মুসান্না মেহবুব:
দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষতিকর ও হারাম কাঁচামালের তৈরি পণ্য সামগ্রী। খাদ্য পণ্য থেকে শুরু করে কসমেটিকস ও ব্যাবহারিক সামগ্রীতেও হারাম কাঁচামালের সংমিশ্রণ ঘটানো হচ্ছে। কিন্তু হালাল নির্ধারক বিশেষায়িত কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকবার কারণে পণ্যগুলোকে সঠিকভাবে যাচাই করাও হচ্ছে না। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীতে থেকে যাচ্ছে হারামের সংমিশ্রণ।
সবচেয়ে বেশি সংশয় তৈরি করছে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত জিলেটিন। কেমিক্যাল বিশেষজ্ঞদের মতে, জিলেটিন হচ্ছে বর্ণহীন, স্বচ্ছ, গন্ধহীন এক ধরনের প্রোটিন। এটি সহজেই পানিতে মিশে যায়। ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে এটা দিয়ে ‘জেল’ তৈরি করা হয়। এই জেল এখন শিল্পোৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বের বেশিরভাগ জিলেটিনই শূকর বা আল্লাহর নামে জবাই করা হয়নি এমন প্রাণী থেকে আসছে। বিশ্ব চাহিদার ৪৪ শতাংশ জিলেটিন শূকরের চামড়া থেকে তৈরি হয়। ২৮ শতাংশ তৈরি হয় গরুর চামড়া থেকে। মাত্র ১ শতাংশ মাছ, মোরগি বা অন্যান্য ঘর্ম নিরপেক্ষ প্রাণীজ উৎস্য থেকে। এর বাইরে ২৭ জিলেটিন তৈরি হয় পশুর হাড়গোড় থেকে। এখানে পশু বলতে শূকর ও গরুকেই মূলত বোঝানো হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, যেসব কারখানায় জিলেটিন তৈরি করে তারা মূলত সব ধরনের পশুর হাড় থেকেই জিলেটিন উৎপাদন করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব প্রাণীজ হারগোড় এক সঙ্গে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। ফলে গরুর হাড়ও শূকরের হাড়ের সঙ্গে মিশে যায়।
আরও জানা যায়, জিলেটিনের ৮০-৯০ শতাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে অমুসলিম দেশের। এসব দেশে বেশিরভাগ পশুই আল্লাহর নামে জবাই করা হয় না। এর মধ্যে ৩৯ শতাংশ ব্যবহৃত হয় পশ্চিম ইউরোপে, ২ শতাংশ পূর্ব ইউরোপে, ২০ শতাংশ উত্তর আমেরিকায়, ১৭ শতাংশ ল্যাটিন আমেরিকায় এবং ২২ শতাংশ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে।
বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো হালাল পশুর চামড়া ও হাড় থেকে জিলেটিন তৈরি করে। কিন্ত এর পরিমাণ বিশ্বচাহিদার ১০ থেকে ২০ ভাগ মাত্র। পশ্চিমা বিশ্বে পণ্যটি তৈরির জন্য যে পশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করছে তা আল্লাহর নামে জবাই করা হয় না। ফলে এভাবে তৈরি কাঁচামালটি মুসলমানদের কাছে হারাম হয়ে যাচ্ছে।
খাদ্য ও ব্যাবহারিক নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেকগুলো পণ্যে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই জিলেটিন। হালাল সার্টিফিকেট দানের সঙ্গে জড়িত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলি জাতীয় খাদ্য, ফ্রুটজেল, ক্রিমচিজ, গামক্যান্ডি, ফালুদা, চাইনিজ স্যুপ, থিকেনার বা পাচকারী উপাদান হিসেবে কোনো কোনো সস, অ্যাসপিক’-এ জিলেটিন ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ইয়োগার্ট, আইসক্রিম, কিছু এনার্জি ড্রিংকসে বিশেষত বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ হলুদ রঙের ড্রিংকসে, ফ্রুট জুস এবং মোরব্বা তৈরির কিছু ক্ষেত্রে জিলেটিন ব্যবহৃত হয়।
প্রসাধনীর মধ্যে হেয়ারজেল, বডি লোশন, ফেস মাস্ক, সাবান, মেকাপের কিছু উপাদান লিপিস্টিক, শ্যাম্পু, হেয়ার কন্ডিশনা তৈরিতে জিলেটিন ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া ক্যাপসুল, ক্যান্ডি, ভিটামিন ক্যাপসুল, কড লিভার অয়েল, ডেইরি ফুড, পোস্ট পার্মিং, ট্রিটমেন্টে নখের প্রসাধনীতে জিলেটিন বা হাইড্রোনাইজড কোলাজেন থাকে।
