তাবলীগের চলমান সংকটে উলামায়ে কেরামের সম্পৃক্ততা : প্রশ্ন ও পর্যালোচনা

তাবলীগের চলমান সংকটে উলামায়ে কেরামের সম্পৃক্ততা : প্রশ্ন ও পর্যালোচনা

সাবের চৌধুরী :

চলমান তাবলীগ-সংকট নিরসনে উলামায়ে কেরাম যুক্ত হলেন কেন? এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চলমান পরিস্থিতিতে এর ব্যাখ্যা হওয়া একান্ত দরকার। প্রশ্নটা আসলে কী? আমি মনে করি মোটা দাগে প্রশ্নটির তিনটি দিক রয়েছে।

এক. উলামায়ে কেরাম তাবলীগের পরিচালনাগত কোন বিষয় বা এ কাজের মুরুব্বির তত্ত্বগত ভুল-শুদ্ধ নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন না। সুতরাং, তারা কথা বলছেন কেন? এ প্রশ্নটি তুলছেন জেনারেল শিক্ষিত তাবলীগের সাথীগণ। এবং শুধু এখন না, তাঁদের এই মনোভাবটি বহু আগে থেকে লক্ষ্য করা গেছে।

দুই. কুরআন হাদীসের দৃষ্টিতে কোথাও কোন ভুল হলে সেটা নিয়ে তারা কথা বলতে পারেন বটে; কিন্তু এসব নিয়ে মাঠে নামতে পারেন না এবং সাংগঠনিক কোন বিষয়ে কথা বলা তাদের জন্য সংগত নয়। এ প্রশ্নটি করছেন আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবসহ কয়েকজন আলেম। সেই সাথে তাবলীগের কাজের সাথে জড়িত নন এমন সাধারণ মানুষের মনেও এ জিজ্ঞাসা রয়েছে।

এই দুটি প্রশ্নের উৎপত্তিই এই ধারণার উপর যে, আলেমগণ এ কাজের সাথে জড়িত নন, ফলে, তারা বাইরের লোক। এটা বোঝানোর জন্য তাঁরা বিশেষ একটি শব্দও ব্যবহার করছেন—নাক গলানো।

তিন. তৃতীয় আরেকটি দিক হলো, উলামায়ে কেরাম অবশ্যই কথা বলতে পারেন, সক্ষমতা অনুযায়ী সত্যকে প্রয়োগ করার জন্য মাঠ পর্যায়ে পদক্ষেপও নিতে পারেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে তারা যেভাবে কাজ করছেন, তার মধ্যে শৃঙ্খলা ও সুচিন্তিত কোন পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে সংঘাত হচ্ছে, এবং একে সামলে উঠার মত পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সক্ষমতা তাদের নাই। তাই, লাভের চেয়ে ক্ষতি হবে বেশি। এ প্রশ্নটি আসলে মৌলিক নয়, পদ্ধতিগত আপত্তি—তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এখন আমরা দেখি আসলে উলামায়ে কেরাম এ সংকট নিরসনের সাথে কতটুকু সম্পৃক্ত? এটি বুঝতে হলে আমাদেরকে আগে বুঝতে হবে—তাবলীগের সংকটটি আসলে কী? তাবলীগের চলমান সংকটটির দুইটি দিক আছে।

এক হলো—তাবলীগের ভেতরগত সাংগঠনিক বিভেদ ও ভাঙন। এই দ্বন্দ্বের শুরু হলো ১৯৯৬ সালে, মাওলানা সা’দ সাহেবের তৎকালে গঠিত শুরা সদস্য হওয়ার সূত্রে নেতৃত্বের পর্যায়ে আসার পর থেকেই। তাবলীগের প্রধান ও কেন্দ্রীয় মুরুব্বিদের অভিযোগ মতে, তিনি নেতৃত্বের পর্যায়ে এসেই নিজের ইচ্ছেমত কাজের সংস্কার, নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, কোরআন-হাদিস দ্বারা অসমর্থিত মন্তব্য-বক্তব্য দেওয়া এবং এসবের ভেতর দিয়ে পুরো তাবলীগের উপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য উঠে পড়ে লাগেন। ফলে, কেন্দ্রীয় মুরুব্বিদের সাথে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এ সংকট নিরসনের জন্য এবং ভবিষ্যত তাবলীগ যেন সব রকমের বিভেদ থেকে মুক্ত থেকে সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়, সে লক্ষে বিশ্ব তাবলীগের মুরুব্বিগণ ২০১৫ সালে একটি আলমি শূরার প্রস্তাব করেন। কিন্তু, সা’দ সাহেব সে শূরা প্রত্যাখ্যান করে নিজেকে একক আমির ঘোষণা করে নিজের এতাআত তথা আনুগত্যের উপর বাইয়াত নেওয়া শুরু করলে সংকট চূড়ান্ত রকমের ঘনীভূত হয় এবং অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

