
রাকিবুল হাসান
কাউকে যখন গাইতে দেখেন স্টেজে, কাজের ফাঁকে যখন প্লে-লিস্ট ওপেন করে শুনেন সদ্য রিলিজ হওয়া নতুন গান—গুনগুনিয়ে কিন্তু আপনিও গেয়ে ওঠেন। কখনো আইনুদ্দিন আল আজাদ, কখনো জুনায়েদ জামশেদ। সামি ইউসুফ এবং মাহের জাইনকেও নেন। আহমদ আব্দুল্লাহ, খালেদ, তাহসিন—আপনার পছন্দের নাম। শুনতে শুনতে ভাবেন, ভেতরে ভেতরে ঈর্ষাবোধ করেন, যদি গাইতে পারতাম এমন!
সত্যিই যারা গাইতে চায়, শুধু ইচ্ছে নয়, তারা গাইতে শুরু করে দেয়। যেই গাওয়াটা শুরু হয় ঘরে, একলা রুমে, সেই গাওয়াটা একদিন কঠিন শ্রম ও সময়ের অবদানে কোটি মানুষের মন জয় করে। ওই স্টেজে যাওয়ার আগে, পরিবেশিত হয়ে আমার-আপনার সামনে আসার আগে, একজন শিল্পীকে তার সবটুকু বিলিয়ে দিতে হয়। একের পর এক পেরিয়ে যেতে হয় বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়। গুণে গুণে তাকে শেষ করতে হয় দক্ষ হয়ে উঠবার প্রতিটি অধ্যায়।
তিনটি স্তর পেরিয়ে এলে একজন শিল্পী যথার্থই শিল্পী হয়ে ওঠেন। শেকড় থেকে শিখরে উঠবার এই হলো সিঁড়ি। এই সিঁড়ি বেয়ে একজন শিল্পী মাটি থেকে মঞ্চের উপরে উঠে আসেন।
১. গায়কি দক্ষতা বাড়ানো
এই স্তরে একজন শিল্পীকে গাওয়াটা শিখতে হয়। তাল, লয়, সুর কোথায় কিভাবে কতটুকু, জানতে হয়। এজন্য এই স্তরে যে কাজগুলো করতে হয়—
ক. কোনো সংগীতের ক্লাস কিংবা কোনো শিক্ষকের কাছে তালিম নেওয়া। সংগীত বই পড়ে শেখার বিষয় নয়, উসতাদ থেকে তালিম নেওয়ার বিষয়। যার তালিম যতটা পোক্ত, তার ভিত্তি ততটা মজবুত।
খ. প্র্যাকটিস। তালিম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুশীলন করতে হয়, চর্চা জারি রাখতে হয়। ঘরে, বাইরে, পথে—সব জায়গায়। কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে, যেখানে গাইতে সংকোচ হয়, সেখানে গাইতে হয়। সংগীত হয়ে উঠতে হবে ধ্যান-জ্ঞান। ঘুমোতে যাবার সময়, উঠবার সময়, তার গলায় থাকবে গানের লাইন।
গ. লিরিক পড়া শেখা। একজন শিল্পীকে যেমন গাইতে হয়, তেমনি গানের লাইনগুলো পড়তে জানতে হয়। একজন শিল্পী যদি লিরিক পড়া না শেখেন, ভালো শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন বিবর্ণ হয়ে যায়। লিরিক যথাযথ পড়তে জানলে সুরে কারিশমা তৈরি হয়, নতুন নতুন নোট, বাঁক, ইমোশন গানকে করে তুলে শ্রুতিমধুর। হৃদয় থেকে অনুভব করে গাওয়ার জন্য লিরিক পড়া শিখতে হয় একজন শিল্পীকে।
একজন শিক্ষকের কাছে নিবিড় তালিম নিয়ে যখন যথাযথ প্র্যাকটিস করে, সেইসঙ্গে যেকোনো লিরিক পড়াটাও শিখে যায়, তখন আসে দ্বিতীয় স্তর।
২. সুযোগের সন্ধান করা
এই স্তরে নিজের প্র্যাকটিস রুম থেকে বেরিয়ে একটু একটু করে বাইরে আসতে হয়। নিজের গায়কিটা দেখানোর জায়গা খুঁজতে হয়। যেন নিজের কনফিডেন্স বাড়ে, আত্মবিশ্বাস উঁচু হয়। এজন্য এ স্তরে যে কাজগুলো করতে হয়—
ক. কোনো সংগীতের কোনো যোগ দেয়া। যোগ দিতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। কথাটা হচ্ছে—কোনো দলের সঙ্গে থাকলে বিভিন্ন জায়গায় পারফর্ম করার সুযোগ আসে। গায়কি যোগ্যতারও অনেক উন্নতি হয়।
