রাগিব রব্বানি :
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয় ‘ঈদে মিলাদুন্নবী মাহফিল’। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছরও পক্ষকালব্যাপী শুরু হয়েছে এই অনুষ্ঠান। গতকাল শনিবার ছিল উদ্বোধনী দিন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিতি সংখ্যা বেশি দেখাতে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষার আওতাভুক্ত ঢাকা জেলার বিভিন্ন এলাকার মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের অনুষ্ঠানে জোরপূর্বক নিয়ে আসা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্ধ শতাধিক ইমাম-মুয়াজ্জিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদে মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠানে তাঁদেরকে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। না এলে তাঁদের মসজিদ থেকে শিশু ও গণশিক্ষার শাখা কেটে নেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়।
অনেকে বলছেন, কেবল ঈদে মিলাদুন্নবী না, ফাউন্ডেশনের যেকোনো প্রোগ্রামে উপস্থিতি বেশি দেখানোর জন্য তাঁদেরকে বাধ্য করে নিয়ে আসা হয়। না এলে থাকে চাকরি হারানোর হুমকি।
নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইমাম ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেছেন, ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনকে তাঁরা বিদআত হিসেবে জানেন। এ ব্যাপারে সাধারণ মুসল্লিদেরকে প্রতি বছরই সতর্ক করে আসেন। কিন্তু গণশিক্ষা কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা তাঁদের বিশ্বাসের বিপরীত এই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করেছেন।
‘গত জুমায়ও ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিরুদ্ধে মুসল্লিদেরকে সতর্ক করেছি, কিন্তু আজ ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রোগ্রামে আমাকে আসতে বাধ্য করা হয়েছে।’ বলছিলেন একজন ইমাম।
তিনি বলেন, আসার আগে জানতাম না কীসের প্রোগ্রাম, জানলে আসতামই না। চাকরি গেলে যাক। কিন্তু এসে দেখি এই অবস্থা। যেকোনো প্রোগ্রাম হলে আমাদেরকে বলা হয় আসার জন্য, আসার আগ পর্যন্ত কী বিষয়ক প্রোগ্রাম, আমাদের কোনোকিছুই জানানো হয় না।
আরেকজন ইমাম জানান, তাঁর ছোট্ট মেয়ে খুব অসুস্থ, তিনি আজকের জন্য ছুটি চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে ছুটি দেওয়া হয়নি। অনুষ্ঠানে না এলে তাঁর মসজিদ থেকে গণশিক্ষার শাখা কেটে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
মিডিয়ার লোক হিসেবে পরিচয় দিলে উপস্থিত শিক্ষকদের কেউই কথা বলতে রাজি হন না, তাই পরিচয় গোপন রেখে কথা বলছিলাম তাঁদের সঙ্গে। চাকরি হারানোর বাইরে নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও ভয় পান তাঁরা।
এভাবে জোরপূর্বক কেন তাঁদেরকে নিয়ে আসা হয়, একজন ইমামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘বুঝেন না? উপস্থিতি বেশি দেখিয়ে বড় বড় বান্ডেল নিয়ে আসেন ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতনেরা। কী পর্যায়ের দুর্নীতি চলে এসব অনুষ্ঠানের নামে তা তো জানেন না! দেখলেন না কয়েকদিন আগে আমাদের ডিজি মহোদয় দুই দফায় দুর্নীতির কত টাকা ফেরত দিলেন!’