তখন আহমদ লাট সাহেব, ইবরাহিম দেওলা সাহেবসহ প্রবীন মুরুব্বিগণ নিজামুদ্দিন মারকাজ ছেড়ে চলে যান। পাকিস্তান নিজামুদ্দিনের সাথে পুরোপুরি সম্পর্কচ্ছেদ করে। সাদ সাহেবের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয় পুরো নিজামুদ্দিন মারকাজে। এ ভাঙনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় পুরো বিশ্ব তাবলীগে। পুরো পৃথিবীজুড়ে মারকাজের জিম্মাদারগণ ভেতরগত এ দ্বন্দ্বের ব্যাপারে পূর্ব থেকে অবগত ছিলেন, কিন্তু বৃহৎ স্বার্থে এ বিবাদকে তারা কখনো প্রকাশ্যে আনেন নি এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডেও একে দৃশ্যমান হতে দেন নি। কিন্তু, চূড়ান্ত আকার ধারণ করার পর এ ভাঙন রোধ করা আর সম্ভব ছিল না।

ফলে, পৃথিবীজুড়ে তাবলীগ আলমি শুরাপন্থী ও এতাআতপন্থী—এ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। বাংলাদেশের কাকরাইল মারকাজে এই দ্বন্দ্বের সাথে যুক্ত হয়েছে দ্বিতীয় আরেকটি দ্বন্দ্ব। এক যুগেরও বেশি সময় পূর্বে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে প্রবীন মুরুব্বি মরহুম মুশফিক স্যার কাকরাইলের ব্যাপারে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেন। মৌলিকভাবে তার অভিযোগের আঙুল ছিল জনাব ওয়াসিফ সাহেব, তার পরিবার ও তার কিছু সঙ্গী-সাথীর দিকে। ২০১৫ সালে এসে সে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। মারামারি এমনকি খুনের ঘটনা পর্যন্ত সংঘটিত হয়। ২০১৫ সালে রোড একসিডেন্টে মুশফিক স্যারের আকস্মিক মৃত্যু হলে এ বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।

আমার এতো দীর্ঘ কাহিনী বলার উদ্দেশ্য হলো—তাবলীগের মূল দ্বন্দ্ব এটিই। এই যে ভেতরগত বিপুল দ্বন্দ্ব, বিশ্বজুড়ে, কখনো কোন দেশেই সরাসরি ও ধারাবাহিকভাবে তাবলীগের কাজের সাথে জড়িত নন এমন উলামায়ে কেরাম এসব সংকটের সাথে সম্পৃক্ত হননি। সর্বদা বলে এসেছেন, এটা আপনাদের একান্ত ঘরোয়া বিবাদ, একে আপনারাই শেষ করুন। দারুল উলূম দেওবন্দ বার বার এ কথাটি বলে আসছে। উলামায়ে কেরাম বাইরে থেকে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে উভয় পক্ষকে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। দেওবন্দ মাদরাসার উস্তাদ আরশাদ মাদানি নিজে গিয়ে মাওলানা সা’দ সাহেবকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। আমি সরাসরি আমার উস্তাদদেরকে দীর্ঘদিন যাবত এ নিয়ে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কাজ করতে দেখেছি। সর্বশেষ যখন কাকরাইলে প্রকাশ্যে গণ্ডগোল হতে শুরু করলো, তখন সরকারী হস্তক্ষেপে কাকরাইলের মুরুব্বিদের আগ্রহের ভিত্তিতে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট উলামাদের একটি উপদেষ্ট কমিটি বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তাবলীগের চলমান সংকটের দ্বিতীয় দিকটি হলো—কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে জনাব মাও. সা’দ সাহেবের বিতর্কিত বক্তব্যসমূহ। তার বক্তব্যগুলো নানা রকমের। কিছু আছে সরাসরি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক, কিছু আছে স্বীকৃত অনেক মাসআলার সাথে সাংঘর্ষিক, কিছু আছে শরীয়তের মৌলিক চিন্তা, দর্শন, মেজাজ-রুচি ইত্যাদির সাথে সাংঘর্ষিক। এই বক্তব্যগুলো তিনি দীর্ঘদিন যাবত সময়ে সময়ে দিয়ে আসছেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো কিন্তু শুধু তাঁর নিজস্ব দর্শন হিসেবেই বহাল থাকে নি, পাড়ায়-মহল্লায় সাধারণ তাবলীগি সাথীদের মুখে মুখে চলে এসেছে, এবং তাদের কর্মের মধ্যে এর খারাপ প্রতিক্রিয়া তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। আমি নিজে চিল্লার সাথী। আমার পরিবার তাবলীগের দস্তরখানে বেড়ে উঠেছে। আমি নিজ চোখে দেখেছি কীভাবে দাবানলের মত বিষয়গুলো পাড়ায়-মহল্লায় ছড়িয়েছে।

