চাষীরা পাচ্ছেন না ধানের ন্যায্য মূল্য, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা আমদানি করছেন চাল

ফাতেহ ডেস্ক

সরকারি হিসাবে ২০১৭ সালের বন্যায় প্রায় ১০ লাখ টন চালের উৎপাদন কম হয়েছিল। বন্যার পরে সব মিলিয়ে প্রায় ৮২ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার ও ব্যাংকঋণের সুবিধা নিয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা মূলত ওই চাল আমদানি করছেন। ওই বিপুল পরিমাণ চাল আমদানির ফলে বিপদে পড়েছেন দেশের কোটি কোটি বোরো চাষি।

উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু আমদানি করা চাল বাজার দখলে রাখায় চাষিরা হাটে-বাজারে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। চালকল মালিকেরা ধান না কেনায় দাম গেছে পড়ে। ফলে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান-চাল বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের। বর্তমান বাজারে বোরো ধানের মণ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। ন্যায্য দাম না পেয়ে বঞ্চিত কৃষক ক্ষোভে দুঃখে অভিনব এক প্রতিবাদ করেছেন টাঙ্গাইলের কৃষক আবদুল মালেক সিকদার। গত রোববার নিজের পাকা ধানের ক্ষেতে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে আগাম বৃষ্টি ও পরে হাওর অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার কারণে বোরো উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, চাল উৎপাদন ১০ লাখ টন কম হবে। এরপর চালের দাম বেড়ে যায়। সরকার বাজার সামলাতে নিজে আমদানি করে এবং বেসরকারি খাতের আমদানিকেও উৎসাহিত করে। এজন্য চাল আমদানির শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে পর্যায়ক্রমে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ব্যাংকে বিনা মার্জিনে এলসি খোলার সুবিধা দেয়া হয়। এরপর সব মিলিয়ে প্রায় ৮২ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে।

আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার ও ব্যাংকঋণের সুবিধা নিয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা মূলত ওই চাল আমদানি করছেন। ওই বিপুল পরিমাণ চাল আমদানির ফলে বিপদে পড়েছেন দেশের কোটি কোটি বোরো কৃষকরা। চাষিরা হাটে-বাজারে ধানের ভাল দাম পাচ্ছেন না। ফলে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান ও চাল বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষককে।
সূত্র জানায়, ওই সময় প্রতি মণ ধান বিক্রি হয়েছিল ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায়। এখন তা ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ধানের দাম কম হলেও চালের বাজারে তার তেমন প্রভাব পড়েনি। এখনো প্রতি কেজি ৪০ টাকায় নিচে বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রি হওয়া এই চালের বেশির ভাগই ভারত থেকে আমদানি করা।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চাল আমদানি ছিল রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ৩৯ লাখ টন। এর মধ্যে সরকারি আমদানি ছিল ৮ লাখ ৮৫ হাজার টন, বেসরকারি খাতে ছিল ৩০ লাখ সাত হাজার টন। তবে এর পর বোরো মৌসুমে দেশে চালের উৎপাদন ও মজুত ভালো হওয়ায় কৃষক বাঁচাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৮ সালের জুন মাসে চাল আমদানিতে বিদ্যমান শূন্য শতাংশ শুল্ক সুবিধা তুলে নেয়। আগের মতোই ২৮ শতাংশ শুল্ক বহাল করা হয়। এর পর থেকে বেসরকারি আমদানিকারকরা চাল আমদানির আগ্রহ হারিয়েছেন। তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই থেকে ২রা নভেম্বর পর্যন্ত চার মাসে চাল আমদানি হয়েছে মাত্র ৮৯ হাজার টন।
চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক একে এম লায়েক আলী বলেন, অনেক ব্যবসায়ী ও চালকল মালিক ভারত থেকে কম দামে চাল এনে বাজারে ছেড়েছেন। অনেকের গুদামে বিপুল পরিমাণ আমদানি হওয়া চাল রয়ে গেছে। এগুলোর প্রভাবে ধানের দাম বাড়ছে না।

খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বোরো মৌসুমে ১২ লাখ ৫০ হাজার টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০ লাখ টন সেদ্ধ ও দেড় লাখ টন আতপ চাল। এছাড়া ধান সংগ্রহ করা হবে দেড় লাখ টন (এক লাখ টন চালের সমপরিমাণ)। প্রতিকেজি ধানের সংগ্রহমূল্য ধরা হয়েছে ২৬ টাকা। কেজিপ্রতি সেদ্ধ চাল ৩৬ ও আতপ চালের সংগ্রহমূল্য ৩৫ টাকা ধরা হয়েছে। গত ২৫শে এপ্রিল শুরু হওয়া ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান চলবে আগামী ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো ধানও ওঠেনি খাদ্য বিভাগের গুদামে। কারণ ক্রয়ের খাতা শূন্য।

বাংলাদশে রাইস এক্সর্পোর্টাস অ্যাসোসয়িশেনের সভাপতি শাহ আলম বাবু বলেন, চাল রপ্তানি করা হলে ধান-চালের দাম বাড়বে। তবে এটা সাময়িক হলে চলবে না। রপ্তানি অব্যাহত রাখতে হবে।

ঢাকার বাবুবাজার-বাদামতলী আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী নিজাম উদ্দিন বলেন, চাল রপ্তানি হলে রপ্তানিকারকরা বেশি লাভবান হবে। পাশাপাশি হয়তো কৃষক ভালো দাম পাবে। তবে সেটা সাময়িক। স্থায়িত্ব কত দিন হবে সেটা বলা মুশকিল। তিনি বলেন, কৃষক দাম না পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো মিল মালিকরা। তাদের জন্যই কৃষক দাম পায় না।

আগের সংবাদফিলিস্তিনি শরণার্থী ক্যাম্পে ইফতারের আগ মুহূর্তে রকেট হামলা, নিহত ১০
পরবর্তি সংবাদইরানকে ভয় পাচ্ছেন ট্রাম্প ?