রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে মিডিয়া-প্রচারিত কয়েকটি ভুল তথ্য

রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে চায় না

গত ২২ আগস্ট সাড়ে তিন হাজারের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর দিনক্ষণ ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত দিনে ওই সাড়ে তিনহাজার রোহিঙ্গার কেউই ফেরত যেতে রাজি হননি। রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দেশে ফিরে তাদের নিরাপদ জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা প্রামাণ্যভাবে আগে দিতে হবে মিয়ানমারকে, এর সঙ্গে আরও চারটি শর্ত দিয়েছিলেন তারা, তবে তাদের শেষকথা ছিল তারা অবশ্যই নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চান, কিন্তু বাংলাদেশের বড় বড় অনেক গণমাধ্যম এই সংবাটি ছেপেছে ‘রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে চায় না’ টাইপ শিরোনামে।

অথচ রোহিঙ্গা নেতারা কখনোই এ দাবি করেননি যে, তারা ফিরতে রাজি নন। বরং তারা ৫টি দাবি পূরণের শর্তে যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের মাতৃভূমিতে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। শর্তগুলোও ছিল তাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুর ও আবশ্যকীয় বিষয়। এই শর্তগুলো না জুড়ে দিয়ে তারা যদি মিয়ানমার ফেরে, তাহলে পূর্বের সেই নিপীড়নই তাদের ওপর আবার প্রয়োগ করা হবে, যে নিপীড়নের কারণে ভিটেমাটি ও সর্বস্ব হারিয়ে তারা আজ পরদেশি শরণার্থী।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থী নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে সম্প্রতি কথা বলেছে সংবাদ মাধ্যম ঢাকা ট্রিবিউন। সেখানে তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আমাদের ইচ্ছা এই মুহূর্তে রাখাইনে ফেরত যাওয়া। আমাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। আমরা চাই বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় আন্তর্জাতিক মহল এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থা মিয়ানমারকে চাপ সৃষ্টি করে আমাদের ফেরত যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিক।’

উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য রোহিঙ্গারা যে পাঁচটি শর্ত বা দাবি জানিয়েছেন সেগুলো হলো—

১. রোহিঙ্গারা আরাকানের স্থানীয় আদিবাসী এবং সে জন্য তাদের ন্যাটিভ স্ট্যাটাস বা স্থানীয় মর্যাদা সংসদে আইন করে পুনর্বহাল করতে হবে যার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি থাকতে হবে।

২. নাগরিকত্ব

প্রথমত, আরাকান রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ‘সিটিজেন কার্ড’ দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও সিটিজেনশিপ কার্ড দিয়ে প্রত্যাবাসন করে স্থানীয় নাগরিক মর্যাদা দিতে হবে।

তৃতীয়ত, একই সাথে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় থাকা রোহিঙ্গাদের সিটিজেনশিপ কার্ড দিয়ে স্থানীয় নাগরিক মর্যাদা দিতে হবে।

৩. প্রত্যাবাসন

রোহিঙ্গাদের তাদের নিজস্ব গ্রামে ফিরিয়ে নিতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া জমিজমা যথাযথ ক্ষতিপূরণসহ ফেরত দিতে হবে।

৪. নিরাপত্তা

আরাকানে রোহিঙ্গাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য রোহিঙ্গা পুলিশ বাহিনীর সাথে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।

৫. জবাবদিহিতা

বার্মার স্থানীয় আদালতের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির মতো কোনো ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালে অপরাধীদের বিচার করতে হবে।

বিবেকবান যেকোনো মানুষই রোহিঙ্গাদের এই পাঁচটি দাবির সঙ্গে একমত হবেন। এবং এই পাঁচ দাবি মিয়ানমার সরকার পূরণ না করে তাদেরকে ফেরত নিলে কী পরিমাণ নৃশংসতার শিকার হতে পারে এই জনগোষ্ঠী, বিগত দিনগুলোতে তাদের সঙ্গে মিয়ানমারের আচরণ এর জ্বলজ্যান্ত সাক্ষী।

