ইসলামি কমনওয়েলথ, বেন নাবী থেকে মাহাথির মুহাম্মদ

ইসলামি কমনওয়েলথ, বেন নাবী থেকে মাহাথির মুহাম্মদ

রাকিবুল হাসান :

১৯২২ সালে উসমানি খেলাফতের পতনের পর অভিভাবক-শূন্য হয়ে পড়ে মুসলিম বিশ্ব। তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই, খেলাফতের মিম্বরে তাদেরকে সাহস দেবার জন্য নেই কোনো সিপাহসালার। এতিম-অসহায়ের মতো শূন্য এই সময়ে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতিনিধিত্ব করতে আওয়াজ তুলেছিলেন কয়েকজন ইসলামি চিন্তাবিদ। যেমন তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প পেশ করেছিলেন শায়খ জামালুদ্দিন আফগানি। আলজেরিয়ান চিন্তাবিদ মালেক বেন নাবী তুলে ধরেছিলেন ইসলামি কমনওয়েলথের চিন্তা। এবং ব্যবহারিক প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্না।

ইসলামি কমনওয়েলথ

কমনওয়েলথ শব্দটি সমষ্টিগত সমৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করে। যেমন ব্রিটিশ কমনওয়েলথ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা; যেখানে সম্পৃক্ত রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থ, সমঝোতা এবং বিশ্ব শান্তির ব্যাপারে আলোচনা করে। শুধু ইসলামি বিশ্বের দেশগুলোর জন্য এমন একটি কমওয়েলথের তাত্ত্বিক ধারণা পেশ করেছিলেন আলজেরিয়ান চিন্তাবিদ মালেক বেন নাবী।

মালেক বেন নাবী

মালেক বেন নাবী চল্লিশের দশকে ফ্রান্সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। এরপর মিশরে এসে পঞ্চাশের দশকে জামাল আবদুন নাসেরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মিশরীয় সরকার তখন তাকে একটি মাসিক ভাতা নির্ধারণ করে দেয়, যেন তিনি সবসময় বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ একনিষ্ঠতার সাথে করতে পারেন।

মালেক বেন নাবী লিখতেন ফরাসি ভাষায়। মিশরে এসে সাবলীল হয়ে উঠেন আরবিতে। এ সময় প্রখ্যাত হয়ে উঠেছেন মিশরের দার্শনিক রাউচদি ফক্কর এবং লেবাননের চিন্তাবিদ সাকিব আরসালান। বেন নাবী শেষদিকে এসে শেখ মুহাম্মদ আবদুহুর শিষ্যত্বও গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৫৪ সালে আলজেরিয়ার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর বেন নাবী তার বিখ্যাত তত্ত্ব ‘ঔপনিবেশিকতার প্রতি সংবেদনশীলতা’র ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। এ সময় তিনি ইসলামি বিশ্বের পড়াশুনা ও কর্মক্ষেত্রে পশ্চিমা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দী হয়ে পড়ার সমালোচনা করেন। যেখানে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য কেবল ইউরোপ ভ্রমণ করে তার ভাষা ও পেশায় অভ্যস্ত হয়ে উঠা। ‘দ্য ডেস্টিনেশন অব দ্য ইসলামিক ওয়ার্ল্ড’ বইয়ে বেন নাবী বলেন, ‘প্যারিসে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীকে তার খরগোশের জন্য ঘাস কাটতে দেখিনি। বরং নখ-চুল রং করা এবং ক্যাফে-সিম্পোজিয়ামে ধূমপান করতে দেখেছি। আসলে ইউরোপ আমাদেরকে সভ্যতা সংস্কৃতি শিখিয়ে উন্নত করে না, বরং উপনিবেশের চিন্তা বিতরণ করে আমাদেরকে তাদের অর্থনীতির দাস বানিয়ে দেয়।’

এই চিন্তা থেকেই বেন নাবী ইসলামি কমনওয়েলথের তত্ত্ব পেশ করেন। যা তৎকালীন চিন্তাবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। যা মুসলিম উম্মাহকে এক ধারণায় একত্রিত করে এবং তাদের সাধারণ সমস্যাগুলো সমাধানে তারা নিজেরাই যথেষ্ট হয়। কিন্তু বেন নাবী ইসলামি কমনওয়েলথের সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা ঠিক করে দিয়ে যাননি। কারণ তিনি ভাবতেন, এই প্রকল্পটির জন্য অরও চিন্তা-ভাবনা করার দরকার আছে। গবেষকদের চিন্তা-ভাবনা করে পরে তার একটা কার্যকরী রূপ দাঁড় করাতে হবে।

ইসলামি বিশ্ব বিভিন্ন ভাগে ভাগ হলেও অধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে তারা এক। যেমন তারা সাতটি ভাগে বিভক্ত। ১. আফ্রিকান ইসলামি বিশ্ব। ২. আরব ইসলামি বিশ্ব। ৩. ইউরোপীয় ইসলামি বিশ্ব। ৪. ইরানি ইসলামি বিশ্ব। ৫. মালয় ইসলামি বিশ্ব। ৬. চীন ইসলামি বিশ্ব। ৭. পাক ভারতীয় ইসলামি বিশ্ব। উসমানি খেলাফতের পতনের পর যেহেতু পুনরায় খেলাফত প্রতিষ্ঠা তখন প্রায় অসম্ভব ছিলো, এই কমনওয়েলথের চিন্তাটিই মুসলিম বিশ্বকে এক ও শক্ত রাখতে অনন্য একটি প্রচেষ্টা ছিলো।

