
মূল : ইমরান আবদুল্লাহ ।। অনুবাদ : রাকিবুল হাসান
জীবিকা নির্বাহের বিষয়টি নিয়ে আজকাল কবি-সাহিত্যিকগণ ভীষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন। দুশ্চিন্তা দূর করতে নিজস্ব লেখালেখির বাইরে কেউ কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানে নয়টা-ছয়টা চাকরি করেন। কেউ কেউ বিভিন্ন পত্রিকায় বাঁধা-লেখক হিসেবে কাজ করেন। তাদের কবিতা ও সাহিত্য ব্যাপক প্রসার ও প্রসিদ্ধি লাভের পরও খুব কম কবি-লেখকই নিশ্চিন্তে সুন্দর জীবন যাপন করতে পারেন।
দশম এবং এগারতম শতাব্দীতে কবি-সাহিত্যিকদের জীবিকা নির্বাহের পদ্ধতিটা একদমই ভিন্ন ছিলো। আজকালের মতো না, সবসময় দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন। তখন তাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ঈর্ষণীয় অবস্থান ছিলো। আবু মনসুর সাআলিবি তার ‘সমকালীন যুগের কবি’ গ্রন্থে তখনকার সময়ে সাহিত্যিকদের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তখন রাজপুত্র এবং শাসকদের দরবারে সাহিত্যিকদের পদচারণা ছিলো। সরকার এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাহিত্যিকদের বিশেষ সম্পর্ক ছিলো।’
প্রাচীন সাহিত্যিকদের কাজের বিস্তৃতি
‘সমকালীন যুগের কবি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে ধরা হয়। এই গ্রন্থে লেখক আবু মনসুর সাআলিবি সাহিত্যিকদের ব্যক্তিগত জীবন যাপন এবং তাদের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টি তুলে এনেছেন। চতুর্থ এবং পঞ্চম হিজরি শতাব্দীর শুরুর সময়ে যে সমস্ত সাহিত্যিক তার সমসাময়িক কিংবা অল্প সময় পূর্বে গত হয়েছেন, তাদের আলোচনা বিশদভাবে করেছেন। এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে সেসব সাহিত্যিক—যারা শাম, ইরাক, উত্তর আফরিকা, স্পেন, এমনকি পারস্য ও খোরাসানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। নিজ মেধা ও প্রতিভায় সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটাচ্ছিলো।
উক্ত যুগের কবি ও লেখকগণ রাজপুত্র, শাসক এবং মন্ত্রীদের দরবারে জায়গা করে নেবার চেষ্টা করতেন। ফলে বিভিন্ন কাজের সুযোগ পেয়ে যেতেন। এরপর দরবারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, দক্ষ কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে ইসলামি বিশ্বের দেশ তথা বাগদাদ, কায়রো, দামেশক, হিজায, আফরিকা, মরক্কো এবং উন্দুলুসের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ফায়দা হাসিল করতেন।
রাজপুত্রদের দরবারে
মিশরে তখন ফাতেমিদের শাসন। বাগদাদ এনং আফরিকায় আব্বাসিদের, উন্দুলুসে উমাইয়াদের শাসন। উত্তর ভারত এবং খোরাসানে গজনীদের শাসন। প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজে ‘মধ্যপ্রাচ্যের বই’ গ্রন্থে প্রকাশিত লেবানন একাডেমির গবেষণায় বলা হয়েছে—সাহিত্যিকদের মধ্যে সেসময় প্রতিযোগিতা ছিলো খুব তীব্র। কেউ সচিব অথবা সংবাদ লেখক হিসেবে দরবারে স্থায়ী চাকরী পেতে চাইতো। কেউ হাদিয়া-উপঢৌকনের অর্থ দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতো। অবশ্য এমনও কেউ কেউ ছিলো—যারা দরবারের এসব তোষামোদি সাহিত্যের প্রতিপালক রাজপুত্রদের অপছন্দ করতেন।
