গণপরিবহনে নারীদের শ্লীলতাহানি : যেভাবে প্রতিরোধ সম্ভব

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশে নারী ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নারীর শ্লীলতাহানি–এসব এখন নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরের বাইরে কোথাও যেন সামান্যতম নিরাপত্তা নেই নারীদের। বিশেষত গণপরিবহনে গাদাগাদি করে মানুষের যাতায়াতের কারণে নিয়মিতই শ্লীলতাহানির শিকার হন নারীরা। শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্র, বা অন্য কোনো জরুরতে যাতায়াতের জন্য বিকল্প না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে যাত্রীবোঝাই পাবলিক বাসগুলোতে উঠতে হয় নারীদের। কেউ কেউ অবশ্য বিকল্প থাকলেও অপেক্ষার ধৈর্য না থাকায় ভীড় ঠেলে উঠে পড়েন এসব বাসে। পুরুষদের সঙ্গে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকেন বাসের ভেতরে। ফলে চুপিসারে ঘটে শ্লীলতাহানির ঘটনা। কেউ কেউ নিজের মানসম্মানের দিকে তাকিয়ে চেপে যান ব্যাপারটা, কেউ আবার প্রতিবাদ করেন।

গণপরিবহনে নারীদের এই শ্লীলতাহানি কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, সে-ব্যাপারে কথা বলেছিলাম চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলেম লেখক ও ধর্মীয় আলোচক ড. আ ফ ম খালেদ হোসাইনের সঙ্গে।

ড. খালেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের পাবলিক পরিসরে কোথাও এখন নিরাপত্তা নেই নারীদের। রোজ রোজই ঘটছে ধর্ষণ থেকে শুরু করে নারীকে বিভিন্নভাবে হেনস্থা ও হয়রানি করার ঘটনা। ব্যাপকহারে সমাজের নৈতিক স্খলনের কারণেই ঘটছে এমন ঘটনা। পাবলিক পরিবহনে যে ঘটনাগুলো ঘটে, তা অনেক ক্ষেত্রেই সূক্ষ্ম। তবে একজন নারীর জন্য এমন ঘটনা মেনে নেওয়া কষ্টকর।

‘এমন ঘটনা প্রতিরোধে আমার পরামর্শ হচ্ছে পাবলিক পরিবহনগুলোতে নারীদের জন্য আলাদা একটা অংশ রাখা। এর মানে এই নয় যে, সামনের দিকে কয়েকটি সিট রেখে দেওয়া। এটা তো সব পরিবহনে আছেই। এটা তাদের জন্য অপ্রতুল। আমি যেটা বলছি, পরিবহনের পুরো একটা অংশ তাদের জন্য পাটিশন করে ছেড়ে দেওয়া। তাদের সে অংশটুকুর আলাদা দরোজাও থাকবে। পুরুষ যাত্রীরা সেখানে উঠতে পারবে না। কেবল মেয়েরা উঠবে মেয়েদের অংশে। আর পুরুষরা পুরুষদের অংশে উঠতে বাধ্য থাকবে। এখানে নারীরা উঠতে পারবে না। বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সিস্টেমটা আছে। আমাদের বাংলাদেশের আইন-কানুন আর সার্বিক পরিস্থিতির যা অবস্থা, এখানে এমনটা করা কতটা সম্ভব, তা অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু করাটা খুব কঠিন কিছু না। সরকারের একটু সদিচ্ছা থাকলেই সম্ভব। এমনটা করতে পারলে পাবলিক পরিবহনগুলোতে নারীদের নিয়মিত এসব হয়রানি থেকে অন্তত রক্ষা পাওয়া যাবে।

ড. খালেদ হোসাইন আরও বলেন, ‘অনেকে নারীদের জন্য পৃথক বাসের কথা বলেন, কিন্তু আমাদের চট্টগ্রাম শহরে দেখেছি, সিটি কর্পোরেশন ক’বছর আগে এমন বাস চালু করেছিল, কিন্তু মেয়েরা তারপরও সাধারণ বাসগুলোতে উঠছে। আসলে পৃথক বাস থাকলে অপেক্ষা বা বাস স্বল্পতার কারণে মেয়েরা সাধারণ বাসে উঠে যায়। তাই একই বাসে নারী-পুরুষের পৃথক পৃথক দুইটা অংশ রাখা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয়।

‘আশু সমাধানের জন্য আরেকটা ব্যবস্থা করা যায়। গণপরিবহনগুলোতে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা। এতে করে দুষ্ট চরিত্রের লোকেরা সাবধান হয়ে যাবে এমন অপরাধ করা থেকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সব বাসে তো আর এটা সম্ভব হবে না, ব্যস্ততম রুটগুলোতে যে কোম্পানিগুলোর বাস চলাচল করে, সে-কোম্পানিগুলোর প্রতিটার অনির্দিষ্ট দুই-তিনটা বাসে এমন ব্যবস্থা রাখতে যদি প্রশাসন বাধ্য করতে পারে, এবং তা ঢালাওভাবে প্রচার করা হয়, যে, বাসে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে, তবে এ সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

‘তবে সব কিছুর মূল হচ্ছে আমাদের বিচারব্যবস্থার ধীরগতি। অন্তত নারী বিষয়ক অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে যদি অপরাধীর সাজা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা যেত এবং সাজাটা হতো কঠোর, তবে অন্তত নারীরা কিছুটা হলেও রেহাই পেতেন।

‘গণপরিবহনে শ্লীলতাহানি বা অন্য যেকোনো হেনস্থা থেকে বাঁচতে নারীদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে, তাঁরা যেন যথাসম্ভব নিজের অভিভাবক বা পুরুষ আত্মীয় ছাড়া বের না হন। একান্তই বের হতে হলে শালীন পোষাকে যেন বের হন।

‘সর্বশেষ যে কথা, আমাদের সমাজের পুরো সিস্টেমটাই নৈতিক স্খলনের কারণে অধঃপতিত হয়ে গেছে। যার কারণে সমাজে পাপাচার বাড়ার পাশাপাশি নানা মাত্রিক অপরাধ বাড়ছে। ফলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র—সকলেই সীমাহীন অশান্তি আর পেরেশানির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ থেকে মুক্তির একমাত্র এবং সর্বশেষ পথ হলো ধর্মের দিকে ফেরা। ধর্মীয় বিধি-নিষেধে গাফলতি এবং আল্লাহভীতির অভাবেই এমনটা হচ্ছে।’

আগের সংবাদজয়পুরহাটে দুজন নিহতের মামলায় ৪৭ আসামি জেল-হাজতে
পরবর্তি সংবাদকালবৈশাখীর তাণ্ডবে গোপালগঞ্জে তিন শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত