রাগিব রব্বানি :
উপমহাদেশের প্রখ্যাত মনীষী আলেম হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলায়হি সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীনী সচেতনতা তৈরি ও ফরজ পরিমাণ ইলম অর্জনের জন্য দাওয়াত ও তাবলীগের যে বিস্ময়কর ধারা চালু করে গিয়েছিলেন, আজ তা বিশ্বের আনাচে কানাচে সমাদৃতি ও ব্যাপৃতি লাভ করেছে। শুরু থেকেই ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলায়হি’র একান্ত চাওয়া ছিল—তাবলীগের বিশেষায়িত এই মেহনতে যেন উলামায়ে কেরাম ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং বেশি করে সময় লাগান। তাই সদ্য দাওরা ফারেগ আলেমদেরকে দরস-তাদরিস বা পেশাগত ব্যস্ততায় জড়িয়ে যাবার আগে টানা একবছরের জন্য তাবলিগের কাজে সময় দেওয়ার বিশেষ এক রীতি রয়েছে তাবলিগে। তাবলিগের পরিভাষায় যেটাকে ‘সাল’ বলা হয়।
প্রতি বছর দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা শেষ হবার পর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাদরাসা থেকে সদ্য ফারেগ নবীন ওলামায়ে কেরামের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ‘সালে’ বের হন। সদ্য ফারেগ আলেম ছাড়াও পেশাগত কাজে জড়িয়ে যাওয়া আলেমদের একটি অংশও বিভিন্ন সময়ে সালে বের হন। দুনিয়াবি সকল বিষয়-আশয় একপাশে রেখে পুরো একটি বছর মানুষের দ্বারে দ্বারে দীনের দাওয়াত নিয়ে ঘুরে বেড়ান তাঁরা। তাবলিগে দীর্ঘ একটা সময় ব্যয় করবার কারণে সাধারণ মানুষের দীনী অবস্থা অত্যন্ত কাছ থেকে এবং তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করবার সুযোগ হয় তাঁদের। মুখোমুখি হন নানা ধরনের পরিস্থিতির, অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হয় অনেক গল্প। এমনই কিছু গল্প শুনতে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে কথা বলেছিলাম সালে সময় ব্যয়কারী দুজন আলেম সাথির সঙ্গে।
মুসল্লি-শূন্যতায় মসজিদের হাহাকার
রাজধানীর বনশ্রী-আফতাবনগর জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতী ইমরান। ২০১১ সালের মে থেকে ২০১২ সালের মে অবধি—টানা একবছর তাবলিগে সময় লাগিয়েছেন। ‘গাট্টি’ মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন শহর বন্দর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। জামাতবন্দী হয়ে মসজিদে রাত কাটিয়েছেন আর দিনের বেলা ঘুরে বেড়িয়েছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে।
মুফতী ইমরান তাঁর একবছরের এই অভিজ্ঞতা থেকে জানান, দীনের ব্যাপারে সাধারণ মুসলিম জনগণ কতটা উদাসীন এবং গাফেল, এক বছরে তাঁর সেই উপলব্ধিটা তীব্রভাবে হয়েছে। মসজিদের সঙ্গে মানুষের মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই, দীনের জরুরত পরিমাণ ইলমও নেই বড় একটি অংশের কাছে। কালেমাটুকু তাঁরা শুদ্ধ করে পড়তে পারে না।
তিনি বলেন, ঝিনাইদহে আমাদের একটা সফর ছিল। জামাত নিয়ে যে মসজিদগুলোতে উঠেছি, তার অধিকাংশই মুসল্লির অভাবে হাহাকার করছে। ঝিনাইদহ শহরের ক্যাডেট কলেজের পাশের একটি মসজিদে তিনদিন আমরা থেকেছিলাম। মসজিদটিতে একজন মাত্র ব্যক্তি, পাঁচ ওয়াক্তে এসে আজান দেন, একা একাই নামাজ পড়েন, কোনো মুসল্লি নেই। কোনো কোনো সময় আসর এবং মাগরিবে দু-একজন মুসল্লি পাওয়া যায়, তখন তিনিই ইমামতি করেন ছোট্ট জামাতটির। কিন্তু ফজর এবং এশার নামাজে তিনি একাই মসজিদকে আবাদ করে রেখেছেন। আমরা যাবার পর তাঁর সুরা-কেরাত পড়ার অবস্থা দেখে আরও ব্যথিত হয়েছি। অশুদ্ধ উচ্চারণ, ভুল তেলাওয়াত। মাসআলা-মাসায়েলও জানা নেই। গোসলের ফরজ কয়টি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন ১৫টি!
