ইসলামী ফাউন্ডেশনের বইমেলা : কেন আগ্রহী নয় ইসলামী প্রকাশনীগুলো?

মুসান্না মেহবুব

প্রতিবছর রমজান জুড়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের দক্ষিণগেটে ইসলামী ফাউন্ডেশনের আয়োজনে বসে ইসলামি বইমেলা। ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগ এবং অন্যান্য ইসলামী প্রকাশনীর অংশগ্রহণে এ বইমেলা অনুষ্ঠিত হবার কথা, প্রতিবছর হচ্ছেও। কিন্তু ইসলামি বই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত কোনো অংশগ্রহণ দেখা যায় না বইমেলায়।

নামে মেলা হলেও মেলার উচ্ছলতা, পাঠকভিড় কিংবা আমেজ—কোনো কিছুই পরিলক্ষিত হয় না এতে। মেলার পুরোটা সময় জুড়ে কেমন নিষ্প্রাণ এবং নিস্পন্দ থাকে স্টলগুলো। স্টলগুলোর চেহারা-সুরতও থাকে নিতান্ত আটপৌরে, কোনো আভিজাত্য নেই। বাংলাদেশে অভিজাত এবং নামকরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকাশনী থাকলেও তাদের কোনোটারই স্টল থাকে না এ বইমেলায়। এমদাদিয়া প্রকাশনী, সোলেমানিয়া বুক হাউজের মতো প্রাচীন ও গৎবাঁধা কয়েকটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল পাওয়া যায়। আর বাকিসব আতর-টুপি-মেসওয়াকের দোকান।

নামকরা প্রকাশনীগুলো স্টল কি বরাদ্দ পায় না, নাকি নিষ্প্রাণ এ বইমেলায় যেতে তাদেরই আগ্রহ হয় না, ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল এ ব্যাপারে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে অভিজাত প্রকাশনীগুলোর অনেকেরই আগ্রহ ছিল মেলায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে। স্টল নেবার জন্য প্রতি বছরই তারা আবেদন করত ইসলামী ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ বরাবর। কিন্তু অদ্ভূত কারণে লটারিতে তাদের কারোরই নাম উঠত না। তাদের বদলে সেখানে স্থানীয় হকারদের নাম উঠত। এই হকাররা প্রাচীন ও গৎবাঁধা প্রকাশনীগুলোর একাধিক নাম ও ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে আবেদন করে অধিকাংশ স্টলই তারা দখলে নিয়ে নেয়। প্রতিটা স্টলের জন্য ফাউন্ডেশনকে সাত হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়। হকাররা সাত হাজার টাকা পরিশোধ করে স্টল নিয়ে পরবর্তীতে সেই স্টলই অভিজাত প্রকাশনীগুলোর কাছে ৫০/৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে।

বড় একটা সিন্ডিকেট কাজ করে এর পেছনে। এরা প্রতিবছরই এভাবে আট দশটা নাম দিয়ে একেকজন আবেদন করে। ফলে অধিকাংশ স্টলই তাদের দখলে চলে যায়। তারা এগুলোর কয়েকটা লাইব্রেরিওয়ালাদের কাছে বিক্রি করে বাকিগুলোতে নিয়ে বসে আতর-টুপি ও তসবি সরঞ্জাম।

অভিজাত যে কয়টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবারের মেলায় অংশগ্রহণ করেছে, তাদের অধিকাংশেই স্টল বরাদ্দ পায়নি। সিন্ডিকেটের কাছ থেকে বহুগুণ বেশি দামে তারা স্টলগুলো নিয়েছে। বাংলাবাজার ইসলামি টাওয়ারের হুদহুদ প্রকাশন স্টল বরাদ্দ পাওয়ার জন্য যাবতীয় নিয়ম-নীতি মেনে আবেদন করেছিলেন। সে মোতাবেক মেলায় অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতিও নিয়েছিল প্রকাশনীটি। কিন্তু লটারিতে তাদের নাম না ওঠায় তারা আর স্টল বরাদ্দ পাননি, ফলে মেলায় আর যাওয়াও হয়নি তাদের।

হুদহুদ প্রকাশনের কর্ণধার দিলাওয়ার হোসাইন বলেন, ফাউন্ডেশনের বইমেলা তো নিশ্চয় আপনারা দেখেছেন, পাঠকের আনাগোণা নেই, নেই মেলার কোনো প্রাণচাঞ্চল্য, বিক্রিবাট্টাও ওভাবে হয় না, যতদূর জানি, মেলার খরচও অনেকে তুলতে পারেন না, এসব জেনেও আমরা মেলায় যেতে চেয়েছিলাম, ইসলামি ধারার এ উদ্যোগটাকে প্রাণচাঞ্চল্যময় করার স্বার্থে। আমাদের মতো আরও অনেক প্রকাশনী শুধু এ কারণেই সেখানে স্টল বরাদ্দ নিতে চায় যে, মেলাটা মেলার মতো যাতে হয়ে উঠে।

দিলাওয়ার হোসাইন আরও বলেন, ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এ বইমেলা কিন্তু ইসলামি প্রকাশনী, বই ও পাঠককূলের জন্য অনেক বড় একটা সম্ভাবনার জায়গা। আমাদেরকে যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে এ বইমেলা প্রাণচাঞ্চল্যময় হয়ে উঠতে বেশিদিন সময় লাগত না। কিন্তু স্টল নিয়ে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারণে প্রকাশনীগুলো মেলায় অংশগ্রহণেরই সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে যাদের একসময় তুমুল আগ্রহ ছিল মেলায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে, তাদের অনেকেরই আগ্রহে এখন ভাটা পড়েছে।

আগের সংবাদমাওলানা আতহার আলী : বৃহত্তর মোমেনশাহীর ধর্মীয় অভিভাবক
পরবর্তি সংবাদঅবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা, ৮৪ রোহিঙ্গা উদ্ধার