এর দুইটি প্রধান প্রবণতা হলো, এই পদ্ধতির দাওয়াতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নন, বা ধারাবাহিকভাবে সম্পৃক্ত নন—এমন আলেমদের প্রতি তাচ্ছিল্যপূর্ণ মনোভাব এবং এমন জনসাধারণের প্রতি করুণার দৃষ্টি রাখা; দাওয়াতের পদ্ধতিকে, এমনকি পূর্ণ দীনকে তাবলীগের ছয় উসূলের মধ্যে সীমিত জ্ঞান করে অন্য সকল কর্মকাণ্ডকে তু্চ্ছ ও মূল্যহীন করে দেখা। চিন্তাগত দিক থেকে এর আরেকটি প্রবণতা হলো জাগতিক উপকরণ অবলম্বনকে ঈমানের অসম্পূর্ণতা জ্ঞান করে সমাজে অযথা বিতর্ক তৈরী করা। একে চিন্তাগত দিক থেকে বিবেচনা করেছি এবং অযথা বিতর্ক বলে চিহ্নিত করেছি, কারণ, বাস্তব জীবনে এই মতের প্রবক্তারা নিজেরাও পরিপূর্ণরুপে পার্থিব উপকরণকে অবলম্বন করে থাকেন।

তো, এসবের কারণে কওমি-অকওমি এবং ইসলামের মূল শিক্ষা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল লোকজন—সবাই একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে আসছিলেন, এবং তাদের ভেতরে এই বিভ্রান্তিগুলো নিয়ে একটা অসন্তোষ তৈরী হয়ে ছিল। নানা দিক থেকে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছিল। কিন্তু, কওমি উলামায়ে কেরাম প্রকাশ্যে ও ব্যাপকভাবে এসব নিয়ে কথা বলেননি মূলত দুইটি কারণে—

প্রথমত, এই কাজের সাথে বিপুল মানুষ সম্পৃক্ত। এটি অনেক বড় একটি সমাজ। যদি প্রকাশ্যে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়, তাহলে ভুল বোঝাবুঝি হয়ে বিরাট গণ্ডগোল দেখা দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, তারা দেখছিলেন, নানা ভুল-চুক সত্ত্বেও এই পদ্ধতিটির দ্বারা বিপুল পরিমাণে কাজ হচ্ছিল। এই দিকটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে—’এই সাধারণ লোকগুলো নতুন নতুন দীনের পথে এসেছে, পাপ-পঙ্কিলতার পথ ছেড়ে দীনের পথে উঠে এসে মেহনত করছে, থাকুক কিছু ভুল-চুক নিয়ে, ধীরে একসময় ঠিক হয়ে যাবে’—এমন একটা মনোভাব নিয়ে তারা স্মিতহাসিতে এগুলো এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। এর ভেতর দিয়েই ব্যক্তিগত পরিসরে উলামায়ে কেরাম যথাসাধ্য সংশোধনের কাজটি করে যাচ্ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার অভিজ্ঞতা হলো, এই অজুহাত ছাড়াও এই ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের গাফিলতিও দায়ী। তারা এগুলোর সংশোধনের জন্য যেরকম গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা দরকার ছিল, সেভাবে আসলে কাজ হয় নি। সেটা অন্য প্রসঙ্গ।