মুফতি ইমরান বলেন, ওই এলাকার অধিকাংশ মসজিদ এবং মুসল্লির হালত এমনই। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি তাদেরকে মেহনতের উপর উঠিয়ে আনতে। এসব এলাকা সফর করলে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের পেছনে দীনি মেহনতের কতটা প্রয়োজন এবং জরুরত রয়েছে।
‘সালে বেরোলে উম্মাহ নিয়ে ‘ফিকির’ তৈরি হয়’
মাওলানা নাজমুল হাসান। বর্তমানে কাতারে আছেন ইমামতির খেদমত নিয়ে। ২০০৯-১০ সালে বাংলাদেশে এক বছরের জন্য সময় ব্যয় করেছেন তাবলীগে। এই একবছর ঝালকাঠি, রংপুর, টাঙ্গাইল ইত্যাদি এলাকায় আরব ও পাকিস্তানি জামাতের সঙ্গে যেমন কাজ করেছেন, তেমনি মাদরাসাছাত্র ও সাধারণ বাংলাদেশি সাথিদের নিয়েও মেহনত করেছেন। তাঁর একবছরের তাবলিগি মেহনতের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি জানান, সালে বেরোলে দীনের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা উদাসীনতা বিরাজমান সেটার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। সেই সঙ্গে দীন থেকে দূরে থাকা মুসলিম ভাইদের কীভাবে দীনের পথে ফিরিয়ে আনা যায়, সে ব্যাপারে একটা ‘তড়প’ ও ফিকির তৈরি হয় নিজের ভেতর। একটা হাহাকার জন্মে উম্মতের দীনবিমুখিতা দেখে।
তিনি বলেন, মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ঈমানের দাওয়াত প্রদান করতে গেলে নিজের ঈমানটাও মজবুত হয়। শত শত মসজিদ মুসল্লিদের অভাবে বিরান পড়ে আছে, মসজিদগুলোকে আবাদ করার জন্য অল্প হলেও কিছু মেহনত করা যায় তাবলীগের মাধ্যমে, স্থানীয় মানুষের মধ্যে একটা জযবাও তৈরি করা যায়। যা পরবর্তীতে পুরো একটা এলাকাকে বদলে দিতে পারে।
বিদেশি জামাতের মেহনত
সালে যে সমস্ত আলেম বের হন, কাকরাইল থেকে পালাক্রমে তাঁদেরকে আরব ও উর্দুভাষী বিদেশি জামাতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। কারণ, আরবি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শিতার কারণে তাঁরা বিদেশিদের মুতারজিম বা অনুবাদক হিসেবে কাজ করতে পারেন। মুফতী ইমরান ও মাওলানা নাজমুল হাসানও একবছরে আরব ও পাকিস্তানি একাধিক জামাতের সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে জানাচ্ছেন আরব ও পাকিস্তানি জামাত মানুষের মধ্যে দীনের দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নিবেদিতপ্রাণ। তবে মাওলানা নাজমুল হাসান বলছেন, পাকিস্তানিদের মধ্যে দাওয়াতের জযবাটা বেশি। আর মুফতী ইমরান জানিয়েছেন, আরবদের বয়ান ও দাওয়াতের ধরণ অন্য সবার থেকে আলাদা এবং অধিক হৃদয়গ্রাহী।
মাওলানা নাজমুল হাসান পাকিস্তানি জামাতের কারগুজারি শোনাতে গিয়ে বলেন, একবার এক মসজিদে আমরা অবস্থান করছিলাম। খুসুসি গাশতে স্থানীয় এক মুসল্লিকে তাশকিলের জন্য তিনজন পাকিস্তানি গিয়েছেন তাঁর বাড়িতে। লোকটা কোনোক্রমেই বেরোবে না তাবলীগে। কিন্তু পাকিস্তানিরা তাঁকে নিয়েই আসবে, এমন একটা হিম্মত তাদের। তো, তাদের একজন দোআয় বসে কান্নাকাটি শুরু করে দিলো আল্লাহর দরবারে, আরেকজন জিকিরে মশগুল হলেন, আর অন্যজন ওই লোকটিকে দাওয়াত দিতে থাকলেন। লোকটার স্ত্রী তাদের এই অবস্থা দেখে তাকে বলল, এই বিদেশি মুসাফিররা কোনো স্বার্থ ছাড়াই তোমার কাছে এসেছে কেবলই তোমার উপকারের জন্য। এদেরকে ফিরিয়ে দিলে আখেরে তোমার ভালো হবে না। যাও, আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে যাও। লোকটার মনও নরম হয়ে আসলো। সে তৎক্ষনাৎ তাদের সঙ্গে মসজিদে এসে চিল্লার জন্য নাম লিখিয়ে নিলো।
