দাউদ উগলুর স্ট্রাটেজিক ডেপথ তত্ত্ব : বাংলাদেশের আঞ্চলিক রাজনীতির প্রশ্নে

ইফতেখার জামিল

বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। অনেক দিন থেকে এই ধারা চালু থাকলেও গত পনের বছরের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ঘটনা পরিক্রমায় এই প্রবণতা বাংলাদেশে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষুব্ধতার জন্ম দিয়েছে। তবে আমরা দেখেছি, শুধু সরকারি দলই নয়, বিরোধী দলও সমান তালে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর কাছে নতজানু হয়ে থেকেছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতেও।

বিশ্বে যখন পপুলিজমের উত্থান ঘটছে, তখন আমাদের দেশের পক্ষগুলো কীভাবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিবাদমান গোষ্ঠীগুলোকে সন্তুষ্ট রাখা যায়, সেই চেষ্টায় ব্যস্ত থেকেছে। যার থেকে জন্ম নিয়েছে পপুলিস্ট পররাষ্ট্রনীতি।

দ্বিপাক্ষিক ও বহুজাতিক সম্পর্কে প্রভাবশালী দেশগুলোর সরকার শুধু নয়, আমজনতার ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী খাহেশের সাথে বোঝাপড়া করে সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে। শুধু ভারতকে খুশী রাখলে হচ্ছে না, ভারতের জাতীয়তাবাদী জনতাকেও সন্তুষ্ট রাখতে হচ্ছে। কূটনৈতিক জগতে বহুল চর্চিত ‘কারেক্টনেস’ এর বালাইও রাখা হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে। ফলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও স্বার্থে বিপর্যয় ঘটছে। আসাম ও আরাকানের ঘটনায় আমরা এই বিপর্যয় খুব ভালোভাবে টের পেয়েছি। বাংলাদেশ কেন এই বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এবং কীভাবে এর সমাধান সম্ভব, দাউদ উগলুর স্ট্রাটেজিক ডেপথ তত্ত্বের দোহাইয়ে আমরা এর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।

অস্বাভাবিক ইতিহাস ও ভূগোলের ফাঁদ

উপনিবেশিত দেশগুলো স্বাধীনতা লাভ করলেও উপনিবেশের সিলসিলা ও ধারাবাহিকতা থেকে বের হওয়া কঠিনসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অস্বাভাবিক সীমান্ত। কাটা পড়েছে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক ও আত্মীয়তা। পরিবারের একাংশ একদেশে, বাকী অংশ হয়ে গেছে সংখ্যালঘু, কাটা পড়েছে গ্রাম, প্রকৃতি ও ইতিহাস। এই নতুন মিথস্ক্রিয়ায় প্ররোচিত করেছে উপনিবেশের অস্বাভাবিক সীমান্ত ; ইতিহাস ও ভূগোল। জাতি, উপজাতি, সংকর ও শাখা জাতির মধ্যে সম্পর্ক ও সংঘর্ষের নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে পক্ষ ও বিপক্ষ বেছে নিতে হয়েছে। উপনিবেশের অস্বাভাবিক সীমান্ত ও ইতিহাসে সংযুক্ত হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা। বিবাদমান দুইদেশ থেকে বহুদূরে আঞ্চলিকভাবে হয়েছে প্রক্সিযুদ্ধ। কৃত্তিম উত্তেজনা ও যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। ফলে বাংলাদেশের দেশগুলোর কোন স্বাধীন ও বিশেষায়িত পররাষ্ট্রনীতি গড়ে উঠেনি। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটলেও এখনো নিয়মিত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষ ও বিপক্ষের বিবাদে সীমান্ত-সম্পর্কে তৈরি হচ্ছে অস্বাভাবিকতা।

বাংলাদেশ আরাকান ও আসাম সঙ্কটে চীন ও ভারতের দ্বৈরথের প্রতিক্রিয়ায় কোন স্বাধীন অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে, পাশাপাশি চীনের চাপে ‘দ্বিপাক্ষিক’ ইস্যু আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে চাপ সৃষ্টির সম্ভাবনাও নষ্ট করেছে। সম্পর্কের জটিল সমীকরণে বাংলাদেশ চীন বা ভারত কারো সমর্থন আদায় করতে পারেনি। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তৈরি হয়েছে নানারকম জটিলতা। বর্তমান পররাষ্ট্র নীতিতে এর সমাধানের কোন পথ খোলা নেই। ফলে বাংলাদেশে নতুন ধরণের পররাষ্ট্রনীতি প্রস্তাব করা জরুরী হয়ে পড়েছে।

