লিখনী : সম্ভাবনার অপমৃত্যু

রাকিবুল হাসান

হেফাজতের উত্থান এবং তার আগে-পরে আমাদের কওমি ঘরানায় বেশ কয়েকটি মাসিক পত্রিকা ছিল। তরুণ লিখিয়েদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা আবর্তিত হচ্ছিল এই পত্রিকাগুলোকে ঘিরে। সেই স্বপ্ন ও সম্ভাবনায় হঠাৎ জোয়ার এনে দেয় ‘সাপ্তাহিক লিখনী’। মাসিক থেকে সাপ্তাহিক, সপ্তাহের পুরো আপডেট একসঙ্গে, প্রচ্ছদ-লেখা-প্রকাশনা, সবিশেষে তারুণ্যের কয়েকজন আইকন পত্রিকার লিড লাইনে যুক্ত হওয়ায় খুব অল্প সময়েই গ্রহণযোগ্যতা পায় পত্রিকাটি। তরুণ লিখিয়েদের স্বপ্নে নতুন এক মাত্রা যুক্ত হয়। লিখনী যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, সাপ্তাহিক ২০০০-কে পেছনে ফেলে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে কওমি ঘরানার বাইরের মানুষদেরও, অনেকেই তখন প্রত্যাশা করছিল, এভাবেই একদিন সাপ্তাহিক থেকে আলেমদের একটি দৈনিক হবে। এক ব্যক্তিগত সন্ধায় আমাকে এবং আমার বন্ধু সালাহউদ্দিন আহসানকেও এই স্বপ্নের কথা বলেছিলেন লিখনীর নির্বাহী সম্পাদক কবি মুহিব খান।

২০১৫ সালে লিখনী বন্ধ হয়ে গেলে প্রদীপ নেভা অন্ধকারের মতোই হতাশ, মৃত্যুর মতো বিস্বাদ মনে হতে থাকে সম্ভাবনার স্বপ্নগুলো। এটা মৃত্যু না অপমৃত্যু? চাইলে কি সম্ভাবনার এই কাগজটি টিকিয়ে রাখা যেত না? এই লেখায় প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।

ফ্লাশব্যাক

নব্বইয়ের দশকে ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন ছাত্রনেতার হাত ধরেই পাঠকের সামনে আসে ‘সাপ্তাহিক লিখনী’। তাদের মধ্যে অন্যতম শাহ ইফতেখার তারিক, বর্তমান ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ইসলামি আন্দোলনের সভাপতি ইমতিয়াজ আলম, রশিদ আহমাদ ফেরদাউস। কাগজে-কলমে না হলেও পত্রিকাটি মৌখিকভাবে বিবেচিত হতো শাসনতন্ত্রের মুখপত্র হিসেবে। একসময় পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

পুনরায় চালু ২০ নভেম্বর, ২০১২ সালে। ফেয়ার মিডিয়া লিমিটেডের ব্যাকআপ নিয়ে নতুন আয়োজনে শুরু হয় পথচলা। প্রিন্টার্স লাইনে যুক্ত হন তারুণ্যের কয়েকজন আইকন। প্রধান উপদেষ্টা গাজী আতাউর রহমান, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহ ইফতেখার তারিক, নির্বাহী সম্পাদক কবি মুহিব খান। এরা একই সঙ্গে ফেয়ার মিডিয়া লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও।

কোনো দলীয় ট্যাগ না লাগিয়ে নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতেই পথচলা শুরুর পরিকল্পনা করে পত্রিকাটি। কিন্তু প্রথম সংখ্যাটিই তারা কাকতালীয়ভাবে ‘চরমোনাই মাহফিল’ কাভার স্টোরি নিয়ে প্রকাশ করে। বিপত্তি বাঁধে এখানেই। যেহেতু পত্রিকাটির জন্মই ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের হাত ধরে, তারপর প্রথম সংখ্যার স্টোরি চরমোনাই মাহফিল, পাঠক মনে করতে থাকেন এটা ইশা ছাত্র আন্দোলনের মুখপত্রই বোধহয়। পাঠক মহল থেকে এই ভুল ধারণাটি সরাতে অনেকদিন লেগেছিল তাদের।

পত্রিকাটি বন্ধ হবার কারণ

তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ছিল ‘সাপ্তাহিক ২০০০’। কওমি আলেমদের ‘সাপ্তাহিক লিখনী’ এসে পেছনে ফেলে দেয় ‘সাপ্তাহিক ২০০০’-কেও। এর অন্যতম কারণ—লিখনীতে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন যোগ্য, ডেডিকেটেড, পরিচিত। তাঁদের কাজের মান ও অবস্থান সকলের কাছেই ছিল গ্রহণীয়। সপ্তাহে ১৮ হাজার কপিও ছাপা হয়েছে সাপ্তাহিক লিখনী।

তবুও কেন বন্ধ হয়ে গেল পত্রিকাটি? এক আলাপে জানতে চেয়েছিলাম লিখনীর গুরুত্বপূর্ণ এক পদে কাজ করা একজন ব্যক্তির কাছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি মোটাদাগে দুইটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এক. ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গা-ছাড়া ভাব। দুই. বিজ্ঞাপন বিভ্রাট।

