কারী উবায়দুল্লাহ: বিস্মৃত কোরআনের পাখি

কারী উবায়দুল্লাহ: বিস্মৃত কোরআনের পাখি

মুসান্না মেহবুব:

মাওলানা কারী উবায়দুল্লাহ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম জননন্দিত ও রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত কারী। সুমধুর কণ্ঠের তেলাওয়াতের জন্য তাঁকে কোরআনের পাখি হিসেবে অভিহিত করা হয়। একাধারে দীর্ঘ চার দশক তিনি রাষ্ট্রীয় রেডিও ও টেলিভিশনে কুরআন তেলাওয়াত করেছেন। সংসদ অধিবেশনের প্রারম্ভিকায়, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সূচনায় টানা কয়েক দশক তাঁর কণ্ঠেই বেজে উঠেছে কুরআন তেলাওয়াতের সুর-লহরী। রেডিও-টেলিভিশনে তাঁর আজানের সুমধুর ধ্বনি শুনে শুনে বিমোহিত হয়েছেন এ দেশের মানুষ।

জীবনভর কুরআনের আলো ছড়ানো মনীষী এ আলেমের ইন্তেকালের তিন বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ ডিসেম্বর তিনি পৃথিবীকে চির বিদায় জানান, কিন্তু এই তিন বছরে আমাদের স্মৃতির মনিকোঠা থেকে অনেকটা যেন বিস্মৃত হয়ে গেছেন তিনি। তাঁর জীবন এবং কর্ম নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজই হয়নি এতো দিনে। ২০ ডিসেম্বর অনেকটা নীরবেই বিগত হলো তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।

১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কোদালা এলাকার সম্ভ্রান্ত এক আলেম পরিবারে মাওলানা কারী উবায়দুল্লাহ’র জন্ম। তাঁর বাবা আল্লামা শাহ মেহেরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন চট্টগ্রামের বরেণ্য এক আলেম। বাবার কাছে প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পন্নের পর কিশোর বয়সে চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকার প্রাচীনতম মাদরাসা জামিয়া কুরআনিয়া লালবাগে ভর্তি হয়ে হজরত হাফেজ্জী হুজুর ও শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হকের শিষ্যত্ব ও সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে লালবাগ থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে মাত্র ১৮ বছর বয়সেই একই বছর লালবাগের উসতাদ হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।

১৯৬২ সালেই নাজিমুদ্দিন রোডে অবস্থিত রেডিও পাকিস্তান কেন্দ্রে প্রথম কোরআন তেলাওয়াত করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে শুরু হওয়া পাকিস্তান টেলিভিশন যত দিন ছিল ততদিন কারী উবায়দুল্লাহ সুমধুর কণ্ঠ দিয়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষকে। ১৯৭৫ সালে বিটিভি উদ্বোধন হয়েছিল তাঁরই তেলাওয়াতের মাধ্যমে । বাংলাদেশ পার্লামেন্টের সেই উদ্বোধনী অধিবেশন থেকে নবম পার্লামেন্ট পর্যন্ত আমাদের জাতীয় সংসদসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানসমূহের প্রারম্ভিকায় কুরআনের মধুর তেলাওয়াতে আচ্ছন্ন করে রাখতেন তিনি। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, নিউমার্কেট, হোটেল শেরাটনসহ জাতীয় অসংখ্য স্থাপনার উদ্বোধন হয়েছে তাঁর তেলাওয়াতের মাধ্যমে।

মাহে রমজানে রেডিও ও টেলিভেশনে যে কণ্ঠটি ধর্মপ্রাণ মুসলানদের সবচেয়ে বেশি আপ্লুত করতো সেটি কারী ওবায়দুল্লাহর। সাহরী ও ইফতারের সময় রেডিও-টিভির বিশেষ অনুষ্ঠানের হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনা ছাড়াও তাঁর অনন্য কুরআন তেলাওয়াত, আবেগময় কণ্ঠে আরবি-উর্দু-বাংলা ইসলামি গান-গজল ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে ঢেউ তুলতো।

