নিজের সাথে নিজের বসবাস : মুসলিম সভ্যতায় আত্মজীবনী সাহিত্য

নিজের সাথে নিজের বসবাস : মুসলিম সভ্যতায় আত্মজীবনী সাহিত্য

মুজাহিদুল ইসলাম :

নিজেকে জানানোর অনবদ্য রচনাই হলো আত্মজীবনী। হাজার বছর আগে মুসলিম এবং আরব সাহিত্যে আত্মজীবনী লেখা শুরু হয়েছিল। তখন এটাকে লেখকরা নাম দিতেন ‘দৈনিক ডায়রি’ কিংবা ‘দিন-যাপনের বৃত্তান্ত’ বলে। আলেম, মুসলিম শাসক, বিচারক, কাজি, ইমাম—সবার হাতেই উঠে এসেছে তাদের জীবন-যাপনের বয়ান, স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতার সার নির্যাস। নিজের জীবনের গল্প কলমের ভাষায়, কাগজের পাতায় অকপটে বলেছেন গাজালি, খালদুন, সুয়ূতি, ইবনে বুলুক্কিন, উসামা বিন মুরশেদের মতো ইতিহাস বিখ্যাত মুসলিম ব্যক্তিরা।

আত্মজীবনী সাহিত্যের কৃতিত্বটা আজকাল পশ্চিমা সাহিত্যিকরা জোর করেই নিতে চায়। পশ্চিমাদের ভাষায়, তারাই এই আত্মজীবনী সাহিত্যের পথিকৃৎ। কিন্তু এই প্রবন্ধে বলা হবে, আত্মজীবনী সাহিত্য মুসলিম সভ্যতায় হাজার বছর আগেই প্রচলিত ছিল। এটা নতুন কোনো সাহিত্য ক্যাটাগরি নয়। হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে ইবনে হাজাম, ইবনে বুলুক্কিন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে গাজালি-সহ আরও অনেকে মূল্যবান সব আত্মজীবনী লিখে গেছেন। অক্ষত এবং আমাদের হাতেই আছে সেইসব গ্রন্থগুলো। পশ্চিমা চিন্তাবিদ জর্জ মিচ তার ‘আত্মজীবনীর ইতিহাস’ গ্রন্থে এবং প্রাচ্যবিদ ফরাঞ্জ রোজন্তাল তার ‘আরবি আত্মজীবনী’ গ্রন্থে আত্মজীবনীর ইতিহাসটুকু তুলে ধরেছেন।

কেমন ছিল আত্মজীবনীগুলো?

হিজরি পঞ্চম শতাব্দীর শেষদিকে ক্রুসেডাররা ইসলামি বিশ্বে আক্রমণ করতে শুরু করে। এ সময় ইসলামি বিশ্বের লেখকরা বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। তাদের কেউ ছিলেন ইসলামি বিশ্বের পশ্চিমে আন্দালুস এবং মরক্কোতে, কেউ ছিলেন ইসলামি বিশ্বের পূর্বে পারস্যে, আর কেউ ছিলেন মিশর ও ইরাকে ভ্রমণে। যে যেখানে ছিলেন, সেখানের বৃত্তান্তই তুলে ধরেছেন তাদের আত্মজীবনীতে।

রাজনৈতিক দ্বিধা, শিক্ষার পরিবেশ, চিন্তার সংকট, ক্রুসেডারদের ঝড়, সাংস্কৃতিক লড়াই—আত্মজীবনীগুলোতে তারা তাদের অভিজ্ঞতায় তুলে ধরেছেন। যেটাকে বলা যায়—রোজনামচা কিংবা দিনলিপি। এখানে অন্যকে নয় বরং তারা নিজেকেই ফুটিয়ে তুলেছেন। নিজেদের চিন্তা, সমাধান, প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। এমনকি জীবনের বিভিন্ন বাঁকে প্রেম, কখনো জেলের ঘানি টানাসহ সবকিছুই আছে তাদের আত্মজীবনীতে। হাজার বছর আগের মানুষের জীবনের চলার পথ, সে কী চিন্তা করতো, কী ভাবতো, সবকিছু যখন চিত্রিত হয়, তার অনুভব কিন্তু সত্যিই শিহরণ জাগায়।