সেকুলার ও জাতীয়তাবাদের ব্যর্থতা

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘সেকুলার’ ও ‘বাঙালি’ পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হবার চেষ্টা করেছে। সেকুলার ও জাতীয়তাবাদী প্রস্তাবনায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সঙ্কট ব্যাখ্যা ও সমাধানের চেষ্টা করেছে। মুশকিল হচ্ছে, আপাত ‘নিরপেক্ষ’ ও ‘জাতিবাদী’ বয়ানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পপুলিস্ট প্রবণতার মসিবত ঠিকঠাকভাবে ধরা যায় নি। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংঘর্ষ ও বিবাদে অবস্থানহীন থেকে রোহিঙ্গা ও আসামের মতো বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

সেকুলারদের বড় অংশ আরাকান ও আসাম বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। মানবাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলছেন। জাতিসংঘের কাছে দাবী জানাচ্ছেন। তাদের অনেকেই রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহকেও সমর্থন জানিয়েছেন। মুশকিল হচ্ছে, এগুলো ব্যক্তিগত অবস্থান হিসেবে ভালো, তবে জাতীয় পর্যায়ে নীতি প্রণয়ন ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমর্থন আদায়ের জন্য তাদের কোন প্রস্তাব নাই। এখানেই সেকুলারিজম ও জাতীয়তাবাদের আদর্শিক সমস্যা । এসব সমস্যার কোন সমাধান তাদের কাছে নাই।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবসময় কালচারাল ভাগ-বিভাজন থাকেই। কালচারাল পরিচয়হীন থাকা সম্ভব হয়ে উঠে না। বাংলাদেশী হার্ডকোর সেকুলারকেও আমেরিকা মডারেট মুসলিম হিসেবে গণ্য করে এবং সে হিসেবেই আচরণ করে। তাকেও ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের’ ফিল্টারে পড়তে হয়। তো যখন জাতীয় বা আঞ্চলিকাভাবে মুসলমানরা টার্গেটে রুপান্তরিত হন, তখন সেই সেকুলার ব্যক্তিও টার্গেটে পড়ে যান। তার নিরপেক্ষতা সঙ্কট সমাধানে কোন প্রস্তাবনা পেশ করতে সক্ষম হয় না। এ কারণেই দেখা যায়, যুদ্ধ বা সহিংসতা শুরু হলে মুসলমানি বয়ানই বরাবর সামনে চলে আসে।

স্ট্রাটেজিক ডেপথ তত্ত্ব : সমাধানের নতুন পথ

উসমানী খেলাফাতের বিলুপ্তির পর তুরস্ক বিশ্বরাজনীতিতে খুব দ্রুত তার গুরুত্ব হারায়। বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে হঠাৎকরে মধ্যএশিয়ার একটি দুর্বল রাষ্ট্রে পরিনত হয়। পশ্চিমাদের চক্রান্তের পাশাপাশি কামাল আতাতুর্কের আত্মকেন্দ্রিক উগ্র তুর্কি জাতীয়তাবাদ এর জন্য বহুলাংশে দায়ী। তাঁর দর্শন ছিল- “তুরস্ক তুর্কিদের”। তার এই অদূরদর্শী আত্মকেন্দ্রিক দুর্বল জাতীয়তাবাদী নীতির ফলে তুরস্ক কেবল ইসলামী দুনিয়া থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়নি, বরং স্বয়ং গোটা তুর্কি জাতির প্রতিনিধিত্বের স্থান থেকে ছিটকে পড়ে। বলকান থেকে নিয়ে চীনের জিঞ্জিয়াং পর্যন্ত গোটা তুর্কি উপজাতীয় এলাকা তুরস্কের প্রভাব বলয়ের বাইরে চলে যায়।

