দেশজুড়ে যেভাবে তৎপর কাদিয়ানি সম্প্রদায়

হামমাদ রাগিব

গত ২৩-২৫ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ে অমুসলিম কাদিয়ানি চক্র ‘ইজতেমা’ নাম দিয়ে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চেয়েছিল। পুরো বাংলাদেশের হক্কানি আলেম ও ধর্মপ্রাণ মানুষ অব্যাহতভাবে এর বিরোধিতা ও প্রতিবাদ করেন। একই সঙ্গে কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি নিয়েও সোচ্চার হন তাঁরা।

তবে কাদিয়ানিদের কার্যক্রম পরিচালনায় আপাতত কোনো বাধা নেই তাঁদের, তাঁদের মৌলিক দাবি হলো, ইসলাম-বহির্ভূত এই ফেরকাটি যেন ইসলামের নাম ভাঙিয়ে, ইসলাম ও মুসলমানের বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে; তারা নিজেদের মতবাদের প্রচার করুক, বিভিন্ন অনুষ্ঠান-উৎসবের আয়োজন করুক, সমস্যা নেই, কিন্তু সেখানে ইসলাম কিংবা মুসলমান শব্দ বা এ সংশ্লিষ্ট পরিভাষা ব্যবহার করতে পারবে না। এর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যেন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়—ধর্মপ্রাণ মানুষ ও আলেমদের দাবি মূলত এটাই। এর পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্গে পঞ্চগড়ে পুলিশ ও স্থানীয় কাদিয়ানিদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় এবং প্রশাসন এক পর্যায়ে এ ইজতেমা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

পঞ্চগড়ের কথিত ইজতেমাকে কেন্দ্র করে নতুন করে এ আলোচনা সামনে এলেও দাবিগুলো অনেক পুরনো। দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে এ দাবিগুলো জানিয়ে আসছিলেন হক্কানি উলামায়ে কেরাম। এর ভেতর অনেকবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু কোনো সরকারই এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

এ ব্যাপারে কথা বলেছিলাম তরুণ ইসলামি শিক্ষাবিদ, আরবি ভাষাপ্রশিক্ষক ও দাঈ মাওলানা মহিউদ্দীন ফারুকীর সঙ্গে। বাংলাদেশে কাদিয়ানিদের বিস্তার ও তৎপরতা বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কাদিয়ানিদের মৌলিক তৎপরতার অন্যতম হচ্ছে অপপ্রচার। ইসলামের বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করে এবং ইসলামের নাম ভাঙিয়ে দরিদ্র ও সাধারণ মুসলমানদের তারা বিভ্রান্ত করে থাকে।

‘তাদের বেশ কিছু সংগঠন আছে, সংগঠনগুলো প্রশিক্ষিত কর্মী দ্বারা গঠিত, এদেরকে তারা ‘মুবাল্লিগ’ বলে, এই মুবাল্লিগদেরকে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে পাঠিয়ে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে দূরে থাকা সরলমনা সাধারণ মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করার কাজ আঞ্জাম দেওয়া হয়। কেবল যে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এই কাজ সীমাবদ্ধ, এমন না, উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবীদেরকেও তারা নানাভাবে বিভ্রান্ত করে।

‘মাসিক আহমদী নামে একটা পত্রিকা আছে তাদের, ওটা দ্বারা মূলত শিক্ষিত সমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তাছাড়া ‘মসজিদ’ নাম দিয়ে তাদের যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতেও দাওয়াতের নামে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান কিংবা সেমিনারের।

‘সারাদেশে কাদিয়ানিদের চারশো পঁচিশটির মতো শাখা আছে, দেশের নানাপ্রান্তের গ্রাম এবং শহরকে কেন্দ্র করে গঠন করা হয়েছে এসব শাখা। মূলত এগুলোর তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয় তাদের আঞ্চলিক যাবতীয় তৎপরতা।

‘সাধারণ মুসলমানদের খুব কৌশলে তারা ধোঁকা দেয়। বলে, আপনারা মুসলমান, আমরাও মুসলমান, কোনো তফাত নেই। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে আপনারা যেমন নবি ও রাসুল মানেন, বিশ্বাস করেন—আমরাও তাই। তাঁর সঙ্গে আপনি কেবল আমাদের নবি গোলাম আহমদ কাদিয়ানিকেও নবি মেনে নিন, ব্যস, আপনি আমাদের ভাই হয়ে যাবেন। এভাবেই নম্র ও আপোসকামী মোলায়েম ভাষায় সাধারণ মুসলমানদের মগজ ধোলাই করে তারা বিভ্রান্ত করে। পাশাপাশি ভালো মাইনের চাকরি এবং আর্থিক লোভও দেখায়। ফলে মানুষ সহজেই তাদের শিকারে পরিণত হয়ে যাচ্ছে।

