
ফাতেহ ডেস্ক
ট্রাম্পের ভারত সফরের মধ্যেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে রাজধানী নয়াদিল্লি। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ-সংঘর্ষে এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০০ জন। আহত ৪৮ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালেও নতুন করে তেতে ওঠে রাজধানী দিল্লি। সিএএ নিয়ে গত তিন দিন ধরেই ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়েছে সেখানে। এ দিন সকালে ফের মৌজপুর এবং ব্রহ্মপুরীতে ফের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরস্পরকে লক্ষ্য করে শুরু হয় পাথরবৃষ্টি। জ্বালিয়ে দেয়া হয় বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলও। মৌজপুরে একটি ই-রিকশায় ভাঙচুর চালানো হয়। রিকশার যাত্রীদের মূল্যবান জিনিসপত্রও লুঠ করা হয়। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ)। উদ্ধার হয় কার্তুজের খোল। এলাকায় ফ্ল্যাগ মার্চ করে তারা। আপাতত সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলে জানা গিয়েছে।
মৌজপুর এবং ব্রহ্মপুরীর মতো একই পরিস্থিতি কারওয়াল নগরে। ভোররাতে সেখানে একটি টায়ার কারখানায় বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয় বলে জানা গিয়েছে। আগুন ধরানো হয় বেশ কিছু গাড়িতেও। তবে পুলিশি নিরাপত্তা না পাওয়ায় এখনও পর্যন্ত সেখানে গিয়ে পৌঁছয়নি দমকলবাহিনী। উত্তর-পূর্ব দিল্লির দমকল বিভাগের ডিরেক্টরের তরফে জানানো হয়েছে, গতকাল থেকে এ দিন ভোর ৩টে পর্যন্ত দিল্লির নানা প্রান্ত থেকে তাঁদের কাছে ৪৫ বার ফোন এসেছে। বিক্ষোভকারীদের হাতে তাদের তিন কর্মী আহত হয়েছেন। একটি গাড়িও জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ করছেন তারা।
গোটা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দিল্লি পুলিশও। তাদের তরফে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে হিংসা অব্যাহত বলে ফোনে লাগাতার অভিযোগ পাচ্ছি আমরা।’
সিএএ সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করায় গতকালই রাজধানীর একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ দিনও জাফরাবাদ, মৌজপুর-বাবরপুর, গোকুলপুরী, জোহরি এনক্লেভ এবং শিব বিহার মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। ওই সমস্ত স্টেশনে বন্ধ রাখা হয়েছে মেট্রো চলাচলও। উত্তর-পূর্ব দিল্লির সমস্ত সরকারি এবং বেসরকারি স্কুলও বন্ধ রাখা হয়েছে। একাধিক জায়গায় জারি হয়েছে ১৪৪ ধারা।
গতকাল লেফটেন্যান্ট গভর্নর অনিল বৈজলের সঙ্গে একদফা কথা হয় দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের। বাহিনী পাঠানো হবে বলে বৈজল তাকে আশ্বস্ত করেছেন বলে সেই সময় জানান কেজরিওয়াল। কিন্তু এ দিন নতুন করে হিংসা ছড়ানোয় ফের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। টুইটারে কেজরিওয়াল লিখেছেন, দিল্লির কিছু জায়গায় যে পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে চিন্তিত আমি। শহরের সর্বত্র যাতে শান্তি বজায় থাকে, একজোট হয়ে আমাদেরই তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
দিল্লির পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল রাতেই দিল্লি পুলিশ প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মুহূর্তে রাজধানীতে রয়েছেন। তাই যত শিগগির সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
সিএএ’র বিরুদ্ধে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই অবস্থান বিক্ষোভ চলছিল জাফরাবাদ, সীলামপুর-সহ একাধিক জায়গায়। কিন্তু রবিবার সেখানে সিএএ-র সমর্থনে পাল্টা মিছিল করেন বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র। তিন দিনের মধ্যে বিক্ষোভ না সরালে তারা কাউকে মানবেন না, রাস্তায় নেমে আসবেন বলে হুমকি দেন তিনি। তার পরই জাফরাবাদ-সহ আশাপাশের এলাকার পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। সিএএ বিরোধীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন সিএএ সমর্থকরা।
গতকাল মৌজপুর, গোকুলপুরী-সহ একাধিক এলাকায় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। তাতে এক পুলিশকর্মীসহ ৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন হেড কনস্টেবল রতনলাল, শাহিদ, মহম্মদ ফুরকান, রাহুল সোলাঙ্কি এবং নাজিম। বাকি দু’জনকে শনাক্ত করা যায়নি।
এছাড়া ট্রাম্প বিরোধী বিক্ষোভ হয় কলকাতা, হায়দরাবাদ ও গুয়াহাটিতে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রসচিব অজয় ভল্লা।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ৫৫ বছরের পুরনো নাগরিকত্ব আইনে সংশোধন করে ভারত। সংশোধিত আইনে প্রতিবেশি তিন দেশ (বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) থেকে যাওয়া হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, পার্সি ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হিন্দু জাতীয়বাদী দল বিজেপি সরকারের প্রণীত এই আইনটিকে মুসলিমবিরোধী ও ভারতীয় সংবিধান পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়। এসব বিক্ষোভে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় সোমবারের আগেই নিহত হয় অন্তত ২৫ জন। তবে তবে বিজেপি সরকার বলছে, প্রতিবেশি দেশগুলোতে ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত মানুষদের সুরক্ষা দিতে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
-এ
