‘ইসলামি ঘরানার অনলাইন সাংবাদিকতায় সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে বিনিয়োগ ও স্পন্সর না পাওয়া’

ইসলাম ও মুসলিম-উম্মাহ-কেন্দ্রিক সাংবাদিকতায় এই সময়ের বাংলাদেশে মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় ধারার গণমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। একবছর হলো অনলাইনে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ-কেন্দ্রিক সাংবাদিকতায় পরিপূর্ণভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। বর্তমানে ইসলাম টাইমস ‍টুয়েন্টি ফোর ডটকম সম্পাদনা করছেন বলিষ্ঠ হাতে। অনলাইন সাংবাদিকতায় তাঁর এই একবছরের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের ইসলামি ধারার অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোর সংকট সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ-প্রশ্নে ফাতেহ সাপ্তাহিকী’র বিশেষ আয়োজনে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন ফাতেহের সহযোগী সম্পাদক হামমাদ রাগিব।

মাদরাসায় শিক্ষিতরা সাধারণত শিক্ষকতা ও ইমামতিতে আগ্রহী হন। লেখালেখি করলে অনুবাদ ও ধর্মীয় ফাজায়েল-মাসায়েল বিষয়ে লেখেন। এই প্রেক্ষাপটে আপনার সাংবাদিকতায় আগ্রহী হবার কারণ ঠিক কী?

আসলে ছোটকাল থেকেই লেখালেখি করার প্রতি আমার ভেতরে এক ধরনের দুর্বলতা কিংবা আগ্রহ তৈরি হয়েই ছিল। কাজের বয়সে এসে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হলেও লেখালেখি-সংশ্লিষ্ট কাজে মনের আঙ্গিনা পড়ে থাকত। সাহিত্য-সাংবাদিকতার সঙ্গে আমার নামকাওয়াস্তে যতটুকু সম্পর্ক এখন আছে, সেটা এভাবেই। লেখালেখির একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে গণমাধ্যম। একটা সময় যখন গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত হয়ে যাই, তখন এই অঙ্গন তার প্রভাব নেতিবাচক ও ইতিবাচকভাবে কত তীব্র এবং প্রচন্ড তা আমার সামনে উন্মোচিত হয়। তখন নিজের স্বপ্ন এবং পেশাকে এই অঙ্গনে নিবেদন করার আগ্রহটা দৃঢ় হয়ে ওঠে।

জাতীয় সংবাদমাধ্যমে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, হঠাৎ ইসলাম-ভিত্তিক অনলাইন সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ার কারণ কী?

মূল বিষয়টা হচ্ছে গণমাধ্যম। আজ থেকে ৭ বছর কিংবা ১০ বছর আগে গণমাধ্যম-কেন্দ্রিক ভাবনাটা ছিল এমন যে, কোনো একটি দৈনিক পত্রিকা সাপ্তাহিক পত্রিকায় ব্যস্ততাটা নিয়োগ করব। ভাবনাটা তো ভাবনার পর্যায়েই ছিল। এরমধ্যে প্রযুক্তির পরিবেশে বড় একটি রদবদল ঘটে গেছে। ইন্টারনেট অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-এর একটি সয়লাব শুরু হয়েছে। এবং এ ক্ষেত্রগুলোতে বিচরণ আর্থিক দিক থেকে তুলনামূলক সহজ। অপরদিকে মূল ধারার প্রিন্ট মিডিয়া নিয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ আর্থিক বিবেচনায় অনেক বড় ব্যাপার। এ দুটি বাস্তবতা একসঙ্গে হয়ে যাওয়ার কারণে অনলাইন গণমাধ্যম নিয়ে সাধ্যমতো কিছু চেষ্টা কিংবা অনুশীলন করার পথে নামতে শুরু করেছি‌। এটাকে এখনও অনুশীলন হিসেবেই গ্রহণ করলে ভালো। কারণ আমাদের আয়োজন প্রয়োজনের তুলনায় আসলে তো খুবই ছোট। আর আমরা যখন একটি অনলাইন পোর্টাল করব বা অনলাইন গণমাধ্যমের চেষ্টা করব সেখানে বিষয় হিসেবে ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ-কেন্দ্রিক সাম্প্রতিক ইস্যু ও তর্কগুলো, অবস্থানগুলো আমাদের কাজের প্রধান একটি ময়দান হবে–এটাই তো স্বাভাবিক। এজন্যই অনলাইন-ভিত্তিক ইসলাম-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের অনুশীলনের পথচলা।

