মুজাহিদুল ইসলাম :
যার যত উপযোগিতা তার স্থায়িত্ব তত বেশী। জগতের এই রীতি অনুসারে সমাপ্তি ঘটে নকলনবিশি বা অনুলিখন পেশার। ১৪৫০ সালে জার্মান বিজ্ঞানীর প্রিন্টিং মেশিন আবিস্কার যেভাবে সভ্যতায় নতুন সংযোজন এনেছে, অনুরূপভাবে বিশ্ব ইতিহাসের দীর্ঘ দিনের এই অনুলিখন পেশারও সমাপ্তি টেনেছে। কালেভদ্রে এখন অনুলিখনের দরকার হলেও প্রফেশনাল কাজগুলো করা হয় প্রিন্টিং মেশিনের মাধ্যমেই। কেমন ছিল ইসলামি ইতিহাসের সেই নকলনবিশির যুগ, এই লেখায় তা ফিরে দেখবার চেষ্টা করেছি।
ইসলামি সভ্যতায় নকলনবিশি
প্রথম শতাব্দীতে অর্থের বিনিময়ে কুরআন অনুলিখনের মাধ্যমে এ পেশার সূচনা করেন উমর রা. এর আজাদকৃত গোলাম আমর বিন নাফে। দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝিতে কুরআন ও মুয়াত্তা, রিসালাহ, মাবসূতের মতো হাদীস ও বিভিন্ন শাস্ত্রের অনুলিখন শুরু হয়। ইবনু খালদুনের মতে, দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত অনুলিখন পেশার চরম উন্মেষ ঘটে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে অনুলিখনের এক বিশাল বাজার গড়ে ওঠে। সমাজের আলেম-উলামা, আমীর-উমারা, নারী-পুরুষ এমনকি অমুসলিমরা এ পেশায় যুক্ত হন।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ইলম শিক্ষার জন্য অর্থের বিনিময়ে নকলনবিশির কাজ করতেন। ইতিহাস-জয়ী নুরুদ্দিন জঙ্গী নিজ হাতে কুরআন অনুলিখনের কাজ করতেন। খোদ স্পেনের ইউসুফ বিন তাশফীনের নিজের হাতে অনুলিখন করা মুয়াত্তার একটি কপি এখনো সংরক্ষিত আছে।
পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এ মহান পেশায় পিছিয়ে থাকেননি। তারা নকলনবিশ অথবা তার সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। হিজরী পাঁচ শতাব্দীতে অন্যান্য হস্তাক্ষর ও শাস্ত্র বাদে শুধু গ্রানাডার রাবাদে ১৭০ জন নারী কুফী হস্তাক্ষরে কুরআন কপি করতেন। গ্রানাডার বাইরের অঞ্চলের কথা তো বাদই।
বাগদাদের এক গ্রন্থাগারে পাওয়া ‘সিহাহ’ এর একটি পাণ্ডুলিপির শেষে হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দীর এক নকলনবিশ নারীর হৃদয়স্পর্শী একটি লেখা পাওয়া যায়। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘এই গ্রন্থে কোন ত্রুটি পেলে আমাকে অনুগ্রহপূর্বক ক্ষমা করবেন। কারণ, ডান হাত দিয়ে লেখার সময় বাম হাত দিয়ে কোলে থাকা আমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম।’
ইহুদি ও খৃস্টানদের নকলনবিশি
নকলনবিশি শুধু ইসলাম কেন্দ্রিক ছিল না। বরং সকল ধর্মেই এই নকলনবিশির কাজ চলতো। এমনকি অনেক অমুসলিম ইসলামের বিভিন্ন গ্রন্থ অনুলিখন করে বিক্রি করতো।
ইমাম বাইহাকী বলেন, একজন ইহুদি পণ্ডিতের হস্তাক্ষর বেশ চমৎকার ছিল। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সদ্য ইসলাম গ্রহণ করা ইহুদি পণ্ডিত বলেন, ‘আমি তিনবার কুরআনের অনুলিপি তৈরী করি। ইচ্ছাকৃতভাবে সংযোজন-বিয়োজন করে নকলনবিশদের দেই। কিন্তু তারা অসঙ্গতি দেখে ক্রয় করা থেকে বিরত থাকে। তারপরই আমি বুঝতে পারি, ইসলাম সত্য। আর এটা আমার ইসলাম গ্রহণের কারণ।’