প্রথিতযশা মুসলিম রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ডঃ আহমাদ দাউদ উগলু, যিনি “টার্কিশ ফক্স” এবং “তুরস্কের কিসিঞ্জার” নামে যিনি গোটা দুনিয়ায় প্রসিদ্ধ, এরদোগান ক্ষমতায় আসার আগে আগামীদিনে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে প্রস্তাবনার অংশ হিসেবে তিনি স্ট্রাটেজিক ডেপথ বইটি লেখেন। পরবর্তীতে জ্যৈষ্ঠ উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে এই তত্ত্ব বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। এরদোগানকে আধুনিক তুরস্কের স্থপতি বলা হলে দাউদ উগলুকে তার পররাষ্ট্রনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার বলতে হয়। আধুনিক তুরস্কের বর্তমান বহুমুখী ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি তাঁর দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত।

এই গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অমুল্য সম্পদ। এতে তিনি একটি শক্তিশালী আধুনিক তুরস্কের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন। তুরস্কের শক্তির সুপ্ত উৎসগুলো চিহ্নিত করেছেন। কায়েমি ও মেকিয়াভেলীয় দর্শনে চলা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে একটি আদর্শ, দরদী ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্ক কীভাবে দাঁড়াতে পারবে তার ফর্মুলা দিয়েছেন। তিনি তা প্রয়োগও করে দেখিয়েছেন। ২০০৩ সাল থেকে নিয়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই সাত বছরে তুরস্ক বলতে গেলে উন্নয়নের প্রতিটি ধারায় আলোর গতিতে অগ্রসর হয়ে। বিশ্বরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়। উদীয়মান শক্তি হিসেবে পুরা দুনিয়ার সমীহ আদায় করতে সক্ষম হয়।

‘মানুষ তার ইতিহাস ও ভূগোলকে পরিবর্তন করতে পারে না।’

বইটি যদিও তুরস্কের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সংক্রান্ত, তবে যেহেতু এর মধ্যে বিশেষ ব্যাখ্যা পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে, তাই একে অন্য যে কোন অঞ্চলের সাপেক্ষে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এই বইয়ে দাউদ উগলু দেখিয়েছেন যে, মানুষ কখনই তার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতাকে অতিক্রম করতে পারে না।সে যে ইতিহাসের সন্তান, যে ভৌগলিক অঞ্চলে সে বসবাস করে, তার পক্ষে সে ইতিহাস ও ভূগোলকে অস্বীকার করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তবে ইতিহাস ও ভূগোলকে অতিক্রম করা সম্ভব না হলেও তাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। স্ট্রাটেজিক ডেপথের অর্থ ইতিহাস ও ভূগোলের নতুন ব্যাখ্যা, ইতিহাস ও ভূগোলের সাথে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ।

তিনি যোগ করেন, জাতি রাষ্ট্রগুলো গঠিত হওয়ার পরে তার যে সীমানা গড়ে উঠেছে, তাতে কাটা পড়েছে ইতিহাস ও ভূগোলের জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও পরিপূরকতা। পাশাপাশি স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন বা পশ্চিমা আনুগত্যের প্রশ্নে জাতি রাষ্ট্রের সীমানায় অস্বাভাবিকতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিহাস ও ভূগোলকে নতুন করে ব্যাখ্যার মাধ্যমে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অস্থিরতা ও অস্বাভাবিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দাউদ উগলু স্ট্রাটেজিক ডেপথ তত্ত্বে এই স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা করেছেন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের মত অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বোঝাপড়া করে বা পক্ষে-বিপক্ষে গিয়ে সমর্থন অর্জন করে সক্রিয় হতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে বড় রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতায় বলি হতে হয়। এর থেকে বাঁচার জন্য দরকার শক্তিশালী পররাষ্ট্র নীতি ; স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ। নিজের ইতিহাস ও ভূগোলের সাথে সংশ্লিষ্ট জাতি ও অঞ্চলের সাথে সম্পর্কের পুনর্গঠন।

‘বাংলাদেশ : শক্তিশালী আঞ্চলিক পক্ষ’

বাংলাদেশ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিস্থলে অবস্থিত। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অন্তর্গত হলেও পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সাথে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্ক আছে। এই বৃহত্তর অঞ্চলের বৃহত্তর মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই অঞ্চলের ত্রিশ থেকে চল্লিশ পারসেন্ট জনগোষ্ঠী মুসলমান। বাংলাদেশ তাদের আঞ্চলিক প্রতিনিধি। তাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় ইতিহাস ও ভূগোলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম।