যাদুকরী কণ্ঠে কোরআনের তেলাওয়াত করে দেশ ও জাতির জন্য বহির্বিশ্ব থেকে বয়ে এনেছেন বিরল সম্মান ও মর্যাদা। সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, লিবিয়া, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অন্তত ২০-২৫টি দেশে আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বারবার প্রথমস্থান অর্জন করেছেন। সৌদি বাদশাহ ফয়সাল ও খালেদ একাধিকবার তাঁকে কোরআনের শিল্পী বা কারী হিসেবে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন।

১৯৬২ সাল থেকে ঐতিহ্যবাহী চকবাজার শাহি মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন তিনি। অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর থেকে নামাজ পড়াতে না পারলেও মৃত্যু অবধি নিয়মিত সম্মানী দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করেছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, তিনি ২০০০ সালে প্রথমবারের মতো হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ওই সময় চিকিৎসা করার পর সুস্থ হয়ে ওঠেন। এর ছয় বছর পর ২০০৬ সালে ঢাকার বাইরে একটি ওয়াজ মাহফিলে যাওয়ার সময় পান্থপথ এলাকায় ব্রেনস্ট্রোকের শিকার হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা দু’মাস হাসপাতালে থেকেই চিকিৎসা গ্রহণ করেন তিনি। এসময় চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে ভারতের কলকাতায় নিয়ে এএমআরআই হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে ১৫ দিন চিকিৎসা দেয়া হলে কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে চলাফেরা করতে শুরু করেন।

কিন্তু দুবছর পর ২০০৮ সাল থেকে পরপর তিন বছর ব্রেনস্ট্রোকের শিকার হন। তারও দুবছরপর ২০১২ সালে সর্বশেষ ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তখন থেকেই রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের বাসায় অসুস্থ অবস্থায় দিনাতিপাত করে যান।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সরকার তাঁকে থাকার জন্য একটা বাড়ি বরাদ্দ দেয়। চকবাজার মডেল থানার চাঁদনীঘাট এলাকার গৌর সুন্দর রায় লেনের ৩৩/৩৭ নম্বর বাড়ির সাড়ে ৮ কাঠার মধ্যে ৪ কাঠা জমির বন্দোবস্ত দেয়া হয়। এই বাড়িতেই ২ স্ত্রী, ২ ছেলে ও ৬ মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। বিভিন্ন সরকারের সময়ে বাড়ির বরাদ্দ পাওয়া অংশটি তাঁর নামে সাব-কবলা দলিল করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। ফলে বরাদ্দের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। এই সুযোগে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গেজেটভূক্ত বাড়িটি মামলা ও জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করে নেয় স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল।

বাড়ি হারিয়ে বুড়িগঙ্গার ওপারে কামরাঙ্গীরচরে চলে যেতে হয় তাঁকে। কামরাঙ্গীরচরের নিজামবাগ এলাকার মাতবর বাজারে স্ত্রীর নামে কেনা জমিতে শাশুড়ির নামে প্রতিষ্ঠিত আক্তার বানু নুরানী মাদরাসা। এই মাদরাসার ভবনেই এসে আশ্রয় নেন কারী উবায়দুল্লাহ ও তাঁর স্ত্রী। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কামরাঙ্গীরচরের বাসায়ই ছিলেন। তবে মৃত্যুর আগে চিকিৎসার সুবিধার জন্য ধানমণ্ডিতে নিজের মেয়ের বাসায় যান।

সেখানেই ২০ ডিসেম্বর ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে পৃথিবীকে শেষ বিদায় জানান মাওলানা কারী উবায়দুল্লাহ। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করুন।

আগের সংবাদসব প্রস্তুতি সম্পন্ন: বুধবার থেকে শুরু জামেয়া রেঙ্গার শতবার্ষিকী মহাসম্মেলন
পরবর্তি সংবাদমুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের খুঁটির জোর কোথায়?