খোলাসা করে বললে, প্রধান কারণ হিসেবে তিনি দেখছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গা-ছাড়া ভাবকে। কর্মীরা সবাই তৎপর ছিলেন ঠিক, কিন্তু কর্মীদেরও তাড়া দিতে হয়, উৎসাহ দিতে হয়। নইলে সবাই ঝিমিয়ে পড়ে। পত্রিকা চালাতে হয় পত্রিকার নিয়মে; নিয়মিত ব্রিফিং করা, মনিটরিং করা, মিটিং করা, হিসেবি দৃষ্টিতে সবকিছু তদারকি করা। প্রথম দিকে সবকিছুই ঠিক ছিল, ধীরে ধীরে এলোমেলো হয়ে যায়। ব্রিফিং হয় না, মিটিং হয় না, বড়রা মনোযোগ দেন না। এভাবে একসময় কাজে ঢিলেমি চলে আসে। এমনকি পত্রিকা প্রেসে পাঠাতেও দেরি হতে শুরু করে। শুক্রবারে প্রেসে যাওয়ার কথা, দেখা গেল প্রেসে যাচ্ছে সোমবারে। শেষদিকে মাসে মাত্র দুটো সংখ্যা বেরিয়েছে, এমনও হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের গা-ছাড়া ভাব কাটেনি।

বিজ্ঞাপন বিভ্রাটও পত্রিকা বন্ধ হবার পেছনে বড় কারণ, তবে এটা মূল কারণ নয়। বিজ্ঞাপন বিভ্রাটের ক্ষেত্রে পাঠকের দায়টাকে দেখছেন তিনি। পত্রিকা চালাতে গেলে অর্থ লাগে, আর অর্থের মূল উৎস বিজ্ঞাপন। ইসলামের ছবি সম্পর্কিত সব নিয়ম মেনে তো বিজ্ঞাপন পাওয়া যায় না। যে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো থেকে বিজ্ঞাপন আনা হয়, তাদের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে প্রোডাক্ট সেল করার। সে হিসাবেই বানায় বিজ্ঞাপন। এখন চেহারার একটা বিজ্ঞাপন দিলেই যদি পাঠক ক্ষেপে যায়, নেগেটিভ ট্রল করতে শুরু করে, তাহলে তো সমস্যা। এই সমস্যাটিই হয়েছিলো লিখনীর ক্ষেত্রে। একদিকে টাকা দরকার, অন্যদিকে টাকা আনতে পারছে না পাঠকদের মতামতকে সম্মান করতে গিয়ে। আঁটোসাটো কাপড়ের বিজ্ঞাপন তো ছাপার প্রশ্নই আসে না, শুধু মুখ অনাবৃত ছবিওয়ালা বিজ্ঞাপনও যদি ছাপতো, ব্যাকআপ কিছুটা শক্ত হতো। এভাবে ভেঙে পড়তো না।

বিজ্ঞাপন বিভ্রাটের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ও কিছুটা দায় আছে এখানে। ১৮ হাজার পাঠক আপনার, সমালোচনা করেছে হয়তো ১০জন, পত্রিকা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কার কথা মানবেন? ১০ জনের কথা চিন্তা করলে ১৮ হাজার জনকেই খোরাক দিতে পারবেন না। মূলত কর্তৃপক্ষ কোনো সমালোচনার মুখে পড়ার ঝুঁকি নিতে চায়নি। আর হেফাজত নিয়ে লেখালেখির কারণে প্রশাসন থেকেও চাপ ছিল। অফিসে এসে কয়েকবার পুলিশ সতর্কও করেছিলো।

শেষকথা

পত্রিকাটি কর্তৃপক্ষ চাইলেই টিকিয়ে রাখতে পারতো। বিজ্ঞাপন বিভ্রাট ছিলো, তবুও। কিন্তু ওই যে গা ছাড়া ভাব, রিস্ক নেয়ার ভয় দুটোই বিশাল এই সম্ভাবনাটির অপমৃত্যু ঘটিয়েছে। নয়তো এমন যোগ্য জনবল থাকতে কখনোই পত্রিকাটি বন্ধ হতো না। পত্রিকাটি চালু থাকলে বিজ্ঞাপনের বাকি বিলগুলোও উত্তোলন করা যেতো। কর্তৃপক্ষ যদি আরেকটু একটিভ হতো, তাহলেই টিকে যেতো। টাকাটাই সবচে বড় বাঁধা ছিলো না এখানে। ছবিওয়ালা বিজ্ঞাপনও যদি না ছাপতো, যতটুকু ছিল, ততটুকু দিয়েই চালিয়ে নেয়া যেতো।

কওমি ঘরানার অপার সম্ভাবনা ছিল সাপ্তাহিক লিখনী। সম্ভাবনার অকাল এবং অপমৃত্যু আমাদের কেবল ব্যথিতই করে। যদিও নিউজ পোর্টালের এখন জয়জয়কার চারদিকে, তারপরও সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বরং বস্তুনিষ্ঠ একটি সাপ্তাহিকের এখন আরও বেশি প্রয়োজন।

আগের সংবাদফেসবুকে অবৈধ পোস্ট মুছে ফেলতে ইইউর নতুন আইন
পরবর্তি সংবাদ‘ইসলামি ঘরানার অনলাইন সাংবাদিকতায় সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে বিনিয়োগ ও স্পন্সর না পাওয়া’