বিভ্রান্তিকর বয়ানের ব্যাপারে দারুল উলূম দেওবন্দ যখন মাও. সা’দ সাহেবের সাথে বার বার যোগাযোগ করেও মীমাংসা করতে পারে নি, তখন ব্যাপক ক্ষতির আশংকা করে তারা প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করে বিবৃতি দেন এবং নতুন একটি বাতিল ফিরকার উদ্ভবের ব্যাপারে নিজেদের আশংকা ব্যক্ত করেন। তখন বাঙলাদেশসহ সকল দেশের উলামায়ে কেরাম এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একাত্মতা পোষণ করেন। তাবলীগের চলমান সংকটের সাথে উলামায়ে কেরামের সম্পৃক্ততা মূলত এই সময় থেকে, এই আঙ্গিকে এবং তত্ত্বগত এই সংকটটির সাথে। বর্তমানেও তারা এই দিকটির সাথেই সম্পৃক্ত আছেন। এর বাইরে তাদের সাংগঠনিক বিভেদ ও ভাঙন সংক্রান্ত নানা বিষয়ের সাথে না তারা পূর্বে জড়িত ছিলেন, না এখন জড়িত আছেন। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো, দারুল উলূম দেওবন্দ এ ব্যাপারে ফতোয়া দিয়েছে না নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করেছে, এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা কী বলেছে, সেটা। এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সা’দ সাহেবের ব্যাপারে যে অভিযোগ উঠেছে তা কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করা। প্রতিষ্ঠান এখানে মূল বিষয় নয়।

মাও. সা’দ সাহেব যে বিতর্কগুলো তৈরী করেছেন, এর অন্যতম একটি হলো ‘ইমারত’ তথা নিজেকে একক আমির বলে ঘোষণা করা। ইসলামে আমিরের ধারণাটি দুই রকম। এক হলো, ইমামতে কুবরা বা ইসলামি রাষ্ট্র-পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ। এর জন্য আনুগত্যের বাইয়াত নেওয়া হয়। আরেকটা হলো, ইমামতে সুগরা বা জামাতবদ্ধ হয়ে কাজ করা হয় এমন দীনি ছোট-বড় বিষয়ে নেতৃত্ব দান। এই নেতৃত্বের জন্য বাইয়াত নেওয়ার কোন কথা নেই। কিন্তু, উভয় নেতৃত্বের জন্যই কোন অথরিটি কর্তৃক নির্বাচিত হওয়াটা জরুরী। কিন্তু, মাও. সা’দ সাহেব একদিকে যেমন কোন অথরিটি কর্তৃক নির্বাচিত নন, অপরদিকে বিষয়টি ইমামতে সুগরা হওয়া সত্ত্বেও একে তিনি ইমামতে কুবরার আবহে নিয়ে এসে তাবলীগের সাথীদের থেকে আনুগত্যের বাইয়াত নেওয়া শুরু করেন। তার অনুসারীরা তাকে ‘বিশ্ব আমীর’ বলে ঘোষণা করতে থাকে, এবং সকলের জন্য বাইয়াত নেওয়া আবশ্যক—এমন প্রচারণা চালায়। তাবলীগের সাংগঠনিক সংকট চূড়ান্ত আকার ধারণ করে মৌলিকভাবে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই।

এটা একদিকে যেমন তত্ত্বগত সংকট, সে হিসেবে উলামায়ে কেরাম তার এ দাবিকে নাকচ করেছেন; অপরদিকে সাংগঠনিক সংকট হওয়া সত্ত্বেও এটি যেহেতু বিশ্ব মুসলিম সমাজের মধ্যে অনেকটা গৃহযুদ্ধের আবহ তৈরী করছে, তাই সে দিক থেকেও উলামায়ে কেরাম এ নিয়ে কথা বলেন এবং তাকে এ কাজ থেকে বিরত হওয়ার আহ্বান জানান। কেননা কোন সংকট যখন সংগঠনের ভেতর-আঙিনা পেরিয়ে বৃহত্তর মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে রোধ করার জন্য উলামায়ে কেরামের চেষ্টা করা তাদের বিশেষ দায়িত্বের ভেতরে পড়ে।

