মুজাহিদুল ইসলাম :
দেশ, কাল ও জাতি নির্বিশেষে কিছু চরিত্র বৈশ্বিক রূপ পেয়েছেন, হয়ে আছেন বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ। নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এমনই একটি চরিত্র, যার রসিকতাপ্রবণ আর হাস্যরসাত্মক অবয়বের আড়ালে ঝিলিক দিয়ে যায় অসাধারণ প্রজ্ঞা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের মোড়কে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। তিনি একই সঙ্গে বিচারক, পণ্ডিত, সুফি, দার্শনিক ও রম্যসমালোচক। তবে ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে তার হাস্যরসিকতার জন্য। হোজ্জার মতো বিজ্ঞ একজন মানুষের জন্য এ পরিচয় খুব বেশি শ্লাঘার নয়, এটা ঠিক। কিন্তু হোজ্জার গল্পগুলো যারা মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন তারা হয়তো বুঝতে পেরেছেন, ঠাট্টা-তামাশা এবং রসিকাতা ও বিদ্রুপের মাধ্যমে কী অসাধারণ ধীশক্তি আর মনসিকতার পরিচয় দিয়েছেন এ মানুষটি।
হোজ্জার পরিচয়
সাধারণভাবে প্রচলিত মত হচ্ছে, বর্তমান তুরস্কের এস্কিশেহির প্রদেশের হোর্তু নামে এক নিভৃত গ্রামে জন্ম নাসিরুদ্দিনের। ত্রয়োদশ শতকে সেলজুক সুলতানদের রাজধানী কোনিয়ার কাছে আকশেহির নামে এক স্থানে মৃত্যু হয় তার। দারুণ প্রজ্ঞাবান এ মানুষটি একটি মাত্র পরিচয়ে আবদ্ধ নন। হোজ্জা বিশ্বজুড়ে এতটাই জনপ্রিয় যে কেবল তুর্কিরাই নয়, আরও অনেক জাতিগোষ্ঠীই হোজ্জাকে নিজেদের বলে দাবি করেছে। চীনারা মনে করে, হোজ্জা ছিলেন উইঘুর বংশীয় এবং তার জন্ম জিংজিয়াংয়ে। উজবেকরা মনে করে তার জন্ম বোখারাতে। নাসিরুদ্দিন হোজ্জার নথিবদ্ধ সবচেয়ে প্রাচীন যে উপাখ্যানগুলো পাওয়া যায় সেগুলো আরব দেশীয়। প্রখ্যাত হোজ্জা গবেষক মিখাইল বেইরাম-এর মতে, নাসিরুদ্দিনের পুরো নাম ছিল নাসিরুদ্দিন মাহমুদ আল-খোয়ি এবং তার উপাধি ছিল ‘আহি এভ্রান’। তার মতে, হোজ্জার জন্ম ইরানের পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের খোয় শহরে এবং তিনি পড়াশোনা করেন খোরাসানে। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্ব তুরস্কে তার জন্মের বিষয় আস্থা রেখে আসছে।
তবে জাতীয়তা যাই হোক, হোজ্জার গল্পগুলোতে আছে প্রচুর বৈচিত্র। কোনোটিতে তিনি দারুণ চালাক, আবার কোনোটিতে হদ্দ বোকা, কোথাও বীর, জনগণের অব্যক্ত সত্যপ্রকাশক। তবে গল্প যেমনই হোক, ঈশপের মতোই হোজ্জার গল্পগুলোতেও আছে নৈতিকতার শিক্ষা ও প্রতিবাদের রম্যপ্রকাশ।
গল্পে গল্পে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ
একবার হোজ্জা বাদশাহর জন্য কিছু উপহার নিয়ে যাচ্ছিলেন। গেটে প্রহরী হোজ্জাকে আটকে দিল। বললো, তোমার উপহার আমাকে দাও, আমিই জাহাঁপনাকে দিয়ে আসব। কিন্তু হোজ্জা নিজেই উপহার দিয়ে আসতে চান। এদিকে প্রহরীও নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত হোজ্জা বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি ভিতরে গিয়ে বাদশাহর কাছ থেকে যা বখশিশ পাব, তার অর্ধেক তোমাকে দিয়ে দিব।’ একথা শুনে প্রহরী হোজ্জাকে ভিতরে যেতে দিল। হোজ্জা দরবারে গিয়ে বাদশাহকে উপহার দেওয়ার পর বাদশাহ খুব খুশি হলেন এবং হোজ্জাকে জিজ্ঞেস করলেন, তার কী চাই? হোজ্জা বললেন, ৫০ ঘা বেত্রাঘাত! দরবারের সবাই তো অবাক! এ কেমন উপহার চাওয়া? বাদশাহ যতই অন্য উপহার দিতে চান, হোজ্জা ততই বেতের আঘাত নিতে চান। মহা মুসিবত। শেষ পর্যন্ত হোজ্জার জেদের কাছে হেরে গিয়ে বাদশাহ নির্দেশ দিলেন হোজ্জাকে বেত মারার। ২৫ ঘা বেত মারার পর হোজ্জা থামতে বললেন। তারপর বাদশাহর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জাঁহাপনা, আমার পুরস্কারের একজন ভাগীদার আছে।’ বাদশাহ জানতে চাইলেন, ‘কে?’ তখন হোজ্জা দরবারে আসার পথে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। পুরো ঘটনা জানার পর বাদশাহ তখন ঐ প্রহরীকে ডেকে বেত্রাঘাত করে তার পাওনা মিটিয়ে দিলেন! অন্যায়ের প্রতিবাদে এ ধরনের বিকল্প ও কৌতুহল উদ্দীপক প্রতিশোধ কালোত্তীর্ণ হোজ্জাই করতে পারেন।
একবার মরুভূমিতে হোজ্জার স্বর্ণ খোঁজার সময় বাদশাহ বললেন, এখানে তো তোমার কোন চিহৃ রাখা উচিত ছিল। হোজ্জার জবাব, রেখেছিলাম আকাশের মেঘকে, কিন্তু তা এখন হারিয়ে গেছে। এটার মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালনায় রাজার অযৌক্তিক বিভিন্ন যুক্তি প্রদানের প্রতিবাদ করেছেন হোজ্জা।
১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের শাসনের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার ব্যবহৃত উন্নত মানের বিস্ফোরকের নাম ‘হোজ্জা’ রাখে স্বাধীনতাসংগ্রামীরা। পঞ্চাশের দশকে পাশ্চাত্যের নীতিনির্ধারণকারীরা সমাজতন্ত্রের মোকাবেলা করার রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডামূলক প্রচারণায় কাল্পনিক হোজ্জাকে ব্যবহার করে।
হোজ্জা-বর্ষ
নাসিরুদ্দিনের বৈশ্বিক আবেদনের কথা মাথায় রেখে ইউনেস্কো ১৯৯৬-১৯৯৭’কে আন্তর্জাতিক নাসিরুদ্দিন বর্ষ ঘোষণা করে। তুরস্কের হোর্তুতে প্রতি বছর ৫ থেকে ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক নাসিরুদ্দিন হোজ্জা উৎসবের আয়োজন করা হয়। বিশ্বের সব অঞ্চল থেকে এ উৎসবে যোগ দেন হাজার হাজার মানুষ এবং স্মরণ করেন অসাধারণ প্রজ্ঞাবান এক মানুষকে, যিনি হাসির আড়ালে জীবনের সার-সত্যকে তুলে ধরতেন।