একবছর হলো অনলাইন-সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছেন, এই একবছরের অভিজ্ঞতা একটু শুনতে চাই।

একবছরের অভিজ্ঞতা তো কেবল ইসলাম টাইমসের সঙ্গে। এর আগেও ফাতেহ টুয়েন্টিফোরে মাস ছয়েক উড়ন্তভাবে সময় দেওয়ার সুযোগ হয়েছে। তারও আগে ২০১১ সনের দিকে সাংবাদিক সরদার ফরিদ আহমদ ভাইয়ের সঙ্গে একটি অনলাইন পোর্টালের কাজ করেছি। এখানে সাংবাদিকতা-কেন্দ্রিক কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে দীর্ঘ কথা বলার সুযোগ সম্ভবত নেই। আমি কয়েকটি পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতার কথা বলি। এক হচ্ছে, ক্ষুদ্র আয়োজনে ইসলাম-কেন্দ্রিক অনলাইন পোর্টাল অনুশীলনে সবসময় কিছু ভালো কাজ করতে পারার অনুভূতির পাশাপাশি অনেক কিছু না করতে পারার আক্ষেপটা বড় হয়ে ওঠে। কারণ বহু ঘটনা ও সংবাদের একদম ভেতরে ঢোকা ও সরেজমিন তদন্ত করে কাজ করার আয়োজন ও আর্থিক সংস্থান আমাদের থাকে না। অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে। জনবলের অভাব ও আয়োজনের অপ্রতুলতা আমাদেরকে থামিয়ে রাখে। এটা এখন একটা অভিজ্ঞতা। হয়তো কিছুদিন পর যাঁরা কাজ করবেন তাঁদের অভিজ্ঞতার ধরনটা আরও একটু অন্যরকম এবং ইতিবাচক হবে।

দ্বিতীয় বিষয়টা হচ্ছে, জাতীয়ভাবে বলি কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে, ইসলাম ও মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য গণমাধ্যম চর্চা করলে সবসময় সজাগ বিশ্লেষণী একটি চোখ পুরো হাউসজুড়ে থাকতে হয়। ইতিহাস ও বর্তমানের অনেক তথ্যের জোগান থাকতে হয়। এসব জোগান কাজে লাগিয়ে ভালো একটি পরিবেশনা তৈরি করার মতো লোকবল থাকতে হয়। যোগ্য অনেক মানুষ আছেন, সন্দেহ নেই। সীমিত আয়োজনের কারণে মানুষগুলোকেও কাজে লাগানো যায় না, গণমাধ্যমে ইসলাম ও উম্মাহ-বৈরী শক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিরোধও গড়ে তোলা যায় না। এ জায়গাগুলোতে সামর্থ্যবান মানুষের মনোযোগ দিলে পরিস্থিতির চিত্রটা বদলে যাবে বলে আমি আশাবাদী।

তৃতীয় যে ব্যাপারটি, বলতে কষ্ট লাগছে। যেকোনো ইসলামি পোর্টাল পরিচালনায় শুরু থেকে যাঁরা এগিয়ে আসেন, তাঁরা অনেক আর্থিক ত্যাগ দিয়ে থাকেন। অনেক সময় ভর্তুকির মধ্যেই বছর বছর বিনিয়োগ করেই যেতে থাকেন। কিন্তু সমাজের ভেতরে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কণ্ঠ হতে চাওয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি এসব গণমাধ্যমের জন্য সহযোগী স্পন্সর পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। আমাদের অঙ্গনে অনেক ধরনের সফল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ বিজ্ঞাপন দেওয়ার গরজ অনুভব করেন না। এদিকে সচ্ছল মুসলিম দেশগুলো থেকে আর্থিক অনুদান এনে দীনি অন্যান্য খাতে সহযোগিতা করলেও ইসলাম ভিত্তিক মিডিয়ার জন্য কেউ কিছু করতে চান না। আবার মূল ধারার মিডিয়া থেকে যখন এ অঙ্গনের বিভিন্ন শাখা আক্রান্ত হয় তখন নিজেদের মিডিয়া না থাকার জন্য ঠিকই হাহুতাশ ব্যক্ত হয়।