খৃস্টান দার্শনিক ইয়াহইয়া বিন আদী বলেন, ‘আমি নিজ হাতে তাফসীরে তাবারীর দুটি অনুলিপি করেছি।’ এ যুগের পকেট বুকের মতো সে সময়ে বিভিন্ন বই নকলনবিশরা তৈরী করতো। হাতে লেখা সত্ত্বেও চমৎকার বাইন্ডিং ও মেকাপ করা হতো।
নকলনবিশির বাজার ও প্রতিযোগিতা
নকলনবিশির বাজারে সাধারণত দিওয়ানে মুতানাব্বীর ৫৩৫০ পঙক্তির সমমান হলে ছোট, আবু তাম্মামের ৭৩০০ পঙক্তির সমমান হলে মাঝারি এবং ১৫ হাজার পঙক্তির সমমান হলে বড় খণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতো। বড় গ্রন্থ একাধিক নকলনবিশের নিকট দেয়া হতো দ্রুত লেখা সম্পন্ন করার জন্য। যেমন ইবনু আবী শায়বাহ তার মুসান্নাফ লিখার জন্য দশজন নকলনবিশ ভাড়া করেন। আশি খণ্ডের তারিখে দিমাশক দশজন নকলনবিশ দুই বছরে সম্পন্ন করেন। ইবনুল হাতীয়াহ আল ফাসী দ্রুত লেখার জন্য স্ত্রী ও মেয়েকে সাথে নিয়ে লিখতেন।
কে কার চেয়ে বেশি অনুলিখন করতে পারে, তা নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। নাদীমের মতে, খ্রিস্টান দার্শনিক আবু জাকারিয়া রাতদিনে একশত পৃষ্ঠা লিখতেন। আবু আলী শিহাব নামক জনৈক নকলনবিশ তার সহকর্মীদের সাথে গর্ব করে বলতেন, তিনি তিন দিনে মুতানাব্বী লিখতেন। ইস্পাহানি প্রাচ্যবিদ খুলিয়ান রিবিরা বলেন, মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল মাত্র দুই সপ্তাহে পুরা কুরআন লেখা সম্পন্ন করতেন।
তবে গুণগতমানে নকলনবিশদের মধ্যে পার্থক্যও ছিল। কারো হাতের লেখা সুন্দর, কারো বাজে। কেউ আবার খুব সতর্ক ও আমানতদার। অনেক সময় আলেম নন, এমন নকলনবিশরা প্রতিলিপি তৈরী করতে গিয়ে বাড়ানো-কমানো, বিকৃতি এবং একজনের বই অন্যের নামে চালিয়ে দেয়ার মতো কাজও করতো। সেজন্য পরবর্তীতে আবার গবেষকদের এসব নির্ধারণে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। সুবকী বলেন, ‘আল্লাহ-ভীতি না থাকার কারণে চুক্তিভিত্তিক কাজের সময় অনেক নকলনবিশ তাড়াহুড়া করে কিছু বাদ দিতো। এরা সম্পূর্ণ ইলম নষ্ট করার বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার সাথে খিয়ানত করেছে।’
নকলনবিশদের দোকানকে কেন্দ্র করে মজলিশ জমে উঠত। নতুন বইয়ের প্রচার-প্রসারের দরকার হলে সবাই এসব মজলিশের দারস্থ হতো। আসমায়ী, যাহিজ, মুতানাব্বী, ইস্পাহানী, সায়রাফী ও ইয়াকুত মুসিলীর মতো সাহিত্যিক এবং জারকাশী, ইবনু আরাফাহ ও ইবনু হাজরের মতো মুহাদ্দিস ও ফকিহ এসব মজলিশে যাতায়াত করতেন।
নকলনবিশির ভালো-মন্দ
পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীর ফাস শহরেই শুধু ১০৪টি কাগজ কারখানা ছিল। মরক্কো ও আন্দালুসে বই বাইন্ডিং ও মেকাপিং শিল্প চরম উৎকর্ষতা লাভ করেছিল। এমনকি মানবসভ্যতার অন্যতম একটি সৌন্দর্য-শিল্প হিসেবে এটা ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছিল। বাইন্ডিংশিল্পে গ্রানাডার মালেকী মাযহাবের ইমাম কাযী আবু বকর কাজ করতেন।
