মুসান্না মেহবুব :
বাংলাদেশের ইসলামি প্রকাশনা জগতে বিগত কয়েক বছরে বেশ অনেক পরিবর্তন এসেছে। পুরনো গৎবাঁধা রীতি থেকে বেরিয়ে নতুন নতুন কন্টেন্টে নতুন নতুন বই আসছে। ভারত-পাকিস্তানসহ বিশ্বের খ্যাতিমান ইসলামিক স্কলার ও লেখকদের বই অনূদিত হচ্ছে ব্যাপক মাত্রায়। বেড়েছে বইয়ের কাটতি এবং চাহিদাও। সেই সঙ্গে নতুন নতুন লেখক তৈরি হচ্ছেন এবং বাড়ছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। সাদা চোখে বিচার করতে গেলে ইসলামি প্রকাশনা জগতে বিগত দশ বছরের ব্যবধানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
নতুন নতুন প্রকাশনী যেমন বাজারে আসছে, তেম্নি এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরি হয়েছে একধরনের প্রতিযোগিতাও। একই সঙ্গে নতুন-পুরনো লেখক-অনুবাদকের কদর ও চাহিদাও বেড়েছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তাঁরা কতটা মূল্যায়িত হচ্ছেন, জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম ইসলামি ধারার খ্যাতিমান দুজন লেখক-অনুবাদকের সঙ্গে।
বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন প্রকাশনীগুলোর পাশাপাশি পুরনো ও প্রাচীন প্রকাশনীগুলোও পাঠকের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে লেখক ও বই বাছাই, ছাপা, মুদ্রণ, বাঁধাই—সবকিছুতে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে পেশাদারিত্বও এসেছে প্রায় সবার ক্ষেত্রে। এসেছে সচেতনতাও। ফলে স্বাভাবিকভাবেই লেখকদের কদর বেড়েছে তাঁদের কাছে। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে লেখকরা মোটামুটি সম্মানজনকভাবেই মূল্যায়িত হচ্ছেন তাঁদের কাছে।
কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক বলেন, যেকোনো ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। উভয় পক্ষে পেশাদারিত্ব থাকলে লেনদেনে স্বাভাবিকভাবেই কোনো সমস্যা হয় না। আমাদের ইসলামি প্রকাশনা জগতে পেশাদরিত্বের চর্চা শুরু হওয়ায়, আমি যতটা দেখছি, লেখক-অনুবাদকরা বেশ মূল্যায়িত হচ্ছেন। দু-একটি ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। তবে সেটা আমি মনে করি, যথাযথ পেশাদারিত্বের অভাবের কারণেই হয়ে থাকে। হয়তো দেখা যাবে প্রকাশনা কর্তৃপক্ষের পেশাদারিত্বে ঘাঁটতি আছে, নয়তো লেখকের।
তিনি বলেন, আমি এ পর্যন্ত অন্তত ২০টি প্রকাশনীর সঙ্গে কাজ করেছি। এর মধ্যে সাকুল্যে দুই থেকে তিনটি প্রকাশনীর কাছ থেকে কিছুটা অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছি, সেটাও একপক্ষের অপেশাদারিত্বের কারণে, নয়তো বাকি সব প্রকাশনীর কাছ থেকেই যথাযথ মূল্যায়ন পেয়ে আসছি।
একই কথা বলছেন বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক আবদুল্লাহ আল ফারুকও। তিনি ডজনখানেক প্রকাশনীর সঙ্গে কাজ করেছেন এ পর্যন্ত। দু-একটি প্রকাশনী বাদ দিলে বাকি সকলের কাছ থেকেই যথাযথ মূল্যায়ন পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
তবে বাজারে পাঠকের চাহিদার তুলনায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বেশি বলে মনে করেন প্রায় শ’খানেক বইয়ের এ লেখক ও অনুবাদক। তিনি বলেন, আমাদের বাজার সীমিত। নির্দিষ্ট ঘরানার কিছু লোক পর্যন্ত আমাদের প্রকাশনীগুলো বই পৌঁছাতে পারে। মিডিয়ার বিমাতা সুলভ আচরণ এবং যথাযথ প্রচারণার অভাবে খুব বেশি মানুষের কাছে আমাদের বইগুলো যেতে পারে না। ফলে আমাদের পাঠক সীমিতই বলতে হয়।
আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, এই সীমিত পাঠকদের জন্য বছরের প্রতিটা দিন নতুন নতুন একাধিক বই বেরোচ্ছে। ফলে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে প্রকাশনীগুলো খুব বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারছে না। আর এ জন্য একজন লেখক যতটা সম্মানী পাবার হকদার, সেটা দিতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। ফলে বই অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেক প্রকাশনী প্রতিষ্ঠিত লেখক-অনুবাদকের চেয়ে নবীন লেখক-অনুবাদক, যারা এখনও চর্চার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের দ্বারস্থ হতেই বেশি আগ্রহ বোধ করেন। কারণ, অপেক্ষাকৃত কম সম্মানী বা নামকাওয়াস্তে সম্মানীর বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে বই নেওয়া যায়।
মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, নবীন লেখকরা বই করবেন না, এটা আমি বলতে চাচ্ছি না, আবার প্রকাশনীগুলোর দোষচর্চাও আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং আমি যে সমস্যাটার কথা বলতে চাই, আমাদের বাজার সীমিত। আর এ কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে আমি মনে করি। বাজার বিস্তৃত থাকলে এবং বইয়ের কাটতি বাড়লে আমি বিশ্বাস করি প্রকাশনীগুলো নবীন-প্রবীণ সব লেখককেই যথাযথ সম্মানী প্রদানে নিজ থেকে সচেষ্ট হবে। তাই প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, ইসলামি বইয়ের বাজারকে কীভাবে আরও বিস্তৃত করা যায়, কীভাবে মফস্বলের সাধারণ মানুষকেও ইসলামি প্রকাশনার সমৃদ্ধ এ জগতের সঙ্গে পরিচিত করে তোলা যায়, সেদিকে যেন একটু ভালোভাবে নজর দেওয়া হয়।
