
মুসান্না মেহবুব:
তাবলিগের বিতর্কিত আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক ও সঙ্কটের জের ধরে দাওয়াতি এ কাফেলা এখন দুই ভাগে বিভক্ত। দুই পক্ষই যার যার মতো করে কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৪ সালে তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বি মাওলানা জুবায়েরুল হাসানের ইন্তেকালের পর অন্যান্য মুরব্বিদের মতামত উপেক্ষা করে মাওলানা সাদ কান্ধলভি বিশ্ব তাবলিগের একক আমির হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। তারপর ২০১৫ সালে তাঁর বেশকিছু বক্তব্যে ইসলাম ও কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা আছে উল্লেখ করে তাঁকে সতর্ক করেন দেওবন্দসহ ভারতের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ। ওলামায়ে কেরামের এই সতর্কতায় তিনি কর্ণপাত না করলে একপর্যায়ে দেওবন্দ ও নদওয়াতুল ওলামা থেকে তাঁর এই বক্তব্যগুলোর বিভ্রান্তিমূলক উল্লেখ করে ফতোয়া জারি করা হয়।
আরও পড়ুন : তাবলীগ জামাত: সঙ্কটের অদ্যোপান্ত
এর জেরে বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামও সাদ কান্ধলভির ব্যাপারে সোচ্চার হন। ফলে মাওলানা সাদের বাংলাদেশি অনুসারীদের সঙ্গে বিরোধ বাঁধে ওলামায়ে কেরামের। তারপর নানা ঘটনা-উপঘটনায় পার হয়েছে চার বছরেরও বেশি সময়। আলেমদের আপত্তির কারণে গত দুই বিশ্ব ইজতেমায় সাদ সাহেব অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এ বছরও না।
ইতিমধ্যে সাদ-অনুসারীরা আলাদাভাবে নিজেদের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। গত বছর থেকে বিশ্ব ইজতেমাও আলাদাভাবে হচ্ছে। একপক্ষে আছেন কাকরাইলের মুরব্বি মাওলানা জুবায়ের ও ওলামায়ে কেরামের অনুসারী তাবলিগিগণ, অপরপক্ষে সাদ কান্ধলভির অনুসারীরা।
তাবলিগের এই বিভাজন ও সঙ্কট কি স্থায়ীভাবেই, নাকি এ থেকে উতরে ওঠার কোনো সম্ভাবনা আছে? জানতে চেয়েছিলাম দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও মুফতী মাওলানা মীযানুর রহমান সাঈদের কাছে। তিনি জানান, তাবলিগের মতো সুন্দর একটি দাওয়াতি ধারায় এমন বিভক্তি সকলকেই পীড়া দেয়। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি এড়াতে এই বিভাজনের আসলে আপাত কোনো বিকল্পও ছিল না। তারপরও দুই পক্ষকে এক করার একটা প্রক্রিয়ার কথা শুনেছিলাম বেশ কিছুদিন আগে। কিন্তু যতটুকু জানতে পেরেছি, মাওলানা সাদ কান্ধলভি মীমাংসা করার মতো কোনো সুযোগ দিচ্ছেন না তৃতীয় পক্ষকে। তিনি চাচ্ছেন, তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে তাঁর আনুগত্যে সকলে চলে আসুক, এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো ছাড় দিতে রাজি নন।
মীমাংসার উদ্যোগটা কে এবং কীভাবে নিয়েছিলেন জানতে চাইলে মুফতী মীযানুর রহমান সাঈদ বলেন, বেশ কয়েক মাস আগে বিশ্ববরেণ্য ইসলামিক স্কলার মুফতি তকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে একটা কমিটিও গঠিত হয়েছিল। দেওবন্দ এবং সাহারানপুর মাদরাসায়ও এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু উদ্যোগটা শেষমেষ কতদূর এগিয়েছে আর জানতে পারিনি।
তিনি বলেন, তবে বিভিন্ন জনের সঙ্গে আলাপ করে আমি যেটা জানতে পেরেছি, সেটা হলো, মাওলানা সাদ ভারতের বাইরের কেউ এখানে মীমাংসা করতে আসুক সেটা চাচ্ছেন না। এ ছাড়া মীমাংসার ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম শর্ত তাঁর আনুগত্য কবুল করতে হবে। কিন্তু মীমাংসার জন্য এটা তো কোনো শর্তই হতে পারে না।
মাওলানা মীযানুর রহমান সাঈদ বলেন, ওলামায়ে কেরাম তাঁর যে ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন, সেগুলোকে ভুল মনে না করে তাঁর ‘ইলমি নজরিয়া’ হিসেবে বিবেচনা করছেন, এবং এগুলোর ওপর তিনি এখনও অবিচল আছেন। তাবলিগের বিষয়ে ওলামায়ে কেরামকে তিনি ‘বহিরাগত’ মনে করছেন। ওলামায়ে কেরাম মাদরাসা-মসজিদ নিয়ে আছেন, তাঁরা দাওয়াতের এ বিশেষ মেহনতে কথা বলার অধিকার রাখেন না বলেও মনে করেন। ওলামায়ে কেরামের একাধিক প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে তিনি দেখা পর্যন্ত করেননি। ফলে এ সঙ্কটের শিগগির কোনো সমাধান যে হবে, তা আমার মনে হয় সম্ভবপর হবে না।
কিন্তু এভাবে বিভাজন থাকলে তাবলিগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিভ্রান্তি এবং সংঘর্ষের একটা আশংকা তো থেকে যায়। গত কয়েক বছরে এমন দুঃখজনক একাধিক ঘটনাও ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী? এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা মীযানুর রহমান সাঈদ বলেন, কারও একগুঁয়েমির কারণে দাওয়াতের মেহনত তো বন্ধ করা যাবে না। ওলামায়ে কেরামের সমর্থনপুষ্ট যে জামাতটি আছে, তাদের সঙ্গে থেকে কাজ করে যেতে হবে। যাঁরা বিভ্রান্ত হচ্ছে, তাদেরকে উত্তমরূপে বোঝাতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের উত্তপ্ত পরিস্থিতি পর্যন্ত যাওয়া যাবে না। অপরপক্ষ নানাভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, সেটার মুকাবিলা করতে হবে কৌশলের সাথে। তাদেরকেও উত্তমরূপে বোঝাতে হবে। বোঝাতে গিয়ে যদি পরিস্থিতি উত্তপ্ততার দিকে যায়, তবে ফিরে আসতে হবে।
তিনি বলেন, সর্বোপরি এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যার দরুণ অপরপক্ষ সংঘর্ষের জন্য এগিয়ে আসে।
