দেশে বাড়ছে হাফেজের সংখ্যা, বাড়ছে তারাবির সঙ্কট

রাগিব রব্বানি 

বাংলাদেশে হাফেজে কুরআনের সংখ্যা ঠিক কত, এর সঠিক পরিসংখ্যান কারও জানা নেই। তবে অনুমান করা হয়, ২৫ লাখেরও বেশি হাফেজে কুরআন রয়েছেন বাংলাদেশে। এই সংখ্যা প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাক-এর অধীনে প্রতি বছর গড়ে ১৩ হাজারেরও অধিক হাফেজ সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। এর বাইরে আরও বেশ কয়েকটি শিক্ষাবোর্ড আছে, আছে কোনো বোর্ডের অধিভুক্ত হয়নি—এমন প্রতিষ্ঠানও। সে হিসেবে বলা যায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে ২০ হাজার শিক্ষার্থী হাফেজে কুরআন হিসেবে সনদ গ্রহণ করছেন।

একজন হাফেজে কুরআনের জন্য প্রতিবছর রমজানে খতমে তারাবিহতে ইমামতি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাবিহর নামাজে তেলাওতের ওসিলায় এই মাসে তাঁরা পুরো বছরের জন্য কুরআনের ইয়াদকে ঝালাই করে নেন।

কিন্তু প্রতিবছর হাফেজে কুরআনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবার কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে রমজানে তারাবিহ পড়ানোর জন্য মসজিদের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। হাফেজে কুরআনদের উল্লেখযোগ্য বড় একটি অংশ রমজানে তারাবিহ পড়ানোর মতো মসজিদ পান না। ফলে রমজান জুড়ে তারাবিহর ওসিলায় কুরআন তেলাওত ও নিজেদের হিফজকে ঝালাই করার যে মওকা পাওয়া যেত, সেটা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

মৌলভীবাজারের এক হাফেজে কুরআন দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে প্রতি রমজানে তারাবিহ পড়িয়েছেন। ভালো ইয়াদের হাফেজ হিসেবে এলাকায় তাঁর সুনাম আছে। গত কয়েক বছর ধরে তিনি কোনো মসজিদে আর সুযোগ পান না তারাবিহর জন্য। তাঁর অভিযোগ, কণ্ঠ ও তেলাওতের স্টাইল পুরনো ধাঁচের হওয়ায় এই কয় বছর ধরে তারাবিহর জন্য হাফেজ বাছাইপর্বে তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেন না।

‘এখন হুফফাজুল কুরআনের স্টাইলে তেলাওত করতে না পারলে অভিজাতপাড়ার মসজিদগুলোতে সুযোগই পাওয়া যায় না। হুফফাজের ‘তর্জ’ জানা থাকলে ইয়াদ কম হলেও মসজিদ হয়ে যায়। এই বুড়ো বয়েসে এইসব ‘কাটিং-কুটিং’ শেখার মনমানসিকতা নেই বিধায় কয়েক বছর ধরে আর তারাবিহ পড়াতে পারি না।’ বলছিলেন প্রবীণ এই হাফেজে কুরআন।

তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ভালো মানের তেলাওত জানা অনেক হাফেজও রমজানে কোনো মসজিদে তারাবিহ পড়ানোর সুযোগ পান না। রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসার শিক্ষার্থী হাফেজ নাজমুল আলম। আজ থেকে চার বছর আগে তিনি হাফেজ হয়েছেন। কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সমাপনী পরীক্ষায় তিনি মুমতাজ হয়েছিলেন। পাশাপাশি হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশনের পরীক্ষায়ও একই রেজাল্টে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কণ্ঠ ও তেলাওতের স্টাইলও চমৎকার। যে বছর হাফেজ হন, ওই বছর রমজানেই কেবল তারাবিহ পড়াতে পেরেছিলেন, তারপর আর সুযোগ হয়নি তারাবিহ পড়ানোর।

সদ্য কৈশোর পেরোনো এই তরুণ হাফেজ ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে জানান, প্রতি বছরই রমজানের আগে বিভিন্ন মসজিদে তিনি তারাবিহর জন্য ইন্টারভিউ দেন, কিন্তু মসজিদ-কর্তৃপক্ষ বা ইন্টারভিউ গ্রহণকারীদের সঙ্গে ‘পরিচয়’ না থাকার কারণে কোনো মসজিদে তিনি টিকেন না।