রোহিঙ্গারা সুখে আছে তাই দেশে ফিরতে চাচ্ছে না

বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গারা সুখে আছে, তাই দেশে যেতে চাচ্ছে না—গত কয়েক সপ্তাহে মিডিয়ার বিভিন্ন নিউজ ও রিপোর্টে এই কথাটা ঘুরে ফিরে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ রোহিঙ্গাদের ছোট-বড় যে কারও সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, তারা শরণার্থী জীবনের কষ্ট থেকে মুক্তি নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে কতটা উন্মুখ হয়ে আছে। কয়েকমাস আগেও তাদের এ উন্মুখতার খবর গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু অনিশ্চিত ও শঙ্কাময় ভবিষ্যত নিয়ে তারা প্রত্যাবাসন নিতে রাজি না হওয়ায় এই কিছু দিন হলো মিডিয়ার বোল পাল্টে গেছে।

খাওয়া-দাওয়া কিংবা জীবন যাপনে কতটা মানবেতর অবস্থায় বসবাস করছে দুর্বিপাকগ্রস্ত এ জনগোষ্ঠী, সরেজমিনে যারা দেখেছেন তারাই কেবল বলতে পারবেন। একজন মানুষের শরীরে প্রতিদিন মিনিমাম ২১ শো কেলোরির প্রয়োজন হয়, অথচ রোহিঙ্গাদের অনেক পরিবার এমন আছে, যাদের পুরো পরিবার মিলেও প্রতিদিন ২১ শো কেলোরি জোগাড় করতে পারে না।

মাদকপাচারে প্রধান ভূমিকা পালন করছে রোহিঙ্গারা

আমাদের গণমাধ্যমগুলোতে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে আরেকটি খবর ফলাও করে প্রচার করা হয় যে, রোহিঙ্গাদের কারণে মাদকপাচারের ব্যবসা জমে উঠেছে এবং রোহিঙ্গা নেতারা সরাসরি এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এটাও একটা অসত্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা। কারণ, বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা আসার আগ থেকেই মাদক চোরাচালান হয়ে আসছে। আর এর মূল হোতা বাংলাদেশি কিছু অসাধু চক্র। হ্যাঁ, এতটুকু বলা যেতে পারে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো লোক মাদক বহনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এর মূল হোতা বাংলাদেশি ওই অসাধু চক্রটিই। এখন একটি অপরাধে অপরাধের মূল হোতাকে উল্লেখ না করে অপরাধে ব্যবহৃত লোকদেরকে ফলাও করে প্রচার করা মানে মূল অপরাধীকে আড়াল করে ফেলা। বাংলাদেশের একশ্রেণির মিডিয়া এ কাজটিই করে আসছে বেশ কিছুদিন যাবত।

রোহিঙ্গারা অপরাধপ্রবণ

রোহিঙ্গাদেরকে ঢালাওভাবে অপরাধপ্রবণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় একশ্রেণির গণমাধ্যমে। মাদকপাচারসহ মারামারি, দাঙ্গাহাঙ্গামা, খুন ইত্যাদি অপরাধে জড়িত হিসেবে তাদেরকে উপস্থাপন করা হয়। অথচ অপরাধ করছে মুষ্ঠিমেয় কিছু লোক, কিন্তু সেটাকে দেখানো হচ্ছে পুরো জনগোষ্ঠীর অপরাধ হিসেবে।

গত বছর, ২০১৮ সালে পুলিশের হিসেবে বাংলাদেশে মোট ৩৮৩০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর আগের বছর ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৩৫৪৯। যদি দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫০ লক্ষ ধরা হয় তবে এই দু বছর খুনের গড় হার প্রতি লাখে ২.১ এর একটু বেশি। অন্যদিকে, গত দুই বছর রোহিঙ্গাদের দ্বারা ৪৩ জনের খুনের তথ্য জানা গেছে। এদের মধ্যে ৩৮জনই রোহিঙ্গা আর বাকি ৫ জন বাংলাদেশী। এই ক্যাম্পে ১০ লাখের কিছু বেশী লোক থাকে। গত দুইবছর খুনের গড় ২১.৫ (৪৩/২) হলে এই হার প্রতি লাখে ২.১ এর একটু বেশি। অর্থাৎ, মোটা দাগে বাংলাদেশের গড় খুনের হারের সমান। অথচ রোহিঙ্গাদেরকে ঢালাওভাবে বলা হচ্ছে, এরা খুনি এবং হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী। রোহিঙ্গারা যদি প্রতি লাখে ২.১ এর কিছু বেশি হারে খুনের কারণে ঢালাওভাবে খুনি ও অপরাধপ্রবণ হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের তামাম বাসিন্দাকেও একই অভিযোগে অভিযুক্ত করতে হবে।

১০ লক্ষ রোহিঙ্গার বসবাস শরণার্থী শিবিরগুলোতে। যুগ যুগ ধরে শিক্ষা ও সভ্যতার আলো থেকে দূরে থাকা একটা জাতির কিছু লোকের অপরাধে জড়িয়ে পড়াকে গোটা জনগোষ্ঠীর অপরাধ হিসেবে দেখানো নিতান্ত বেইনসাফি এবং জাতিবিদ্বেষ ছড়ানোর নামান্তর ছাড়া আর কী হতে পারে!