গতকাল সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে ঈদে মিলাদুন্নবীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় শ’তিনেক লোকের জমায়েত। তাঁদের মধ্যে প্রায় সকলেই গণশিক্ষার আওতাভুক্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিন। বায়তুল মোকাররমের পূর্বের বারান্দায় আয়োজন করা হয়েছে প্রোগ্রামের। অনুষ্ঠান শুরুর আগেই হাজির হতে হয়েছে সকল ইমামকে।
অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে বাদ মাগরিব। মাগরিবের আগে আগে প্রত্যেককে অনুষ্ঠানের নির্ধারিত হাজিরা খাতায় সাক্ষর করতে হয়েছে। সাক্ষকরকারীরা জানিয়েছেন, যাদের উপস্থিতি সাক্ষর থাকবে না, তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারও কারও মসজিদ থেকে গণশিক্ষার শাখাও কেটে নেওয়া হয়।

মাগরিবের পরপর শুরু হয় অনুষ্ঠান। মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক ইমাম-মুয়াজ্জিনদেরকে শ্রোতা হিসেবে বসিয়ে রাখা হয় মঞ্চের সামনে। আর তাঁদেরকে ঘিরে রাখেন ফিল্ড সুপার ভাইজাররা। শিক্ষকদের কেউ যাতে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেরোতে না পারেন সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন তাঁরা। কেউ উঠে যেতে চাইলে জোর করে তাঁকে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কারও কারও সঙ্গে খারাপ আচরণও করেন অনেক সুপার ভাইজার।
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে এই প্রতিবেদক যখন উঠে আসছিলেন অনুষ্ঠানস্থল থেকে তখন মিলন মাহমুদ নামক এক ফিল্ড সুপার ভাইজার তাঁকে গণশিক্ষার আওতাভুক্ত শিক্ষক ভেবে জোর করে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বসতে না চাইলে তাঁকে ধমকও দেন। পরে প্রতিবেদক গণশিক্ষার শিক্ষক নন, বরং সাধারণ শ্রোতা জানতে পেরে তিনি দুঃখপ্রকাশ করেন।
মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষার আওতাভুক্ত প্রত্যেক শিক্ষকের এখানে আসা বাধ্যতামূলক কি না জানতে চাইলে ওই ফিল্ড সুপার ভাইজার বলেন, অবশ্যই বাধ্যতামূলক। ফাউন্ডেশনের যেকোনো প্রোগ্রামে তাঁদেরকে আবশ্যিকভাবে অংশগ্রহণ করতে হয়।
কিন্তু বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণের ব্যাপারটাকে অস্বীকার করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মডেল কেয়ার টেকার সালাহুদ্দীন তারা। ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে মুঠোফোনে তাঁর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যেক প্রোগ্রামে গণশিক্ষার শিক্ষকদের অংশগ্রহণের একটা ব্যাপার থাকে। আমাদেরকে উপর থেকে জানানো হয় প্রত্যেককে যেন অনুষ্ঠানে আসার জন্য বলি। আমরা সে মুতাবিক শিক্ষকদেরকে জানিয়ে দিই, তাঁরা আসেন। আমরা কাউকে বাধ্য করি না।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষকদের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এবং ফিল্ড সুপার ভাইজার মিলন মাহমুদের বাধ্যবাধকতার ব্যাপারটি উত্থাপন করলে তিনি আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ইমামরা বলছেন, মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় শিশু ও সাধারণ মানুষকে দীনি শিক্ষা প্রদানের জন্য। আমরা সে মুতাবিকই এই কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। বিভিন্ন সময় ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণমূলক কর্মশালা বা অনুষ্ঠান থাকে, আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সেখানে অংশগ্রহণ করি। কিন্তু আমাদের ব্যবহার করে ফাউন্ডেশনের যেকোনো সাধারণ প্রোগ্রামে উপস্থিতি বেশি দেখানো’র প্রবণতা খুবই দুঃখজনক। আর ঈদে মিলাদুন্নবী’র প্রোগ্রামে আমাদেরকে ডেকে আনা, বিশেষত যারা এটাকে বিদআত হিসেবে প্রত্যাখ্যানে বিশ্বাসী, তাদেরকে অংশগ্রহণে বাধ্য করা অনুচিত একটি কাজ। প্রোগ্রাম যদি ভালোমতো এবং যথামাফিক করা হতো, তাহলে আমাদের নিয়ে আসার তো কোনো দরকার পড়ত না, সাধারণ শ্রোতারাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করত।