এখন আমি প্রশ্নের উত্তরগুলো নিয়ে কথা বলি। প্রথম দলের দাবি মতে, তাদের সাংগঠনিক ও তত্ত্বগত কোন বিষয় নিয়েই উলামায়ে কেরাম কথা বলতে পারেন না। এ দাবি নিতান্তই অসঙ্গত। হযরত ইলিয়াস (রহ.)-সহ পরবর্তী হযজরতজী ইউসুফ ও ইনআমুল হাসান (রহ.) এর সময়কালের ব্যাপারে যারা ধারণা রাখেন, তারা জানবেন তাঁরা সর্বদাই উলামায়ে কেরামকে এ কাজের মুরুব্বি ও পরামর্শদাতা হিসেবে মেনে এসেছেন। আর তত্ত্বগত দিকটি তো অবশ্যই উলামায়ে কেরাম দেখবেন। এটা আল্লাহ তাআলা ও নবী কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব। তারা যে দায়ভার থেকে কাদিয়ানি ফিতনা, শিয়াইজম, বেরলভিবাদ, চরমপন্থি লা-মাযহাবি, মাজারপূজা, মাওলানা মওদুদি সাহেবের ভুল চিন্তাধারা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন, সে দায় থেকেই এ ফিতনা সম্পর্কেও কথা বলছেন। এটা তাদের দায়িত্ব।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি যারা করছেন, তাদের অবশ্যই বোঝা উচিত, উলামায়ে কেরাম তো তাবলীগের সাংগঠনিক কোন বিষয়ে ‘নাক’ কখনো গলান নি। তারা কুরআন-হাদীসের আলোকে তত্ত্বগত বিষয় নিয়েই কথা বলছেন। প্রশ্নকারীগণ সুনির্দিষ্ট করে বার বার বলছেন, কে আমীর হবেন, বা আমীরের মাধ্যমে চলবে নাকি শূরার মাধ্যমে চলবে—এগুলো তাবলীগের সাংগঠনিক বিষয়। উলামায়ে কেরাম এটা নিয়ে কথা বলা ঠিক নয়। এ ব্যাপারে পূর্বেই বলে এসেছি। সে কথাগুলো সামনে রাখলে ‘ইমারত’ নিয়ে উলামায়ে কেরাম কোন দিক থেকে কথা বলছেন, তার যৌক্তিকতা পরিস্কার হবে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেটা—উলামায়ে কেরাম যদি সাংগঠনিক সংকট নিযে কথা না-ই বলেন, তাহলে তারা তত্ত্বগত সংকটটির ব্যাপারে দারুল উলূম দেওবন্দের মত নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করেই ক্ষান্ত হলেন না কেন? কেন মাঠে নামলেন? ইন্ডিয়া-পাকিস্তান-ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইত্যাদি জায়গায় আলেমরা তো সরাসরি প্রতিরোধে নামেন নাই, বাংলাদেশের আলেমগণ নামলেন কেন?

এখানে আমি মনে করি, আমাদেরকে বাঙলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটটা বোঝা উচিত। বাঙলাদেশের বাইরে পাকিস্তান ছাড়া আর কোন দেশে উলামায়ে কেরাম মাঠে নামার মত পরিস্থিতি আছে কী? আর, পাকিস্তানে তো নামার দরকারই হয় নাই। সুতরাং, অমুক দেশ কেন নামে নাই—এই প্রশ্ন ছেড়ে আমাদের এই প্রশ্ন করা উচিত যে, মৌলিকভাবে মাঠে নামাটা সঙ্গত কিনা?

দেখুন, মাঠে নামা বলতে আমরা যেটা চট করে বুঝে ফেলি—তেজী মিছিল, একের পর এক প্রতিবাদ সমাবেশ, নানা আক্রমণাত্মক কর্মসূচি। এগুলো কিন্তু কখনো হয় নি। যেটা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরামের আলোচনা সমাবেশ।আর হয়েছে জেলায় জেলায় ওজাহাতি জোড় বা বিষয় সুস্পষ্টকরণ সমাবেশ। যে কোন সংকট নিয়ে এটা তারা করতে পারেন। অতীতেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এরকম হয়েছে। একটা তত্ত্বগত সমস্যা যখন বৃহত্তর মুসলিম সমাজের পাড়ায়-মহল্লায়, মসজিদে মসজিদে এমনকি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক সমস্যায় রূপ নেয়, তখন সেগুলোর ব্যাপারে দেশব্যাপী সতর্কীকরণ সমাবেশ করা তো দোষণীয় নয়। একটা অভিযোগ করা হয়—ওজাহাতি জোড়ে গরম গরম ভাষণ দেওয়া হয়েছে। এটা কতটুকু সত্য? বা যেভাবে বলা হচ্ছে সেভাবে সত্য কিনা? ওজাহাতি জোড়ের আলোচনাগুলো শুনলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে।