মাহাথির মুহাম্মদ

ইসলামি কমনওয়েলথের পক্ষে এরপর সবচে বেশি আওয়াজ তুলেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মদ।

আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি ও রূপকার ড. মাহাথির বিন মুহাম্মদ মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে দরিদ্র মালয়েশিয়াকে বিশ্বের ১৪তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তিনি তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে আশার আলো দেখিয়ে আত্মনির্ভরশীল জাতীয় চেতনায় উজ্জীবিত করেছেন। তৃতীয় বিশ্বের প্রতি, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতি ও অন্যায় আচরণগুলোর বিভিন্ন সময় অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তীব্র সমালোচনা করেছেন মাহাথির।

মাহাথির মুহাম্মদ মুসলিম বিশ্বের ব্যর্থতা ও পরাজয়ের কারণ উল্লেখ করে, প্রতিকার শনাক্ত করে, ইসলামি নবজাগরণের প্রয়োজনীয়তার কথা সবসময়ই বলেন। বেন নাবী কমনওয়েলথের যে ধারণাগুলো পেশ করেছিলেন, তিনি সেগুলোর দ্বারা অনুপ্রাণিত। বিশেষ করে ফিলিস্তিন প্রশ্নে এবং মুসলিম বিশ্বের চলমান সংকট নিরসনে ইসলামি বিশ্বের ঐক্যকেই তিনি বেশি জোর দিচ্ছেন এখন।

যেমন আগামী ১৮ থেকে ২১ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সামিট-এর আয়োজন করা হয়েছে। এ সামিটে অংশগ্রহণ করবে মালয়েশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও কাতার। আয়োজনটির নাম দেয়া হয়েছে ‘কুয়ালালামপুর সামিট-২০১৯’। এই সামিটে মুসলিম বিশ্বের ৪৫০ জন নেতা, রাজনীতিবিদ এবং চিন্তাবিদ অংশগ্রহণ করবেন।

সামিট উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মুহাম্মদ বলেছেন, শীর্ষ সম্মেলনে মুসলিম বিশ্ব যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেসব বিষয়ে আলোচনা এবং সমাধান পেতে মালয়েশিয়া ও চারটি মুসলিম দেশ এক সাথে কাজ করবে। সম্মেলনের এজেন্ডা হিসেবে গুরুত্বসহকারে থাকছে উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও সুশাসন, সংস্কৃতি ও পরিচয়, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা, শান্তি-সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা এ সাতটি বিষয়।

মুসলিম দেশগুলোতে সার্বিক ও আঞ্চলিকভাবে সক্রিয় রয়েছে কয়েকটি জোট। এর মধ্যে বৃহত্তম জোটটি হলো ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। এর বাইরে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মূলত সুন্নি দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি মুসলিম প্রতিরক্ষা জোট রয়েছে। এর বাইরে অনেকটা নিষ্ক্রিয় দু’টি জোট রয়েছে, যার একটি হলো আরব লিগ আর অপরটি উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা (জিসিসি)। ছয় দেশের সমন্বিত জিসিসি এখন ‘সৌদি-আমিরাত-বাহরাইন’ জোটে পরিণত হয়েছে। এ তিন দেশ মিসরের সাথে মিলে জোটের অন্যতম সদস্য কাতারকে বয়কট করেছে। আর কুয়েত-ওমান তিন দেশের পদক্ষেপগুলোর সাথে একাত্ম না হয়ে অনেকটা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে।

ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) মতো প্ল্যাটফর্ম থাকার পরও কেন মালয়েশিয়া একটি নতুন ফোরামের আয়োজন করছে, এমন প্রশ্নের জবাবে মাহাথির বলেছেন, অনেক মুসলিম দেশ নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে এবং তাদের সমস্যার সমাধানে মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং পাকিস্তান, আর একই সাথে কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু বাড়তি উদ্যোগ নেয়ার মতো অবকাশ রয়েছে। সব মুসলিম রাষ্ট্রকে এই ঐক্যের মধ্যে নিয়ে আসা হয়নি। কারণ সুনির্দিষ্ট ও কার্যকরভাবে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে স্বল্পসংখ্যক সদস্যের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা অধিক ফলপ্রসূ হয়। তবে তিনি এর সদস্য সংখ্যা ‘আরো বাড়বে’ বলেও উল্লেখ করেন।

আগের সংবাদযমুনা টিভির প্রতিবেদনে ইসলাম-বিদ্বেষ, শায়খুল হাদীসকে জঙ্গিনেতা আখ্যা
পরবর্তি সংবাদইজতেমা মাঠে সাদপন্থীদের হামলার ১ বছর, কী ঘটেছিল সেদিন?