তবে অধিকাংশ সাহিত্যিক কোনো না কোনো দরবারের অনুগত হয়ে থাকতেন। সে দরবারেই জীবন কাটিয়ে দিতেন। দরবারের নামের সঙ্গে সাহিত্যিকের নামও জড়িয়ে যেত। ‘আগানি’ এবং ‘মাকাতিলুত তালিবিন’ গ্রন্থের লেখক, সাহিত্যিক ও সমালোচক আবুল ফারজ ইস্পাহানি ছিলেন বুয়াইহ রাজ্যমন্ত্রী আবু মুহাম্মদ আল হাসান মুহালাবির একান্ত নিকটজন। মন্ত্রীর দরবারে ইস্পাহানির বড়সড় একটা অবস্থান ছিলো।
সাহিত্যিকদের কাজের ধরন
”সমকালীন যুগের কবি” গ্রন্থে লেখক সাআলিবি বলেছেন, ‘বই লেখা শেষ হলে সাহিত্যিকরা তাদের বই উৎসর্গ করতেন সাহিত্যপ্রেমী রাজপুত্রদের। ফলে তারা বই লেখার রয়্যালিটিও পেয়ে যেতেন। তাদের বইগুলো হতো সাফল্যের গল্প নিয়ে। গল্প লিখে লেখকরা তাদের প্রতিভার প্রকাশ করতেন, রয়্যালিটি দিয়ে রাজপুত্ররা দিতেন দরবারের সাহিত্যিকদের প্রতি তাদের উদারতার প্রমাণ।’
বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমালোচক কাজি জুরজানি ছিলেন সাহেব ইবনে আব্বাদের ঘনিষ্ঠ। তিনিই জুরজানিকে জুরজানের বিচারকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। জুরজানের পর রাঈ শহরে। এরপর মৃত্যুর আগে তিনি জুরজানিকে প্রধান বিচারপতির আসনে বসিয়েছিলেন।
আলেপ্পোর আমির সাইফুদ্দৌলা হামদানির দরবার বিখ্যাত সব সাহিত্যিকদের জন্য পরিচিত ছিলো। তিনি সাহিত্যিকদের কাছে টানতেন, উপঢৌকন দিয়ে উচ্ছ্বসিত করে দিতেন। তার দরবারের সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম—মুতানাব্বি, ইবনে খালওয়াইহ নাহবি, দার্শনিক আবু নসর ফারাবি এবং তার চাচাত ভাই আবু ফরাস হামদানি। তিনি ছিলেন আলেপ্পোর কবি, পরে রাজ্যের আমির হয়েছিলেন।
দরবারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন
চাহিদা এবং প্রতিযোগিতার কারণে রাজপুত্রদের সঙ্গে যখন সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতো, একজন সাহিত্যিক তখন অন্য রাজপুত্রদের দরবারে চলে যেতেন। মুতানাব্বি তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
সাইফুদ্দৌলার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। তাকে সাইফুদ্দৌলা অনেক উপঢৌকন দিতেন। সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবার পর আলেপ্পো থেকে তিনি মিসরে যাত্রা করেন। মিসরের দরবারে কাফুর ইখশিদের প্রশংসায় কবিতা করে জায়গা করে নেন। একসময় ইখশিদের সঙ্গেও সম্পর্ক খারাপ হয়। এরপর মুতানাব্বি মিসর ছেড়ে শাম, ইরাক, পারস্য ঘুরে আলেপ্পোতে সাইফুদ্দৌলার দরবারে আবার ফিরে আসেন।
এক দরবার থেকে আরেক দরবারে যাবার সময় সাহিত্যিকরা রাজপুত্রদের থেকে অনুমতি নিতেন। বাগদাদের কবি আবু তালেব মামুনির উদাহরণ এখানে টানা যেতে পারে। মন্ত্রী সাহেব ইবনে আব্বাদের কারণে যখন আমিরের সঙ্গে কবির সম্পর্কের অবনতি হলো, কবি দরবার থেকে চলে যাবার অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে নিশাপুরে প্রথম, তারপর বুখারায় গিয়ে থিতু হন।
চতুর্থ হিজরি শতাব্দীর সাহিত্যিক এবং দার্শনিক আবু হাইয়ান তাওহিদি ‘মন্ত্রীদের দোষ-ত্রুটি’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। এই বইয়ে তিনি তার কালের কবিদের পারস্পরিক ঈর্ষা এবং প্রতিযোগিতার দৃশ্য এঁকেছেন। দরবারে সাহিত্যিকদের ছুটে যাওয়া, হাদিয়া তোহফার লোভে কাতর হওয়ার গল্পগুলো তুলে এনেছেন। মেধা ও প্রতিভা দিয়ে দরবারে রাজপুত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র থেকে তীব্রতর হতো। এতে সাহিত্যের যেমন বিকাশ ঘটত, তেমনি সমানতালে পরস্পরের শত্রুতাও বৃদ্ধি পেতো।
অনুবাদসূত্র : আল জাজিরা