চলমান পদক্ষেপকে কেউ কেউ রাজনীতি সূত্রতায় অভিযুক্ত করতে চান। এটা ভুল চিন্তা। চলমান এই পদক্ষেপের সাথে সারা দেশব্যাপী কোন শ্রেণীর উলামায়ে কেরাম যুক্ত হয়েছেন এবং কী পরিমাণে, সে দিকে লক্ষ্য করলে রাজনৈতিক কর্মসূচি আর এর মধ্যে পার্থক্য বোঝা যায়। উলামায়ে কেরাম প্রতিবাদে নেমেছেন টঙ্গির সন্ত্রাসী ঘটনার পর। এ ঘটনার পর প্রতিবাদে মাঠে নামা অবশ্যই সঙ্গত।

তারপরও একটা কথা আমি স্বীকার করি, উলামায়ে কেরামের সার্বিক পদক্ষেপে নানা অসঙ্গতি থাকতে পারে। এর মূল কারণ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অনৈক্য এবং নানাবিধ কাঠামোগত দুর্বলতা। আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অক্ষমতা সামনে রেখে সে আলোকে সেগুলোর সমালোচনা হওয়া একান্ত দরকার। কোথায় কী ভুল হচ্ছে এবং কীভাবে কী করা দরকার—এসব নিয়ে আমাদের সকলেরই আপন আপন অবজার্ভেশন থেকে পরামর্শ হাজির করা উচিত।

চলমান ইস্যুতে আমার ব্যক্তিগত দুইটি কথা আছে—
এক. এখন আমাদের উচিত হবে, উপস্থিত পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তৃণমূল পর্যায় থেকে রোগকে সারিয়ে আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা। এ কাজের আওতায় সাদপন্থী তাবলীগি ভাইদেরকেও শামিল রাখতে হবে, যেন, জোর-মিল-মহব্বতের সেই আনন্দময় শ্লোগান পুনরুজ্জিবীত হয়। সেই সাথে বৃহত্তর উলামা সমাজের মধ্যেও যে অসঙ্গতিগুলো রয়ে গেছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে সংশোধনের চেষ্টা করা।

দুই. এই লোকগুলোর এমন ভুল প্রবণতা গড়ে উঠার পেছনে মাও. সা’দ সাহেবের ভূমিকা আছে, পাশাপাশি আরেকটি ব্যাপার আছে। হযরত মাও. ইলিয়াস (রহ.) যেমনটি চেয়েছিলেন, এই কাজের মাধ্যমে মানুষ দীনের প্রাথমিক ও মৌলিক স্পিরিট এবং শিক্ষাটি পাবে, এরপর পূর্ণ দীনের পথে এগিয়ে যাবে। কিন্তু, ধীরে ধীরে এমন হয়ে গেছে যে, নেসাব ও নির্দিষ্ট আমলগুলো পালন হচ্ছে কিনা—এ ব্যাপারে গুরুত্বের সাথে তদারকি থাকলেও, সাথীগণ পূর্ণ দীনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে কিনা—এ ব্যাপারটির তদারকি হয় না। যার ফল হয়েছে এই যে, ব্যাপকভাবে সাধারণ সাথীগণ ক্ষুদ্র একটি সিস্টেমের ভেতরে বন্দি হয়ে গেছেন, সে অনেক দিন হলো। ফলে, আমি বিশ্বাস করি, এখন যে সাথীগণ উলামায়ে কেরামের সাথে আছেন, তাদের অনেকের মধ্যেও অসমর্থিত অনেক চিন্তা ও কর্ম রয়ে গেছে আগের মতই। তাই আমি মনে করি, মাও. সা’দ সাহেব এবং সাদপন্থী সাথীগণের ইসলাহের পাশাপাশি উলামাপন্থী সাথীগণসহ তত্ত্বগত দিক থেকে ব্যাপকভাবে পুরো তাবলীগের সংশোধনের জন্য কাজ করা একান্ত দরকার। বিপুল পরিমাণ সাথী যেহেতু উলামায়ে কেরামের হাতে নিজেদেরকে ন্যাস্ত করেছেন, তাই এ কাজের এখনই সুবর্ণ সুযোগ। তাহলে আমরা সত্যিকার অর্থে ভালো একটি ফলাফলের আশা করতে পারি।

লেখক: আলেম, গবেষক

আগের সংবাদসালের অভিজ্ঞতা : আলেম সাথিদের জবানে
পরবর্তি সংবাদ‘আমার ইজতেমা’: অংশগ্রহণকারীদের জবানে টঙ্গীর অভিজ্ঞতা