‘কিন্তু উচ্চশিক্ষিত যাঁরা আছেন, তাঁদেরকে মোটিভেশনের কায়দা ভিন্ন। নবিজিকে শেষনবি যে তারা মানে না, এ ব্যাপারটি খোলামেলাভাবে উচ্চশিক্ষিতদের বলে না। বরং অন্য উপায়ে এ শ্রেণিকে মোটিভেশন করে। ফলে চাকরি ও পদোন্নতির লোভে অনেকেই এসব বিষয়ে ঘাটাঘাটি না করে সহজেই কাদিয়ানিদের কাতারে নিজের নাম লিখিয়ে নেয়।’

তাদের এত ব্যাপৃত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আর্থিক জোগান ঠিক কোত্থেকে আসে, রাজধানীর বকশি বাজারে অবস্থিত তাদের হেডকোয়ার্টারে গেলে দেখা যায়, কী নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে জায়গাটা, যেখানে প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারাক্ষণ পাহারায় থাকে, তো এর পেছনে আসলে শক্তিটা ঠিক কী, জানতে চাইলে মাওলানা মুহিউদ্দীন ফারুকী বলেন, ‘আর্থিক জোগানের বড় একটা উৎস তো সকলেরই জানা, প্রাণ-আরএফএল কোম্পানি, তবে এর বাইরে আরও বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো কাদিয়ানিদের লালন-পালনে সহায়তা করে।

‘আর পেছনের শক্তির কথা যদি বলি, তাহলে তো “আল-কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহিদাহ”—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের চিরন্তন এ বাণীরই পুনরাবৃত্তি করতে হয়। খাঁটি ইসলামের মুকাবেলায় তামাম কুফরি শক্তিই এক এবং ঐক্যবদ্ধ। সুতরাং সহজেই বুঝে আসার কথা, কাদিয়ানিদের পেছনের শক্তিটা ঠিক কোথায়। তবু আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে, বাংলাদেশের বড় বড় বেশ ক’টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বহির্বিশ্বের শক্তিশালী কাদিয়ানি সংগঠনগুলোই মূল মদদ দিচ্ছে এখানে। এই সংগঠনগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল নেতৃত্বের ভালো রকমের সম্পর্ক আছে। যার দরুণ ক্ষমতার পালাবদল হলেও সব সরকারই কাদিয়ানিদেরকে প্রটেকশন দিতে অনেকটা বাধ্য।’

কাদিয়ানিদের এই অপতৎপরতা রোধে উলামায়ে কেরামের কার্যকর কী উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা মুহিউদ্দীন ফারুকী বলেন, ‘এ জন্য দুইটা ভাগে আমাদের কাজ করা দরকার। শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি উলামায়ে কেরামের সঙ্গেও এ ব্যাপারে আমার কথা হয়েছে। প্রথমত মাঠ পর্যায়ে কিছু আলেম দাঈ কাজ করবেন। তাঁরা বিভিন্ন অঞ্চলে, যেখানে কাদিয়ানিদের অপতৎপরতা রয়েছে, সেমিনার বা এই রকম প্রশিক্ষণমূলক অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে স্থানীয় আলেম, দাঈ ও মসজিদের খতিবদেরকে কাদিয়ানিদের অপতৎপরতা থেকে সাধারণ মুসলমানদের কীভাবে বাঁচানো যায় সে কলাকৌশল শিখিয়ে দেবেন। যাতে স্থানীয় এসব দাঈ যার যার এলাকায় কাদিয়ানিদের অপতৎপরতা থেকে মানুষজনকে সুন্দরভাবে হেফাজত করতে পারেন।

‘দ্বিতীয়ত আমাদের মেধাবী কিছু তরুণ আলেমকে কাদিয়ানি মতবাদ সম্পর্কে বিশেষায়িত পদ্ধতিতে পড়াশোনা করিয়ে দক্ষ করে তোলা। যাতে কাদিয়ানিদের জ্ঞানগত বিভিন্ন বিভ্রান্তি তাঁরা সুচারুভাবে খণ্ডন করতে পারেন। পাশাপাশি সংলাপ, মুনাজারা বা বিতর্কমূলক যেকোনো আয়োজনে কাদিয়ানিদের মুকাবেলা করতে পারেন।

‘এই দুইটা কাজ করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদীভাবে কাদিয়ানিদের অপতৎপরতার ফলপ্রসূ মুকাবেলা সম্ভব বলে আমার মনে হয়। এ ছাড়া আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে যেভাবে মিছিল-মিটিং-প্রতিবাদের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, তা সাময়িকভাবে ফায়দাজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদী কোনো প্রভাব পড়ে না। তাই মিছিল-মিটিং-প্রতিবাদের পাশাপাশি কাদিয়ানিদের অপতৎপরতা রোধে এই দুটো বিষয়ে উলামায়ে কেরামের পদক্ষেপ গ্রহণ সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি।’

আগের সংবাদ‘পাক-ভারতের এই উত্তেজনা ইসরায়েলের চাল’
পরবর্তি সংবাদ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের পাশে থাকার আশ্বাস রাশিয়ার