লেখার কাজের উন্নতি ও উৎকর্ষতার সাথে সাথে বিভিন্ন বাহারী রঙ আবিস্কৃত হয়। এমনকি তারা এমন কালি উদ্ভাবন করেন, রাত্রে পড়া যেত কিন্তু দিনে পড়া যেত না। ঐতিহাসিক সাফদী বলেন, মাগরিবের এক ব্যক্তি বাদশাহ কামিলের (৬৩৫) নিকট একটি সাদা কাগজে চিঠি পাঠান। এটা দিনের আলোতে সোনালী, বাতির আলোতে রুপালী এবং অন্ধকারে কালো দেখাতো।
তবে একটি কথা বলা উচিৎ, নকলনবিশরা ছিল নেহাত বেখবর। তারা কী লিখছে, কাদের জন্য লিখছে, তাদের অধিকাংশের এ বিষয়ে কোন ধারণা ছিল না। ইবনে নাদিম বাজে গালগল্প ও জ্বীন-পরীদের নিয়ে লেখা প্রায় ১১০টি কিতাবের নাম উল্লেখ করেছেন। সে জন্য ফুকাহায়ে কেরাম প্রায়শই প্রশাসনের নিকট এসব বইয়ের নকলনবিশের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রদানের দাবি জানাতেন।
ইমাম তাবারী ২৭৯ সালের কথা উল্লেখ করেন, সুলতান মুতামিদ বিল্লাহ নকলনবিশদের কাছে ইলমুল কালাম ও যুক্তিবিদ্যার বই বিক্রি না করার কসম নেওয়ার আদেশ জারী করেন। খতীবে বাগদাদী উল্লেখ করেন, যখন মনসুর হাল্লাজের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়, নকলনবিশদের উপস্থিত করে তার কোন বই কেনাবেচা না করার কসম নেওয়া হয়।
ইমাম সুবকী নকলনবিশদের জন্য পালনীয় মৌলিক আইনি দিক তুলে ধরে বলেন, ‘বিদআতী ও প্রবৃত্তি-পূজারীদের কোনো বই অনুলিখন করা যাবে না। অনুরূপভাবে আনতারার জীবনীর মতো দুনিয়া ও আখেরাতের কোন উপকারিতা নেই এমন যেকোন কিছুর অনুলিপি তৈরী করা যাবে না। মোটকথা, নকলনবিশের জন্য দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাতকে বিক্রি করা ঠিক হবে না।’
শেষকথা
নকলনবিশের এই গৌরবজ্বল যাত্রা থেমে যায় প্রেস আবিস্কারের সাত দশক পর। নকলনবিশি আর তার উপযোগিতা ধরে রাখতে পারেনি। অধিকতর উপযোগিতার উপস্থিতি তাকে পাঠিয়ে দেয় ব্যাকফুটে।
প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ হিসেবে ১৫১৪ সনে আরবীতে প্রথম ক্যাথলিক খিষ্টানদের ‘সালাতুস সাওয়াযী’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। আর ঠিক হিজরী এক হাজার বছর পূর্ণ হলে ইউরোপে ইসলামী জ্ঞানের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ পায় ইবনু হাজিবের কাফিয়া ও ইসরিসীর নুজহাতুল মুশতাক ও আজরুমিয়াহ। ইসলামী বিশ্বে হিজরী ১১৪২/খ্রি:১৭২৯ সালে ইস্তাম্বুল থেকে প্রথম মুসলিম জ্ঞানের মুদ্রিত বই হিসেবে আলোর মুখ দেখে জাওহারীর মুজামুস সিহাহের তুর্কি অনুবাদ। তবে ইতিহাসের অংশ হতে মিসর ও আরবের কিছু পরিবার এই মহান পেশা ঠিক রাখার ব্রত নিয়ে চলছে।
সেজন্য পরপর্তীতে আবার গবেষকদের এসব নির্ধারণে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। সুবকী বলেন, ‘আল্লাহ-ভীতি না থাকার কারণে চুক্তিভিত্তিক কাজের সময় অনেক নকলনবিশ তাড়াহুড়া করে কিছু বাদ দিতো।
