জ নিজের জন্মস্থান হবার কারণে নামের শেষে ‘সিরাজী’ ব্যবহান করতেন।

আর্থিক সংকট এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে তৎকালীন মুসলিম সমাজের পিছিয়ে থাকার কারণে সৈয়দ সিরাজীর পড়াশোনা স্কুলের গণ্ডি টপকাতে পারেনি। কিন্তু ব্যক্তিগত অধ্যবসায় আর নিবিড় পাঠের কারণে কৈশোরকালেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন দারুণ চিন্তার অধিকারী। ব্রিটিশদের শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট বাংলার পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের দুর্দশা তাঁকে তখন থেকেই ভাবিয়ে তোলে।

কৈশোর পেরিয়ে যখন তারুণ্যে নামেন, পরিচয় ঘটে বাংলার আরেক সংগ্রামী সাধক মুন্সী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহর সঙ্গে। মুন্সী মেহেরুল্লাহর সাহচর্যে একই সঙ্গে তাঁর লিখনী ও বাগ্মিতার প্রতিভা বিকশিত হয়। মেহেরুল্লাহ ছিলেন তার্কিক এবং বাগ্মী, কবিও। তাঁর সঙ্গে ইসমাইল হোসেন সিরাজী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জাগরণী বক্তৃতায় অংশগ্রহণ করতেন। মুন্সী মেহেরুল্লাহর সহযোগিতায় ১৮৯৯ সালে, সিরাজীর বয়স যখন সবে ১৯ বছর, তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অনল প্রবাহ প্রকাশিত হয়। অনল প্রবাহ ছিল জাগরণী কবিতা-সমৃদ্ধ। প্রথম প্রকাশের সময় বইটি ব্রিটিশদের চোখে না পড়লেও ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে যখন এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়, ব্রিটিশদের নজরে আসে কাব্যগ্রন্থখানি। সিরাজীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়। অনল প্রবাহ করা হয় বাজেয়াপ্ত।

মামলার সূত্র ধরে ১৯১০ সালে তরুণ সিরাজীকে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে জেলে পাঠায় ব্রিটিশ আদালত। আর এর মধ্য দিয়ে তিনি উপমহাদেশে জাগরণের কবিতা লিখে কারাভোগকারী প্রথম কবি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান।

দু’বছর কারাভোগের পর সিরাজী যখন মুক্তিলাভ করেন, তুরস্কে উসমানি খেলাফতের তখন টালমাটাল অবস্থা। মুসলমানদের সর্বশেষ সাম্রাজ্য চতুর্মুখী আক্রমণে পর্যুদস্ত হবার জোগাড়। সাম্রাজ্য জুড়ে চলছে যুদ্ধ আর সংঘাত। মুসলিম মিল্লাতের কল্যাণপ্রত্যাশী সিরাজী সিদ্ধান্ত নেন তিনি তুরস্ক যাবেন। খেলাফত রক্ষার জন্য লড়াই করবেন।

১৯১২ সালে জেল থেকে বেরোনোর পরপরই তিনি পাড়ি জমান তুরস্কের উদ্দেশ্যে। বছর খানেক সেখানে অবস্থান করে খেলাফতের পক্ষে লড়াই করেন অসীম বীরত্ব আর সাহসিকতার সাথে। উসমানি খেলাফতের পক্ষ থেকে লাভ করেন ‘গাজি’ উপাধি। কিন্তু সিরাজী লক্ষ করলেন আভ্যন্তরীণ কোন্দল, অপরাজনীতি আর স্বার্থবাদিতার কারণে খেলাফতের যে অধঃপতন শুরু হয়েছে, তা টেকানোর আপাত কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই তুরস্কের লড়াই বাদ দিয়ে স্বদেশের মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করাটাকেই তিনি উত্তম মনে করলেন। ফিরে এলেন মাতৃভূমিতে।

আবার শুরু হলো ব্রিটিশ বেনিয়া আর তাদের আজ্ঞাবহ দেশীয় জমিদার শ্রেণির বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে একদিকে যেমন তিনি কৃষকদেরকে সংগঠিত করছিলেন, অপরদিকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এবং মুসলিম বাংলার জাগরণের জন্য লিখে যাচ্ছিলেন অনবদ্য কবিতা আর জাগরণী রচনা। পাশাপাশি বিভিন্ন সভা-সেমিনারে রাখছিলেন বাগ্মিতাসূলভ বক্তব্য।

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর এসব কর্মতৎপরতায় ব্রিটিশ সরকার এতটা ভীত হয়েছিল যে, তাঁর সভা-সেমিনারে ৮২ বার জারি করেছিল ১৪৪ ধারা। ১৯৩০ সালে রাষ্ট্রীয় আইন অমান্যের অভিযোগে আবারও গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। তিন মাস কারান্তরীণ থেকে মুক্তিলাভ করেন।

বাংলার মুসলমানদের জাগরণের জন্য জীবনভর কাজ করে গেছেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। সমসাময়িক পত্রিকা আল-এসলাম, ইসলাম প্রচারক, প্রবাসী, প্রচারক, কোহিনূর, সোলতান, মোহাম্মদী, সওগাত, নবযুগ, নবনূর প্রভৃতিতে সিরাজীর লেখা প্রকাশিত হতো। তাঁর অধিকাংশ লেখায় ইসলামি ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারকে উদ্দীপ্ত করে তোলার প্রয়াস ছিল।

লেখালেখির পাশাপাশি সরাসরি রাজনীতিতেও অবিচ্ছিন্ন সম্পৃক্তি ছিল সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, আঞ্জুমান-ই-উলামা-ই-বাঙ্গালা, জামিয়াত-ই-উলামা-ই-হিন্দ, স্বরাজ পার্টি ও কৃষক সমিতির সঙ্গে নানা সময়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি।

মুসলিম বাংলার জাগরণ ও মুক্তির মুয়াজ্জিন এ মহান মনীষী কবি ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

আগের সংবাদএরশাদের মৃত্যুতে মুফতী ফয়জুল্লাহর শোক
পরবর্তি সংবাদগণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের সাথে নাজিরপুর উলামা পরিষদ নেতৃবৃন্দের সাক্ষাৎ