খ. কোথাও কোনো সংগীতের প্রতিযোগিতা হলে, তাতে অংশগ্রহণ করা।
গ. সুযোগ হলে স্টেজে গাওয়া, মাহফিলের মঞ্চে গাওয়া।
ঘ. নিজের সুরটা খুঁজে বের করা। এতদিন গাইতে গাইতে অনেক সুরের আঙ্গিক নিশ্চয় জানা হয়ে গেছে। এখন খুঁজে বের করতে হবে কোন সুরে নিজের স্বস্তিবোধ আসে; হাই নোটস, মিডিয়াম নোটসে। ধীরে ধীরে নিজের সুরে অভ্যস্ত হতে হবে। নিজের সুরে স্বাতন্ত্র্য তৈরি করতে হবে।
ঙ. গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও লিরিক লেখার চেষ্টা করা। সুর করার চেষ্টা করা। গ্রাউন্ডে তালিমের সঙ্গে প্র্যাকটিস করা হয়েছে। তারপর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন জনের কাছে নিজের সুরটা ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে টেলেন্ট শো, স্টেজ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে।
এখন আসবে তৃতীয় স্তর; নিজেকে নিজের ইচ্ছেমতো মেলে ধরার পালা।
৩. নিজেকে প্রমোট করা
প্রফেশনালিজম ছাড়া কোন শিল্পই টিকে না। ইসলামি সংগীত শিল্প যদিও এখনো প্রফেশনাল হতে পারেনি, তবুও চেষ্টা করতে হবে প্রফেশনাল হওয়ার। প্রফেশনালিজমের অন্যতম একটি সূত্র হলো মার্কেটিং। মার্কেটিং এবং বাজারজাত করা ছাড়া এখন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা মুশকিল। নিজের মার্কেটিংয়ের জন্য যে কাজগুলো করা যেতে পারে—
ক. কোনো ইসলামি সংগীত হাউজে জব নেয়া। এতে করে টাকাও যেমন আসবে, গানও আসবে। যদি সংগীত হাউজে জব না পাওয়া যায়, অন্যকোথাও জব নিতে হবে। জব শেষ করে বাকি সময়টুকু সংগীতের পেছনে দিতে হবে।
খ. রেকর্ডিং-যন্ত্রপাতি কেনা।
গ. নিজের গানের একটা ডেমো তথা কয়েকটি গানের কয়েকটি সুর দিয়ে শর্ট রিমিক্স তৈরি করা। যেন এই ডেমো শুনলেই কেউ বুঝতে পারে— শিল্পী সবধরনের গান গাইতে পারে। তার সুরে একটা কিছু আছে, যা শ্রোতাদের টানবে।
ঘ. শ্রোতাদের সাথে কানেক্টেভিটি।
গান দিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে কমিউনিকেট করার সবচে বড় মাধ্যম আজকাল ইউটিউব, ফেসবুক। গান রেকর্ড করে ইউটিউবে আপলোড করতে হবে। দেখতে হবে শ্রোতাদের ফিডব্যাক। কেউ সমালোচনা করলে ভেবে দেখতে হবে, আসলেই সমালোচনাটা সত্য কিনা। সত্য হলে সমালোচনা নিতে হবে। বিদ্বেষপ্রসূত হলে সমালোচনায় কান দেয়া যাবে না।
একজন শিল্পীর জন্য ইউটিউব এখন প্রচারণার সবচে বড় মাধ্যম।
ঙ. একজন শিল্পী তার গানে যেমন রুচি বজায় রাখেন, তেমনি তার পোশাকেও রুচি বজায় রাখতে হবে। যে পোশাকটা দৃষ্টিনন্দন, মার্জিত রুচির বহিঃপ্রকাশ, সে পোশাকটাই পরিধান করতে হবে। দর্শক-শ্রোতারা এখন রুচি-সচেতন। সুর সুন্দর হলেই কেবল হয় না, জীবনটাও সুন্দর হতে হয়।
সবচে কঠিন কাজ মনুষের মন জয় করা। মন ভালো করা। সংগীত ঠিক এই কাজটিই করে। একজন শিল্পী শুধুই শিল্পী নয়, বরং তিনি মানুষের মন ভালো করার কারিগর।