ওষুধ শিল্পের মধ্যে জিলেটিন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ক্যাপসুলের খোল বা শেল তৈরিতে। এ ছাড়াও সাপোজিটরি, ট্যাবলেট ফিল্মিং বা আবরণ হিসেবে সাসটেইন রিলিজড ওষুধ এনক্যাপসুলেশনে বাইন্ডার হিসেবে বিটা ক্যারোটিনকে জলীয় দ্রবণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
পণ্য হালালের সার্টিফিকেট দানে ভূমিকা রাখে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। কিন্তু তাদেরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের সক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশনের একাধিক সূত্র।
সূত্র জানায়, ‘জিলেটিন’ উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ হওয়ায় সরকারের দায়িত্বশীল বিভাগগুলোর কর্মকাণ্ডও হালাল-হারামের বিষয়টি খুব একটা কার্যকরী উপায় বের করতে পারছেন না। আবার ব্যবসায়ীরাও তার বাণিজ্য ও মুনাফাকেই বড় করে দেখছেন। ব্যবসায় তারা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সেভাবে বিবেচনায় আনছেন না। তাই এসব পণ্যের আমদানি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে পণ্যের হালাল ‘লোগো’ ও কোম্পানির হালাল সার্টিফিকেট’ অনুসন্ধানের তাগিদ অনুভব করছেন না। একইভাবে দেশেও এর সবকটি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানে ব্যাচ ধরে ধরে হারাম উপাদানের অস্তিত্ব আছে কিনা সেটি পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
সূত্রমতে, দেশে অন্তত ২০ হাজারের অধিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আছে। আর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) তথ্যমতে, এর মধ্যে মাত্র ১৫টি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের হালাল সার্টিফিকেট রয়েছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোও কতটা হালাল খাদ্য উৎপাদন করে সেটি মনিটরিংয়ের সক্ষমতা নেই ইফার।
তাই পণ্যসামগ্রীর মান যাচাই ও হালাল নির্ধারণের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন দেশের সচেতন মহল। তাঁরা বলছেন, মুসলিম দেশ হিসেবে পণ্যের যাবতীয় খোঁজ খবর করে হালাল সার্টিফিকেট দানের জন্য বিশেষায়িত হালাল নির্ধারক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে কথা হয়েছিল ইসলামিক ফিন্যান্স অ্যাকাডেমি অ্যান্ড কনসালটেন্সি’র কো-অর্ডিনেটর মাওলানা সাঈদ যুবায়েরের সঙ্গে। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, হালাল পণ্যের ব্যাপারে বিশ্বব্যাপীই আলাদা একটা আগ্রহ আছে ভোক্তাদের। এ ক্ষেত্রে প্রায় সকলেই হালাল খাদ্য ও সামগ্রী ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশে হালাল জাস্টিফাইয়ের ব্যাপারটা নিতান্ত দায়সারা গোছের। এ ক্ষেত্রে সরকার জনগণ সকলেরই ব্যর্থতা আছে আমি বলব। আমরা যারা ট্রেডিশনাল মাদরাসাগুলোতে পড়াশোনা করি, হালাল খাদ্যের ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট জানাশোনা আছে, কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে আমরা এটাকে কাজে লাগাতে পারি না। এ ছাড়া সরকার বা অথোরিটিও হালাল পণ্য সার্টিফাইয়ে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছেন না। এ ক্ষেত্রটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমি মনে করি এ ক্ষেত্রে হালাল নির্ধারক বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো জরুরি। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের মার্কেট এখন জমজমাট, বাংলাদেশ চাইলে সহজেই এই মার্কেটটা ধরতে পারে। আমাদের পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলো হালাল পণ্যের ক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমরা সেভাবে এগোতে পারিনি।