‘গত তিন বছরে অন্তত শ’খানেক মসজিদে ইন্টারভিউ দিয়েছি। অধিকাংশ ইন্টারভিউই আমার ভালো হয়েছে। কিন্তু মসজিদ কর্তৃপক্ষ বা ইন্টারভিউ যাঁরা গ্রহণ করেন, তাঁরা নিজেদের পরিচিত ও পছন্দমতো লোককেই শেষমেষ নিয়োগ দেন। সোজা কথায়, অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মসজিদের দায়িত্বশীল কারও আত্মীয়-স্বজনকেই নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ইন্টারভিউয়ের আয়োজন সাধারণ মুসল্লিদের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্যই করা হয়।’ বলছিলেন হাফেজ নাজমুল আলম।

হাফেজ হয়েও রমজানে তারাবিহ না পড়ানোটা বাংলাদেশের ধর্মীয় সমাজে ‘আইব’ হিসেবে দেখা হয়। যে সমস্ত হাফেজে কুরআন তারাবিহর সুযোগ পান না, তাঁদেরকে রমজান এলে একটা হীনমন্যতার ভেতর দিয়ে যেতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত মহলে তাঁদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

হাফেজ নাজমুল আলম জানান, রমজানে মসজিদের অভাবে তারাবিহ পড়াতে না পারার কারণে প্রতি বছরই তিনি এসব সমস্যার সম্মুখীন হন। আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত মহল মনে করেন, তাঁর বোধহয় হিফজ ছুটে গিয়েছে।

ধর্মমন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে আড়াই লক্ষেরও অধিক মসজিদ রয়েছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মসজিদে রমজানে খতমে তারাবির ব্যবস্থা নেই।

রাজধানীর একটি মাদরাসার হিফজ বিভাগের শিক্ষক হাফেজ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হাফেজে কুরআনদের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশনসহ জাতীয় পর্যায়ের একাধিক বৃহৎ সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যাঁরা হাফেজে কুরআনদের অভিভাবকত্ব করার দাবিদার। কিন্তু হাফেজে কুরআনদের সবচেয়ে বড় সঙ্কট তারাবিহ নিয়ে তাদের খুব কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না।’

হাফেজ শফিক বলেন, ‘আপনি বলেছেন আড়াই লক্ষেরও অধিক মসজিদ রয়েছে বাংলাদেশে। খোঁজ নিয়ে দেখুন, অধিকাংশ মসজিদেই খতমে তারাবির ব্যবস্থা নেই। হুফফাজুল কুরআনসহ আরও যে কয়টি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন রয়েছে হাফেজদের কল্যাণমূলক, তাঁরা যদি প্রতিবছর দেশব্যাপী একটি ক্যাম্পেইন করত, প্রতিটা মসজিদে মসজিদে খতমে তারাবিহর আয়োজনের ব্যাপারে মসজিদ-কর্তৃপক্ষকে উদ্বুদ্ধ করত, এবং প্রতিটা মসজিদেই একাধিক হাফেজ নিয়োগের ব্যাপারে তৎপরতা চালাত, তবে প্রতি বছর এত এত হাফেজকে রমজানে বেকার থাকতে হতো না।’

হাফেজ শফিক আরও বলেন, ‘ফাতেহ টোয়েন্টিফোরের মাধ্যমে আমি বাংলাদেশে হুফফাজদের কল্যাণে কাজ করা প্রতিটা সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ হাফেজদের পক্ষ থেকে এই অনুরোধটা করছি, তারা যেন বাংলাদেশের প্রতিটা মসজিদে কীভাবে একাধিক হাফেজের মাধ্যমে খতমে তারাবিহর আয়োজন করানো যায়, সে ব্যাপারে একটু ভাবেন, ফিকির করেন।’

আগের সংবাদএ কেমন নিষ্ঠুরতা! গর্ভধারিণী মাকে রেলস্টেশনে ফেলে গেল সন্তানেরা
পরবর্তি সংবাদকানাডায় বন্যায় প্লাবিত এক হাজার বাড়ি-ঘর