সব মিলিয়ে স্বপ্নের জায়গাটা অনেক বড়, প্রয়োজনের জায়গাটা অনেক বিশাল। কিন্তু আমাদের সক্ষম মানুষদের অনীহা ও উপেক্ষার বাস্তবতাটা বড় তিক্ত। এবং বড়ই লজ্জাজনক। আমার অভিজ্ঞতার এই চিত্রটা যদি না বদলায়, তাহলে আমি নিশ্চিত, এদেশে অন্তত ইসলামি আদর্শের পক্ষে লড়ার মতো ভালো কোনো ক্ষুদ্র কিংবা মাঝারি অনলাইন গণমাধ্যম কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না।

ইসলামি ঘরানার অনলাইন সাংবাদিকতায় সংকট এবং সীমাবদ্ধতাগুলো জানতে চাই।

অনলাইন মিডিয়াতেই আলেমদের কাজ করার সুবিধা সবচেয়ে বেশি। অল্প খরচে এক খাতেই বহু মানুষকে স্পর্শ করা যায়। কিন্তু এখানে বড় সংকট হচ্ছে বিনিয়োগ ও স্পন্সর না পাবার। বড় সংকট হচ্ছে, সামর্থ্যবান মানুষদের মাঝে মিডিয়ার জন্য অনুকূল ও দরকারি মানসিকতা না থাকবার। ইসলামি অনলাইন মিডিয়ায় আর্থিক সহযোগিতার অভাবে যথার্থ পেশাদার ও কাজের মানুষদের যুক্ত করা যায় না। হাজার হাজার দীনদার কোটিপতি থাকার পরও এ খাতে খরচ করার লোক পাওয়া যায় না। আরও সমস্যা আছে, সেসব সমস্যা মূল এই সমস্যাটিরই অনুষঙ্গ।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু পোর্টাল দাঁড়িয়েছে ইসলাম ও মুসলিমদের অনেকটা মুখপত্র হিসেবে, এগুলোর ভবিষ্যৎ কতটা সম্ভাবনাময়?

গণমাধ্যম এখন অনলাইনের উপরেই চলে। বেশিরভাগ মানুষ তথ্য সংগ্রহ করে এ সূত্র থেকেই‌‌। ইসলাম-বিষয়ক উপাত্তের এবং ইসলামকে প্রাধান্য দেওয়া গণমাধ্যমের পাঠকও এদেশে বেশি হওয়ার কথা। সে হিসাবে সম্ভাবনা তো অবশ্যই ব্যাপক। দরকারটাও অনেক বিশাল। আমাদের অঙ্গন কিংবা অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী মানুষদের মিডিয়া-বিষয়ক মানসিকতা না বদলালে সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগবে বলে মনে হয় না।

অনেকে অনলাইন সাংবাদিকতার পেশা ও উদ্যোগে আসতে চাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

ইসলামকে বিষয় হিসেবে প্রাধান্য দিয়ে যাঁরা অনলাইন পোর্টাল করতে আসছেন নতুন করে, তাঁদেরকে স্বাগত জানাই। দরকারি ও সৃজনশীল প্রতিটি উদ্যোগই প্রশংসনীয়। বাস্তব অর্থেও, অনুশীলনের অর্থেও। তাঁদের প্রতি আমার পরামর্শ, নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিটি নিউজ-ভিউজের ক্ষেত্রে শাণিত করে নেওয়া উচিত। গণমাধ্যমর সেকুলার ও পাশ্চাত্যবাদী বলয়ের দৃষ্টি ও চাতুর্য বারবার নিরীক্ষণ করা উচিত। সে হিসেবে বারবার নিজেদের উত্তরণ ঘটানো উচিত। অন্তত চেষ্টা করা উচিত। আর আরেকটা ব্যাপার হলো, শুরুর সমযয়ে এবং পরবর্তী-সমযয়েও ব্যাপক অর্থসংস্থান ও সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে প্রস্তুতি থাকা দরকার। হাতে মুনাফা না এলেও যেন লড়াইটা চালিয়ে যাওয়া যায়, লড়াইটা যেন বন্ধ করে দিতে না হয়।

আগের সংবাদলিখনী : সম্ভাবনার অপমৃত্যু
পরবর্তি সংবাদবাগদাদের বিক্ষোভে পুলিশের গুলি, নিহত ৩১