মাওলানা নাজমুল এমন আরেকটি কাগুজারি শোনান পাকিস্তানি জামাতের। আরেক এলাকায় এ রকম এক ব্যক্তিকে বারবার দাওয়াত দেওয়া হয়, সে চিল্লায় যাওয়া তো দূরের কথা মসজিদেই আসে না। তাবলিগের সাথি দেখলে এখন পালিয়ে বেড়ায়। পাকিস্তানি সাথিরা তাঁর সম্বন্ধে বিস্তারিত শুনে প্রতিজ্ঞা করল, একে যেভাবেই হোক আল্লাহর রাস্তায় বের করতে হবে। একদিন তাঁকে দাওয়াত দিতে খুসুসি গাশতে যাওয়া হলো। লোকটি তাবলীগি লোকজন দেখে দৌড় দিলো তাদের সঙ্গে সাক্ষাত এড়াতে। এক পাকিস্তানি সাথিও পেছন পেছন দৌড় দিলেন। দৌড়াতে দৌড়াতে একটা খালের কিনারে এসে লোকটি লাফ দিয়ে খাল পেরিয়ে গেল, কিন্তু পাকিস্তানি সাথি লাফ দিতে গিয়ে পড়ে গেল খালে। কাদায় ভরে গেল তার জামাকাপড় এবং পুরো শরীর। লোকটি পেছন ফিরে তাকিয়ে বিদেশি মুসাফিরের এই অবস্থা দেখে আর সামনে পা বাড়ালো না। ফিরে এসে পাকিস্তানিকে হাত ধরে টেনে তুলে মসজিদে নিয়ে এলো। এবং তৎক্ষনাৎ চিল্লার জন্য নাম লেখালো তাদের কাছে।
মুফতী ইমরানও পাকিস্তানি সাথিদের নিবেদিতপ্রাণ কাজের কথা বলেছেন। বান্দরবানের দুটো উপজেলায় মসজিদগুলোতে তাবলিগের কাজ একদম অনুল্লেখ্য ছিল। পাকিস্তানি সাথিদের সঙ্গে সেখানে তাঁর রুখ পড়েছিল। ৫০ দিনের মেহনতে দুই উপজেলায় তাবলিগের কাজকে পুরোদমে সচল ও চাঙ্গা করে এসেছিলেন তাঁরা।
তবে আরব জামাতের দাওয়াতি কাজে আলাদা একটা শক্তি ও কৌশল আছে বলে জানান মুফতী ইমরান। তিনি বলেন, এঁরা কথা দিয়ে মানুষের দিল নরম করতে পারেন সহজেই। অনুরূপ বয়ানেও তাঁরা বেশ পটু এবং কৌশলী। সহজেই যে কেউ আকৃষ্ট হয়ে যায় তাদের দাওয়াতে।
একটা কারগুজারি শোনান মুফতী ইমরান। তিনি বলেন, নাটোরের গুরুদাসপুর এলাকায় একবার রমজানে আমরা একটা আরব জামাত নিয়ে গিয়েছিলাম। এক মসজিদে এসে জানতে পারলাম মসজিদের মহল্লায় এক লোক এমন আছে, যে মসজিদে আসা তো দূরের কথা ঈদের নামাজেও যায় না। লোকটার বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। ইতিপূর্বে অনেক জামাত এসেছে মসজিদে, অনেকভাবে তাঁকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে, সবার কথা সে মনোযোগ দিয়ে শুনে, মসজিদে যাবে বলে কথাও দেয়, কিন্তু শেষমেষ আর যায় না।
মুফতী ইমরান বলেন, তখন রমজান মাস ছিল। আমরা নিয়ত করলাম যেভাবেই হোক এই লোককে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে আসতে হবে। একদিন আসরের আগে আমরা গাশতের উদ্দেশে বেরিয়ে তাঁকে দাওয়াত দিলাম। একজন আরব সাথি ছিলেন মুতাকাল্লিম। তিনি মুতারজিমের মাধ্যমে লোকটিকে সংক্ষিপ্ত অথচ এতো চমৎকারভকবে দাওয়াত দিলেন যে, আমাদেরকে কথা দিয়ে সে কথা ফিরিয়ে নেয়নি। আসরের জামাতে সে মসজিদে হাজির। এলাকার মুসল্লিরা তো দেখে অবাক। যে লোক ঈদের নামাজে পর্যন্ত যায় না, অসংখ্য তাবলীগি জামাতের দাওয়াতেও যার হৃদয় গলেনি, সে কীভাবে মসজিদে এলো! যাইহোক, লোকটি নামাজের পর আম বয়ানে বসে মনোযোগ দিয়ে বয়ান শুনল, আমরা পরে যে কয়দিন ছিলাম ওই মসজিদে, সে নিয়মিত আসতে লাগল। একপর্যায়ে চিল্লার জন্য নাম লিখিয়ে এখন তিনি পুরোপুরি নামাজ এবং আমলের পাবন্দ।
মুফতী ইমরান বলেন, এই ঘটনা আমরা সারা জীবন মনে থাকবে। আরবরা দাওয়াতের ময়দানে এতো চমৎকারভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন, এই ঘটনা আমার কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এই জন্যই আমাদের মুরব্বিরা বলেন, আরবরা যদি পুর্নোদ্যমে এবং আরও ব্যাপকভাবে দাওয়াতের মেহনতে সময় দিতেন তাহলে পৃথিবীর চিত্রটাই পাল্টে যেতো।