উদাহরণ হিসেবে নীচে এমন দুটি আত্মজীবনীর উল্লেখ করা হলো।

ইবনে বুলুক্কিনের আত্মজীবনী

এগারোশ শতাব্দীর গ্রানাডায় উমাইয়া শাসনের পতনের আগে ক্ষমতায় আসে তায়েফী সম্প্রদায়ের আব্দুল্লাহ ইবনে বুলুক্কিন নামের এক যুবক। শাহী মহলে রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষার আগাগোড়াসহ ইউসুফ বিন তাশফীনের হাতে গ্রানাডার পতন ও সদাচারের সবকিছু তুলে এনেছেন নিজের আত্মজীবনীতে। সে সময়ের বিশ্বশিক্ষাকেন্দ্র স্পেনের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলিত রীতি অনুসারে প্রাইমারী সম্পন্ন করা ছাড়া কিভাবে রাজকীয় পরিবার তাকে জগত সম্পর্কে ধারণা দিয়েছে , তিনি তা তুলে ধরে বলেন, ‘তার দাদা তাকে প্রাইমারী থেকে বের করে এনে বললেন, “যতটুকু লেখা ও কুরআন পড়েছো, তোমার জন্য যথেষ্ঠ। বর্তমান ফেতনার সময়ে আমার রাজ্যে যা হচ্ছে এবং আমার থেকে যা শিখতে পারো তোমার মাথায় সব জমা করতে থাকো। কারণ, সময়টা এখন খুবই বাজে আর রাজাবাদশারা তাদের সন্তানদের সবকিছু শিক্ষা দিবে, সে-সময়ও কম।’

পলাশী থেকে নিয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনগণের বিরাগভাজন হওয়া সত্ত্বেও শত্রু শক্তির ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ক্ষমতার বাগডোর ধরে রাখার নীতি সেকালেও ছিল, যা স্বীকার না করলেও ইবনে বুলুক্কিনের আত্মজীবনী থেকে বেরিয়ে আসে। ক্ষমতা ধরে রাখতে পাশের খৃস্টান রাজা থেকে সহযোগিতা গ্রহণ করা, ইউসুফ বিন তাশফীনের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং খ্রিস্টানদের নিকট ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াকে তিনি শ্রেয় মনে করতেন বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো কোন মুসলিমের হাতে গ্রানাডা ছেড়ে দিব না।’

তবে এই ইউসুফ বিন তাশফীনের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তার থেকে পাওয়া আনুকূল্য ও নিরাপত্তার কথা তিনি নিজেই স্বীকার করে বলেছেন, ‘তিনি আমাদেরকে আগমাতে বসবাস করার নির্দেশ দিলেন। আমরা মুসলিম আমির থেকে সর্বোত্তম আচরণ পেয়েছি, আমরা তাকে আল্লাহর পরে মানুষের মধ্যে আমাদের প্রতি সবচে দয়ার্দ্র পেয়েছি।’ ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর চরম দরিদ্র অবস্থার কথা বড্ড করুণ সুরে বলেন, ‘আমাদের পরিধেয় কাপড় বিক্রি করাটাই আমাদের জন্য সবচে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন।’

জীবনের শেষ সময়ে নির্বাসনভূমিতে হতাশার শিকার না হয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে আগমাতে জ্ঞানার্জন ও মদ্যপান ছেড়ে দ্বীনের পথে অগ্রসর হওয়াকেই একমাত্র পুঁজি বানিয়ে দুনিয়া ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হন ইবনে বুলুক্কিন। তিনি বলেন, ‘পূর্বজীবনের স্মরণ আমার হতাশা আর কষ্টকে হ্রাস করার পরিবর্তে শুধু বাড়িয়ে তুলবে। আমাদের প্রদেয় মাসিক ভাতা ছাড়া আর কোন আশা নেই, এখন শুধু আশা, পরপারের জন্য নেক আমল, যা আযাব হতে রক্ষা করবে এবং সাওয়াবের ব্যবস্থা করবে।’

উসামা বিন মুরশিদের আত্মজীবনী

অন্যদিকে বারোশত শতাব্দীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সেনা কমান্ডার বিখ্যাত ঘোড়ওসার উসামা বিন মুরশিদ তার লিখিত আত্মজীবনী গ্রন্থে সে সময়ের সাধারণ চরিত্র সাহসিকতার এক উপখ্যান তুলে ধরেছেন। দেখিয়েছেন বাড়ির নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে দাস-দাসীরা পর্যন্ত সাহসিকতার কী চরম পরাকষ্ঠা দেখিয়েছে।

এ বইয়ের লেখক গল্পবীর উসামা জ্ঞান, সাহসিকতা এবং দ্বীনদারীতে ছিলেন অদ্বিতীয়। কুরআন লেখার জন্য তার পিতা কর্তৃক ভাইয়ের অনুকূলে রাজত্ব ত্যাগের নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত পেশ করেন তিনি। তার পিতা মারা যাওয়ার সময় তীরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ নিজ হাতে লেখা কুরআনের ৪৩টি নুসখা রেখে যান। উসামা বলেন, ‘তিনি চমৎকার হস্তাক্ষরে লিখতেন, অথচ তার হাতের ঐ আঘাত তাকে কোন প্রভাব ফেলতো না। তিনি কুরআন ছাড়া কিছু লিখতেন না, কুরআনের শেষে কুরআন সংশ্লিষ্ট নাসিখ-মানসুখ, কুরআনের গরীব-শায কিরাআত, শানে নুযুল ও ফিকহ বিভিন্ন ধরনের কালি দ্বারা “বড় তাফসীর” শিরোনামে লিখতেন।