পরিবেশ ধ্বংস করছে রোহিঙ্গারা

মিডিয়ায় নানাভাবে বলার চেষ্টা করা হয় যে, রোহিঙ্গাদের কারণে সেখানকার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা বনজঙ্গল সাফ করে সেই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলছে।

কিন্তু পরিবেশ ধ্বংসের পেছনে রোহিঙ্গাদের দায় কতটুকু? রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসেবে সেখানে বসবাস করছে। আমাদের সরকার তাদেরকে বসবাসের জন্য এলাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এলাকাটা পাহাড়ি এবং বন-জঙ্গলে ঘেরা। এখন সেখানে তাদেরকে বসবাস করতে হলে এলাকাটাকে প্রথমে তো তাদের বসবাসের উপযোগী করতে হবে। প্রয়োজনমাফিক বনজঙ্গল পরিস্কার না করলে তারা থাকবে কীভাবে? আর বনজঙ্গল পরিস্কার যে কেবল রোহিঙ্গারাই করছে এমন না, আমাদের সরকারের পক্ষ থেকেও বরং অঞ্চলটাকে মোটামুটি বসবাসের উপযোগী করতে সবধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু রোহিঙ্গা কেন, সরকার যদি অন্য কোনো এলাকার মানুষকে যেকোনো বিপর্যয়ের কারণে এখানে বসবাস করতে দিত, তাহলে তাদেরকেও একই কাজ করতে হতো।

রোহিঙ্গাদের পেছনে ২ বছরে বাংলাদেশের খরচ ৭২ হাজার কোটি টাকা

কিছুদিন আগে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে এ খবর প্রচারিত হয়েছে যে, গত দুই বছরে রোহিঙ্গাদের পেছনে বাংলাদেশ সরকারের ৭২ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে! কিন্তু গত দুই অর্থ বছরের বাজেটে এর কোনো উল্লেখ নেই। অন্তত কক্সবাজার ডিস্ট্রিক ইউএনও’র অ্যালোকেশন থাকার কথা, সেখানেও এমন কোনো অংক উল্লেখ নেই। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, এই বিশাল অংকের টাকা সরকারপক্ষ খরচ করল কীভাবে? যেদেশে সাত বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা বাজেটে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে ব্যাংকে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়, সেদেশে বহিরাগত শরণার্থীদের পেছনে দুই বছর ৭২ হাজার কোটি টাকা খরচ করা অসম্ভবই নয় কেবল, অকল্পনীয়ও বটে।

হ্যাঁ, রোহিঙ্গাদের পেছনে মোটা অংকের টাকা খরচ হচ্ছে, কিন্তু এ অংকের বৃহৎ অংশটি আসছে বহির্বিশ্ব থেকে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো এবং জাতিসংঘের তরফ থেকে কোটি কোটি টাকা অনুদান আসছে রোহিঙ্গাদের জন্য। যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত নয়, উল্টো আরও চাঙ্গা করছে। শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করতে প্রতি বছর বহির্বিশ্বের অসংখ্য মানুষ আসছে বাংলাদেশে, যা দেশের পর্যটন খাতের সমৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে। অথচ রোহিঙ্গাদেরকে আমরা কেবল নিজেদের জন্য বোঝাই মনে করে যাচ্ছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা আমাদের জন্য যে আশির্বাদও, তা দেখার বা উপলব্ধি করার ক্ষমতা আমাদের কিংবা আমাদের স্বার্থান্বেষী মিডিয়া মহলের নেই।

আগের সংবাদমিডিয়ায় রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে ঘৃণার চর্চা : যেভাবে ফ্যাক্ট চিহ্নিত করবেন
পরবর্তি সংবাদদাউদ উগলুর স্ট্রাটেজিক ডেপথ তত্ত্ব : বাংলাদেশের আঞ্চলিক রাজনীতির প্রশ্নে