পাশাপাশি বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী আছে। যারা পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে বসবাস করছেন। জাতিগত পরিচয়ে বাঙালিদের সংখ্যাই বেশি, যা আরব ও হানদের পরে সর্ববৃহৎ জাতিগোষ্ঠী। ফলে এই বহুধর্মীয় বৈচিত্রতা ও বৃহত্তর জাতিকেন্দ্রিকতায় আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, বরং জরুরী। আগামী শতক এশিয়ার শতক। এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূগোলে অবস্থিত রাষ্ট্র হিসেবে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অবস্থানের সূত্রে এবং দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

বাংলাদেশের শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি কেন জরুরী?

এই অঞ্চলে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। উন্নয়নের বিকার ও বিপর্যয়ে আক্রান্ত হচ্ছে যৌথ ইতিহাস ও ভূগোল। একদিকে আরাকান, আসাম, কাশ্মীর ও পশ্চিমবঙ্গে দানাবাঁধা হতাশা ও বিক্ষুব্ধতা এবং চীনে উইঘুর মুসলমানদের উপর নির্যাতন, এর সমাধানে তারা বাংলাদেশের সক্রিয় হস্তক্ষেপ ও অংশগ্রহণ কামনা করে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ আঞ্চলিক সংকট সমাধানে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। যেমন তুরস্ক আরব ও বলকান অঞ্চলে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে, আরব বসন্ত, উপসাগরীয় স্নায়ুযুদ্ধ ও বলকান অস্থিরতায় হস্তক্ষেপ করেছে, বাংলাদেশও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষমতা রাখে।

বাংলাদেশ যদি এসব সংকটে বিশেষ ভূমিকা না রাখে, তাহলে এসব সংকট বাংলাদেশকেও আক্রান্ত করবে, যা আমরা রোহিঙ্গা সংকটের সময় স্পষ্ট করে দেখেছি। আসাম সংকটও একই রকম সমস্যা তৈরি করেছে। ফলে বাংলাদেশ যদি নিজেকে নিজের সীমানায় সীমাবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে মনে করে, তাহলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা অর্জনে ভূমিকা দূরে থাকুক, এসব সঙ্কটে স্বয়ং নিজেই আক্রান্ত হতে থাকবে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এর সমাধানে বাংলাদেশের দরকার স্ট্যাটিজিক ডেপথ তত্ত্ব গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। এই অস্বাভাবিক বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ করে আঞ্চলিক রাজনীতিতে সতর্ক অংশগ্রহণ।

কেননা যৌথ ইতিহাস ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এ সংকটগুলো বাংলাদেশকেও আক্রান্ত করবে। একটা অঞ্চল কখনো বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে পারে না, তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক পূর্ণতা থাকা জরুরি, যা পারস্পরিক যোগাযোগ ও বিবাদমান গোষ্ঠীগুলোর বোঝাপড়ায় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে ভিন্ন মাত্রা লাভ করতে পারে। রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানো উচিত। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক আত্মীয়তার সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা কমে আসবে। আরাকানের মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

‘আমরা বিচ্ছিন্ন নই’

আপনি যদি কোন রোহিঙ্গার চেহারার দিকে তাকান, তাহলে তার সাথে কক্সবাজারবাসীর চেহারার খুব বেশি ফারাক পাবেন না। তাদের কথার মধ্যেও অনেক মিল পাবেন। একই কথা খাটে আসামের ক্ষেত্রেও। তাদের সাথে আমাদের আত্মীয়তা অনেক গভীর। কাশ্মীর ও উইঘুরদের প্রসঙ্গও এর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে ঘৃণা ও স্বার্থ নিয়ে ভারত ও চীন তার নিজের জনগণের একাংশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, সেই ঘৃণা ও লোভ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আগুন লেগেছে দেখে চুপ করে বসে থাকার সুযোগ নেই, নগর পুড়লে দেবালয় অক্ষত থাকবে না।

আগের সংবাদরোহিঙ্গাদের সম্পর্কে মিডিয়া-প্রচারিত কয়েকটি ভুল তথ্য
পরবর্তি সংবাদমুরসির ছেলের মৃত্যুকে রহস্যজনক বলছে ইখওয়ানুল মুসলিমিনি