তাবলীগ সঙ্কট, কী ও কেন?

তাবলীগ সঙ্কট, কী ও কেন?

ইফতেখার জামিল :

ভূমিকা

তাবলীগ নিয়ে কিছু একটা হচ্ছে, এটা সবাই জানেন। মাঝে মাঝে হয়তো বিরক্তও হন, ‘কী দরকার ঝগড়া করে, সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থাকুক,’ অনেকেই এভাবে ভাবেন, সেটা আমরা জানি। সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা হচ্ছে, ধর্মের মতো ধর্মীয় চর্চাও বিবাদ-বিতর্কমুক্ত থাকুক। তবে সত্যি বলতে কি, এই সঙ্কট কখনোই এড়ানো সম্ভব ছিল না। আজ কি কাল বা পরশু, এই সঙ্কটের প্রভাব মুসলিম সমাজে পড়তই। সে যাই হোক, সঙ্কটটা ঠিক কী, এটা বুঝার চেষ্টা করতে তো অসুবিধা নেই।

তাবলীগের সূচনা কোন প্রেক্ষাপটে ও উদ্দেশ্যে হয়েছিল, এটা নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা করলে সঙ্কট বুঝতে সুবিধা হতে পারে। বিশ শতকের শুরুর দিকে তখন হিন্দু ধর্মের সংস্কার আন্দোলন চলছিল, পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে গেরুয়া উত্থান ঘটছিল, উপনিবেশের কালো হাত দীর্ঘদিন ধরে অভিশাপের মতো জেঁকে বসেছিল, এসবের প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজ ধর্ম থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছিল। রাজনৈতিক আন্দোলন সফল হচ্ছিল না। মসজিদ-মাদরাসাগুলোও সীমিত কিছু মানুষের কাছে পৌঁছতে পারতো। এর সমাধান কীভাবে সম্ভব?

মাওলানা ইলিয়াস রাহ. ভাবলেন, ব্যাপক পরিসরে তাবলীগের জামাত করা যায়। মানুষ অন্তত ধর্মের মৌলিক কিছু বিষয় জানুক ও চর্চা করুক। ‘নাই মামার চেয়ে অন্তত কানা মামা থাকুক।’ ছোট ছোট জামাতবদ্ধ হয়ে মানুষ ধর্ম শিখবে ও প্রচার করবে। প্রয়োগ ও কৌশলের দিকে যাবে না। ক্ষমতা, নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিকতা ও ব্যবস্থা; মোটকথা বৈষয়িক সভ্যতার প্রশ্ন আপাতত স্থগিত রাখবে। এই ছিল প্রতিষ্ঠাতা মুরব্বিদের মৌলিক লক্ষ্য। আবুল হাসান আলী নাদাবী রাহ. তাঁর দীনি দাওয়াত বইয়ে বিস্তারিত লেখেছেন।

সঙ্কট

তাবলীগ ছিল বিশেষায়িত কাজ। ধর্মের মৌলিক বিষয়, ব্যক্তিগত চর্চা ও প্রচারেই সীমিত। ছোট ছোট দল ও নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ। ‘দীনের আমল, উম্মতের ফিকির, জামাত, আমীর ছাব’, শব্দগুলো হয়তো শুনেছেন। আপনার কাছে এ শব্দগুলো সাধারণ মনে হলেও এগুলো ইসলামি সভ্যতার মৌলিক বিষয়। তাবলীগের কাজ শুদ্ধ ও দীনের মৌলিক শাখায় বিশেষায়িত। তবে এই কার্যক্রম উম্মতের সমস্ত সঙ্কট মোকাবেলার জন্য কাফি নয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

প্রতিটা সমাজে একটা রাজনৈতিক কাঠামো থাকে, নেতৃত্ব থাকে, একেই যথাক্রমে জামাত ও ইমারাত বলে। দীন বলতে ধর্ম সংক্রান্ত সব কাজ এতে অন্তর্ভুক্ত। উম্মত বলতে শুধু টুপি পরা-মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়াতেই সীমিত নয়, উম্মতের সমাজ আছে, অর্থনীতি ও রাজনীতিও আছে। জ্ঞান ও কৌশলেরও প্রয়োজন আছে। এসব কিছু মিলেই মুসলিম সভ্যতা গড়ে উঠেছে। দীনের নানা শাখা ও বিভাগের সম্পর্ক ও সমন্বয়ের ভারসাম্যে উম্মতের মধ্যে ধর্মীয় প্রভাব হাজির ছিল।

মুশকিল হচ্ছে, একটা সময় তাবলীগের একাংশ বলতে শুরু করলো, তাবলীগের কাজ ও নেতৃত্বেই ধর্ম সীমিত। এটাই একমাত্র কেন্দ্রীয় বিষয়। এটাই সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারাই মুসলিম উম্মাহের দীনি কাজ ও জামাত পরিচালনা করেন। লক্ষ করুন, ইসলামকে এভাবে তার একটি শাখায় সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ বক্তব্য ও নেতৃত্বে আটকে ফেলা হচ্ছে। এতে ইসলামি ইতিহাসে দীনের নানা শাখা ও বিভাগে যে সম্পর্ক ও সমন্বয়ের ভারসাম্য ছিল, সেটা ব্যাহত হওয়া শুরু করলো।

ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া

তাবলীগের একাংশ জ্ঞান চর্চা, রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকে ধর্মীয় কাজের বহির্ভূত মনে করা শুরু করলেন। দাবি করা শুরু করলেন, সাহাবায়ে কেরামের জামানার পর তাবলীগই আবার দীন চর্চা ও প্রচার করছে। মাঝে দীনের চর্চা ছিল না। সেই মাফিক কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা শুরু করলেন। জিহাদের আয়াতকে টেনে তাবলীগে সময় লাগানোর অর্থে ব্যবহার হওয়া শুরু হলো। শুধু তাই নয়, তাবলীগের নেতৃত্বকে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব আখ্যা দিয়ে ইতাআতের বাইয়াত নিলেন।

যারা ইসলামি রাজনীতির ইতিহাসের সাথে পরিচিত, তারা বুঝবেন, এগুলো খুবই সিরিয়াস ঘটনা। সাধারণ ঘটনা নয়। শুধু তাই নয়, খেলাফতের হাদিস ব্যবহার করে এই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গেলে হত্যা করা যাবে, এমন কিছু ফতোয়াও দিতে শুরু করলেন। আলেমদের সাথে দ্বিমত শুরু হলো। মূল নিজামুদ্দিনে ভাঙ্গন হলো। সাদ সাহেব, ইমারতে মুতাগল্লেবাহ দাবি করলেন। যারা ইসলামি ইতিহাসের সাথে পরিচিত তারা জানেন, তগাল্লুব মানে জরুরি শাসন, যেখানে শুরা ও নির্বাচন ব্যতীত শুধু ক্ষমতার বলে বিশেষ প্রয়োজনে কোনো ব্যক্তি শাসন করেন।

বুঝতেই পারছেন, সাদ সাহেব কী বলতে চাচ্ছেন। মাদারেস, ইসলামি সিয়াসাত, জিহাদ ও প্রতিরোধকে অপব্যাখ্যা ও অপ্রয়োজনীয় আখ্যা দেওয়া শুরু করলেন। প্রয়োজনে আয়াত ও হাদিসের অপব্যাখ্যাও আসতে শুরু করলো। আলেমদের ফতোয়া ও কৌশলকে নাকচ করে বরং গালিগালাজ শুরু করলেন। কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে? অবস্থা যে সিরিয়াস, সেটা নিশ্চয় অস্বীকার করবেন না। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে সাদ সাহেবের সমালোচনা করতে গিয়েও অনেকে বাড়াবাড়ি করেছেন। সাদ সাহেব কয়েকবার রুজু’ করতে চাইলেও দেওবন্দ সেটা গ্রহণ করেনি। তাদের যুক্তি, যিনি সতর্ক করার পরেও বারবার ভুল করছেন, তার ওপর আস্থা রাখা অনেক কঠিন।

সমাধান কোন পথে?

এটা খুব জটিল প্রশ্ন। তবে সঙ্কট চিহ্নিত করা ও সচেতন হওয়া সর্বপ্রথম বিষয়। কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করে সাদ পক্ষকে ফিরে আসতে বলতে থাকতে হবে। তাবলীগের মধ্যে আপাতত দুই অংশ হয়ে গেছে। একটা বড় অংশ আলেমদের কথা শুনছেন। ও বুঝতে পারছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইজতেমা ও জামাতে অংশগ্রহণের হার বিবেচনায় নিলে দুই তৃতীয়াংশ আলেমদের তত্ত্বাবধনে পরিচালিত অংশের অনুসরণ করছেন। তবে যে কোনো মতাদর্শিক বিতর্কের মতো এর সমাধানও খুব সহজসাধ্য বিষয় নয়।

খেয়াল রাখতে হবে, আলেমরা যাতে তাবলীগের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে না ঢুকে যান এবং তাবলীগের সিদ্ধান্ত তাবলীগের মুরব্বিদেরকেই নিতে দেন। আলেমরা সেটাই করছেন। হইচই করে, শ্লোগান দিয়ে বা ধমকি দিয়ে এই সঙ্কট মোকাবেলা করা যাবে না। হেকমতের সাথে বোঝাতে হবে। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ে বিবাদ ও বিতর্ক করা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। তাবলীগ মূল মারকাজ, তার নেতৃত্ব ও বক্তব্যে চাপ জারি রাখলে সঙ্কট অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করা যায়।

আগের সংবাদবাবার কবরের পাশে বসে প্রধানমন্ত্রীর কোরআন তেলাওয়াত
পরবর্তি সংবাদএকজন আউটসাইডারের চোখে তাবলীগ