
রাগিব রব্বানি
ভারতের বিশিষ্ট দাঈ ডা. জাকির নায়েককে নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। মালয়েশিয়ার হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়ে করা একটি মন্তব্যকে ঘিরে ঘনঘন খবরের শিরোনাম হচ্ছেন তিনি।
২০১৬ সাল থেকে ডা. জাকির নায়েক মালয়েশিয়ায় স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন। কিছুদিন আগে তিনি তাঁর এক বক্তব্যে বলেছিলেন, মালয়েশিয়ার হিন্দুরা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের চেয়েও একশো গুণ বেশি অধিকার ভোগ করে।
এই মন্তব্যের জেরে সেখানকার হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়াশীল অংশ ডা. জাকিরকে মালয়েশিয়া থেকে বহিস্কারের দাবি তোলে। এমনকি দেশটির মন্ত্রীপরিষদের তিনজন মন্ত্রীও তাঁকে বহিস্কারের জন্য দাবি ওঠান।
২০১৬ সালে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ডা. জাকির নায়েকের দাওয়াতি কার্যক্রমের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রমকে ‘জঙ্গিবাদের উস্কানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচারেরও অভিযোগ আনে। ডা. জাকির তখন গ্রেপ্তার এড়াতে দেশত্যাগ করেন এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশে আশ্রয় কামনা করেন। কয়েকটি দেশে প্রত্যাখ্যাত হবার পর অবশেষে মালয়েশিয়ার তৎকালীন শাসকদল বারিসান ন্যশনালের প্রশাসন তাঁকে মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেয়। ফলে তিনি মালয়েশিয়ার একজন বৈধ নাগরিকে পরিণত হন।
কিন্তু মালয়েশিয়ার মুসলিম-বিদ্বেষী শ্রেণি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুসলিম এই দাঈর নাগরিকত্ব লাভকে ভালোভাবে নিতে পারেনি। তারা মিস্টার নায়েককে দেশটি থেকে বহিস্কারের একটা ছুঁতো খুঁজে ফিরছিল। অবশেষে সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়কে ঘিরে তাঁর প্রাসঙ্গিক ওই মন্তব্যটি পেয়ে যায় তারা এবং সেটাকেই রংচঙ মাখিয়ে বহিস্কার ইস্যুতে পরিণত করে।
প্রতিক্রিয়াশীল ওই অংশটির এ দাবির প্রেক্ষিতে গত ৮ আগস্ট মালয়েশিয়ার কোটাবারুতে একটি সম্মেলনে জাকির নায়েক বলেন, ‘আমি মালয়েশিয়ার বৈধ নাগরিক। বহিরাগত হিসেবে আমাকে যদি মালয়েশিয়া ছাড়তে হয়, তাহলে মালয়েশিয়ায় থাকা চীনাদেরই সবার আগে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া উচিত। কারণ তারাই মালয়েশিয়ার সবচেয়ে পুরানো অতিথি।
জাকির নায়েকের এই প্রতিমন্তব্যে বিতর্ক আরও তুঙ্গে ওঠে। ফলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ নিজের ভোটব্যাংকের কথা বিবেচনায় রেখে জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। গত রবিবার (১৮ আগস্ট) ৬২ তম আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট বিশ্ব পরিসংখ্যান কংগ্রেস ২০১৯ উদ্বোধন করার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ড. মাহাথির বলেন, মালয়েশিয়ার ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত ইস্যুতে কথা বলার সীমা লঙ্ঘন করেছেন জাকির নায়েক। এবং মালয়েশিয়ার ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা উসকে দিচ্ছেন।
এ সময় তিনি জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্তেরও নির্দেশ দেন। ফলে এ পর্যন্ত তিনবার ডা. জাকির নায়েক মালয় পুলিশের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। পাশাপাশি সারা দেশে তাঁর সবধরনের অনুষ্ঠান ও বক্তব্যও নিষিদ্ধ করা হয়।
পুলিশি জিজ্ঞাসার জেরে ডা. জাকির নায়েক গত মঙ্গলবার একটি বিবৃতি দেন। সেখানে তিনি জানান, তার কথাকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে উদ্ধৃত করা হচ্ছে এবং বিকৃত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে বিক্ষুব্ধ করা তার লক্ষ্য ছিল না।
তৃতীয়বারের মতো আজকে তাঁকে আবারও পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে। তাঁর ব্যাপারে মালয় পুলিশ এখনও তদন্তের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তদন্ত শেষ হবার আগ অবধি বলা যাচ্ছে না কী অপেক্ষা করছে তাঁর ভাগ্যে।
এদিকে ভারত থেকে তিনি চলে যাবার পর জঙ্গিবাদে উস্কানি ও অর্থপাচারের অভিযোগে দেশটিতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে বিজেপি সরকার ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার মালয় সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক অালাপ চালিয়েছে। তবে এতদিন মালয় প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ নিজেদের বৈধ নাগরিককে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, জাকির নায়েক তাঁর দেশে কোনো ধরনের অন্যায় বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণিত নয়। বিপরীতে ভারতের বেশ হুমকি-ধমকিও সয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাকির নায়েকের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে, তা এখনই বলা মুশকিল।