আর সাহসিকতার গল্প তো এ পরিবারের সাধারণ চরিত্র। তাদের সন্তানদের বিনোদনই থাকতো সাপ ও সিংহ শিকার করা। তার জীবনে এমন কোন শত্রুর সাথে সাক্ষাৎ হয়নি, যেখানে তিনি পিছু হটেছেন। এক লড়াইয়ে তার পিতা তাকে বলেন, তোমার সাথে যারা আছে, তাদের নিয়ে শত্রুদের ওপর নিজেকে নিক্ষেপ করো।

তাদের এ সাহসিকতা বাড়ির নারীদেরও ছিল। উসামার কোন এক ফুফু তার চাচাতো ভাইকে বলেন, বাড়ির মহিলাদের সামনে পরাজিত হওয়ার ব্যপারে দ্বিতীয় বার চিন্তা করো।

উসামা সমসাময়িক সময়ের চিত্রায়নে কোন পক্ষপাত্বি করেননি। কোন এক খ্রিস্টান তাকে বলেন, ইংরেজদের চিকিৎসা ব্যবস্থা পশ্চাৎপদ। কিন্তু বিপরীতে তিনি তার ই’তিবার গ্রন্থে বলেন, ‘খ্রিস্টান কর্তৃক ইংরেজদের চিকিৎসার ব্যপারে পশ্চাৎপদতার অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়। আমি তাদের দাবির বিপরীত পেয়েছি। যারা ইংরেজদের অভিশাপ দেয়, তাদের পা ফুলে গেলে কোন ইংরেজ চিকিৎসক ছাড়া কেউ তো মুক্তি দিতে পারে না।’

বর্তমান সময়ে রোগীর কষ্ট লাঘবে পশ্চিমের কোথাও কোথাও দূরারোগ্য রোগীর কষ্ট দূরীকরণে ঔষধের মৃত্যুর আইনী অনুমোদন আছে। উসামার ই’তিবার গ্রন্থে কোন এক পোপের কৃতিত্বের কথা তুলে আনেন। তিনি লিখেন, এক পাদ্রী এক রোগীকে শ্বাসরুদ্ধ করে রাখেন, একপর্যায়ে সে মারা যায়। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এতক্ষণ সে কষ্ট পেত, এখন সে শান্তি পেল।

তাছাড়া শৈশব থেকে পশুপ্রেমী এ মানুষটি তার গ্রন্থে প্রাণীদের চরিত্র নিয়েও আলোচনায় বলেন, ‘সিংহের মধ্যে যা দেখেছি, তা আমি কল্পনাও করিনি। আমি মনে করি না, সিংহ মানুষের মতো। ওদের মধ্যে সাহসীও আছে, ভীরুও আছে।’

দীর্ঘ ৯৬ বছর জীবন পাওয়া এ বীর তার পাঠককে ক্রুসেডারদের অধীনে বায়তুল মুকাদ্দাসের চিত্র অঙ্কন করে দেখান।

উপসংহার

আত্মজীবনীর এ গল্প তো শেষ হবার নয়। ইসলামের ইতিহাসে প্রতি যুগে প্রতিটি জায়গায় অসংখ্য সফল ব্যক্তি রয়েছে। যেমন–চতুর্থ শতাব্দীর আত্তার, পঞ্চম শতাব্দীর আবু হাইয়্যান, ষষ্ঠ শতাব্দীর উমারাহ বিন আলী, সপ্তম শতাব্দীর আবু শামাহ, অষ্টম শতাব্দীর ইমাম যাহাবী, নবম শতাব্দীর ফাসী ও ইবনু হাজর, দশম শতাব্দীর সাখাবী, সুয়ুতী ও ইবনু তুলুন, একাদশ শতাব্দীর নাজমুদ্দিন গাজ্জী, দাদশ শতাব্দীর মুহাম্মাদ বিন মুসতাফা মুসিলী, এয়োদশ শতাব্দীর শাওকানী, আলুসী, লাকনাবী, চতুর্দশ শতাব্দীর মুহাম্মাদ আব্দুহ ও আহমাদ শাওকী, যিরিকলী, রশীদ রেজা, তাহা হুসাইনসহ অসংখ্য মনীষীর আত্মজীবনী মুসলিম সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

তারা তাদের সব নির্যাস তুলে এনেছেন তাদের লেখনীতে। যা একজন অতীত পরিভ্রমণকারী মানুষকে নিয়ে যাবে সে যুগের পরিবেশ ও বাস্তবতায়। নিয়ে যাবে মানুষের অন্তরজগতে। এবং তাকে উদ্বুদ্ধ করবে কিভাবে একজন মানুষ পথের আলো পাবে।

আগের সংবাদস্কুল থেকে ফেরার পথে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত বাবা-মেয়ে
পরবর্তি সংবাদফরেনসিক পরীক্ষায় ঢাবি ছাত্রীকে ধর্ষণের আলামত মিলেছে