
মুসান্না মেহবুব
শিক্ষকরা হচ্ছেন জাতির সবেচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তি। শিক্ষকদের হাতেই গড়ে ওঠেন প্রজন্মের মেধাবী ও প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বরা। তাই পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসের সূচনা থেকেই শিক্ষকতা পেশা সবার কাছে সমানহারে সম্মানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরম সম্মানীয় এই শিক্ষক মহোদয়দের কেউ কেউ লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। হচ্ছেন অপমানিত। একসময় যে শিক্ষাগুরুরা মান্যবর ছিলেন এলাকার মাতব্বর থেকে নিয়ে প্রতিটা মানুষের কাছে, সে শিক্ষকদেরকেই আজ স্থানীয় ক্ষমতাসীন ক্যাডার বা নেতাদের ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়। চলতে হয় তাদের মর্জিমাফিক। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বাধ্য করা হয় তাদেরকে। অন্যথা হলেই শিকার হতে হয় অপমানের। কিংবা হারাতে হয় চাকরি অথবা বদলি নিতে হয় অন্যকোনো প্রতিষ্ঠানে।
সম্প্রতি পাবনার একটি কলেজে বিসিএস শিক্ষককে শিক্ষার্থী নামধারী কয়েক লোক মারধর করেছে। কলেজগেট দিয়ে বাইকে করে বের হবার সময় তাদের আক্রমণের শিকার হন ওই শিক্ষক। মারধরের সিসিক্যামেরা ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেলে এ কয়দিন থেকে সর্বস্তরের মানুষ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন।
এ ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে পাবনার ওই কলেজের ছাত্রলীগ কমিটির সকল কার্যক্রম স্থগিতও করা হয়েছে ইতিমধ্যে।
শিক্ষকরা কেন হচ্ছেন এমন লাঞ্ছনার শিকার, এমন বা এ ধরনের ঘটনা সম্প্রতি কেন বেড়ে চলেছে—এমন জিজ্ঞাসা নিয়ে কথা হয়েছিল চট্টগ্রাম ওসমান গনি কলেজের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইনের সঙ্গে।
ড. খালিদ বলেন, পাবনায় যা ঘটল একজন শিক্ষকের সঙ্গে, তা অতি ন্যাক্কারজনক এবং দুঃখ ও লজ্জার ব্যাপার। ছাত্ররা হাত তুলেছে শিক্ষকের ওপর, কল্পনা করা যায়?
পাবনার ওই শিক্ষকের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ড. আ ফ ম খালিদ আরও বলেন, এমন ঘটনা এই নতুন নয়। এমনটা দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় নিয়মিতই ঘটে চলেছে। এই তো কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ইন্টারভিউতে অংশগ্রহণ করতে এসেছিলেন একজন শিক্ষক। তিনি প্রচণ্ড মেধাবী এবং ভালো একজন ছাত্র ছিলেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাঁকে তাঁর মেধা ও প্রতিভার পুরস্কার দিয়েছিলেন। কিন্তু ইন্টারভিউ দিতে ঢোকার আগে চবি ছাত্রলীগকে তাদের নির্ধারিত ও দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় ইন্টারভিউ চলাকালে ভাইস চ্যান্সেলরের সামনে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় ছাত্রলীগের ক্যাডারেরা। এবং তারা এই চবিরই ছাত্র। নিয়োগ পরীক্ষা দিতে আসা ওই শিক্ষককে বাইরে নিয়ে তারা বেঁধে রাখে। শেষমেষ নিয়োগ পরীক্ষা আর দেওয়াই হয়নি তাঁর।
এই যে ভাইস চ্যান্সেলরের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া, তাঁকে বিন্দুমাত্র মূল্যায়ন না করা, এটা তো ভাইস চ্যান্সেলরের জন্যও মারত্মক মানহানিকর। কিন্তু তিনি কার্যত ক্ষমতার কাছে, ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকা এসব ছাত্রক্যাডারদের কাছে জিম্মি।
ড. খালিদ বলেন, শিক্ষকদের সঙ্গে এমন লাঞ্ছনাকর আচরণ ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় এবং তাদের আস্কারা পেয়েই হচ্ছে, এটা অস্বীকারের উপায় নেই। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যাচ্ছে-তাই করে বেড়াচ্ছে। এবং শিক্ষকদেরকে নানাভাবে হেনস্থা করছে।
ড. খালিদ আরও বলেন, শিক্ষকতা পেশা খুবই সম্মানজনক একটা পেশা। এ পেশার লোকজন জাতির মেরুড়ণ্ড তৈরি করে দেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলো পরিচালনার জন্য যোগ্য লোক গড়ে ওঠেন এদেরই তত্ত্বাবধানে। তাই এ পেশার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে তাদের যথাযথ সম্মান রক্ষা ও প্রদানের ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষকদের সঙ্গে লাঞ্ছনাকর আচরণ করলে আমাদের মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড আঘাত পড়ে, আঘাতে আঘাতে একদিন দেখব আমাদের পুরো মেরুদণ্ডই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।
তাই ক্ষমতাসীন দল বা অন্য যেকোনো দলের ছাত্র সংগঠনের ক্যাডাররা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং শিক্ষকদের সঙ্গে যে লাঞ্ছনাকর ও নৈরাজ্যবাদী আচরণ করছে, এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রশাসন নয়, রাজনৈতি ব্যক্তিবর্গ, বিশেষ করে ক্ষমতায় যারা আছেন তাদেরকে ব্যক্তস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সচেষ্ট ও সচেতন হতে হবে। যারাই শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ করবে, খারাপ ব্যবহার করবে দলীয়ভাবে তাদেরকে যদি কঠিন শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করানো যায়, তবে এ নৈরাজ্য ও লাঞ্ছনা বন্ধ হতে বেশিদিন সময় লাগবে না।
