
মুসান্না মেহবুব:
আসামে জাতিবাদী ঘৃণার নিকৃষ্টতম উদাহরণ নেলি গণহত্যা। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি আসামের নগাঁও জেলার নেলি এলাকার ১৪টি গ্রামে নেমে এসেছিল যেন কেয়ামতের বিভীষিকা। এই গ্রামগুলোর নিরীহ বাঙালি মুসলমানদের ওপর বিনা উস্কানিতে সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সন্ত্রাসবাদী বর্বর অসমীয় সন্ত্রাসীরা। মাত্র ৬ ঘন্টার তাণ্ডবে ১৪টি গ্রামকে বিরানভূমিতে পরিণত করেছিল তারা। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজার দেখানো হলেও বিভিন্ন বেসরকারি তথ্যমতে নারী শিশু বৃদ্ধ সহ নৃশংস গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন ২০ হাজারেরও বেশি বাঙালি মুসলমান।
কেন এই গণহত্যা?
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে অাসামের মঙ্গলদৈ লোকসভা সমষ্টির সাংসদ হীরালাল পাটোয়ারির আকস্মিক মৃত্যু হয়। সেই শূন্য সংসদ আসন পূরণ করার জন্য সে বছরের শেষের দিকে সেই আসনে উপনির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয় ভারতের নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে ঐ বছরের এপ্রিল মাস থেকে নতুন ভোটারদের ভোটার তালিকাতে নামভুক্তির কাজ আরম্ভ করে। মে মাস পর্যন্ত এই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ অব্যাহত ছিল।
কিন্তু মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ভোটার তালিকাতে ‘প্রচুর অবৈধ বিদেশির নাম ঢুকে গেছে’ বলে অভিযোগ তুলে হিন্দুত্ববাদী ও সাম্প্রদায়িক অসমীয়া হিন্দুরা। তারা দাবি করে, কংগ্রেস (আই) দল নিজের ভোটব্যাংক শক্তিশালী করতে কৌশলে সন্দেহজনক নাগরিকের নাম ভোটার তালিকাতে ঢুকিয়েছে। এই অভিযোগ উত্থাপন করে পুরো অাসাম কাঁপিয়ে তোলে নেলি গণহত্যার মূল সংগঠক সদৌ আসাম ছাত্র সংস্থা। এর আগে অাসামে বিদেশি অনুপ্রবেশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দাবিতে সদৌ আসাম ছাত্র সংস্থা, সংক্ষেপে ‘আসু’ প্রতিবাদের নামে ঘৃণাউৎপাদক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিল।
অন্যদিকে সংসদে তখন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী ১৯৭৯-এর আগেই অাসামসহ সমগ্র উত্তর-পূর্বে বাংলাদেশিদের অবাধ অনুপ্রবেশ হচ্ছে বলে দাবি করেন, এবং এই দাবি জোরালো করতে বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য রাখছিলেন। সেই বক্তব্য অাসামের হিন্দুত্ববাদী ও জাতিবিদ্বেষী রাজনৈতিক নেতা এবং ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বকে ঘৃণাবাদী ও উগ্র আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে। এই আন্দোলনেরই বর্বরতম রূপ নৃশংস নেলি গণহত্যা।
কী ঘটেছিল সেদিন?
নেলি এলাকা মুসলিম অধ্যুষিত। তারা এখানকার বৈধ নাগরিক। বংশপরম্পরায় এখানে বাস করে আসছেন তারা। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী উগ্র অসমীয়ারা তাদেরকে বাংলাদেশি অবৈধ নাগরিক বলে দাবি করে আসছে, সেই দাবির প্রেক্ষিতে অবৈধ নাগরিক তাড়াতে তারা এখানে আক্রমণের তোড়জোড় প্রস্তুতি নেয়। নেলির নিরীহ মুসলিম বাঙালিরা এতে শংকিত বোধ করেন।
১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই ট্রাকভর্তি পুলিশ কন্টিনজেন্ট নেলির বর্বরিতে আসে এবং সেখানকার অধিবাসীদের আশ্বস্ত করে যে, তারা আশেপাশে পাহারা দিচ্ছে এবং তাদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। নিরাপত্তাকর্মীর আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে নেলি ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দারা পরের দিন, ১৮ ফেব্রুয়ারি যথারীতি কাজে যান।
সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে, হঠাৎ তিনদিক থেকে সশস্ত্র আততায়ীরা গ্রামগুলিকে ঘিরে ফেলে। গ্রামবাসীরা কপিলি নদীর দিকে পালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু নদীতেও পরিকল্পিতভাবে নৌকা নিয়ে আক্রমণকারীরা অপেক্ষা করছিল। প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে ছুরি, কাটারি, কুঠার, শাবল, বর্শা, গোদা বন্দুক দিয়ে হত্যালীলা চালানো হয়। এছাড়া সমস্ত বাড়িঘর ও ধানের গোলায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। যারা প্রাণে বেঁচে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে জায়গা পেয়েছিলেন তারা অবস্থা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসার পর অর্থাৎ ঘটনার ১৬ দিন পর স্বগৃহে ফিরে এসে দেখেন যে সেই ধানের গোলার আগুন তখনও জ্বলছে।
তাদের অভিযোগ যে হামলার দু’দিন আগে কানাঘুষো খবর পেয়ে তারা নেলি থানায় গিয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার আবেদন করেছিলেন কিন্তু পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয় নি।
বেশ কিছুদিন আগে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদক অমিতাভ ভট্টশালী গণহত্যা কবলিত নেলি এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রাম সফর করেন এবং গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেন।
১৮ই ফেব্রুয়ারি সকালে যখন অসমীয়া জাতীয়তাবাদী শক্তির সমর্থক কয়েক হাজার দুষ্কৃতকারী নেলি বসনতোরি গ্রামের একের পর এক বাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছিল, তখন গ্রামের পুরুষ-মহিলা- শিশুরা বৃদ্ধ মুহাম্মদ আব্দুল হকের বাড়ির ঠিক পেছনেই চাষের ক্ষেতে জড়ো হয়েছিলেন। মুহাম্মদ আবদুল হক সেসময়কার স্মৃতিচারণ করে অমিতাভ ভট্টশালীকে বলেন, ‘সকাল সাতটা নাগাদ বাড়ি-ঘর জ্বালানো শুরু হয়েছিল। গ্রামের দুই প্রান্ত থেকেই ঘর জ্বালাতে জ্বালাতে এগচ্ছিল ওরা। সব মানুষ আমার বাড়ির ঠিক পেছনের ক্ষেতে জমা হয়েছিল। হঠাৎ দেখলাম অনেকগুলো গাড়ি থেকে অস্ত্র হাতে লোকজন নামছে। মুখে গামছা বাঁধা। তারপরেই শুরু হয়েছিল গুলি আর তীর ছোঁড়া।’
প্রাণে বাঁচার জন্য দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়িয়েছিলেন পশ্চিমদিকের নদীর দিকে। সাঁতরে নদী পার হতে যাঁরা পেরেছিলেন, তাঁরাই এখনও জীবিত রয়েছেন সেই বিভৎসতার সাক্ষী হয়ে।
পুলিশ প্রশাসনের রহস্যময় নিস্ক্রিয়তা
বসনতোরি গ্রাম থেকে বেশ অনেক কিলোমিটার দূরে–পাহাড়ের কোলে চাবাগান ঘেঁষা গ্রাম বরবরি। একই দিনে সেখানেও হামলা হয়েছিল। সেখানকার সাড়ে পাঁচশো মহিলা-পুরুষ-শিশুকে সেদিন মেরে ফেলা হয়েছিল।
পরিকল্পনাটা ছিল একই রকম। চারদিক থেকে হাজার হাজার সশস্ত্র মানুষ দিয়ে প্রথমে বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দাও। তারপরে প্রাণভয়ে মানুষ যখন পালাবে, তখন গুলি বা তীর ছুঁড়ে মেরে ফেলো। যদিও দু’দিন আগেই থানায় ডেকে নিয়ে গিয়ে শান্তি কমিটি তৈরী করে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু ঘটনার দিন বেশ কয়েক ঘন্টা কোনও পুলিশ আসে নি আক্রান্ত এলাকায়।
বসনতোরির মুহাম্মদ আব্দুল হক বিবিসির অমিতাভকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা রক্ষীরা গন্ডগোল আঁচ করতে পেরেছিল, গুলির শব্দও হয়তো শুনেছিল। কিন্তু স্থানীয় থানার অফিসারেরা বাহিনীকে গ্রামে নিয়ে না এসে অন্যান্য দিকে টহল দেওয়াচ্ছিল। পরে কয়েকজন মহিলা কেন্দ্রীয় বাহিনীর গাড়ীগুলির পথ আটকালে তারা বুঝতে পারে কী ঘটছে ভেতরের গ্রামগুলোতে। দুষ্কৃতিরা তখনই পালাতে শুরু করে।’
দোষীদের হয়নি বিচার
সেদিনকার সেই ভয়াবহ গণহত্যার পর নিহতদের গণকবর দেওয়া হয়। তদন্তের পর প্রশাসন মৃতদের পরিবার-পরিজনকে মাত্র ৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়। অথচ পরের বছর দিল্লির ১৯৮৪ শিখবিরোধী দাঙ্গার নিহতদের পরিবারকে ৭ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এই গণহত্যার তদন্তে পুলিশ ৬৮৮টব ফৌজদারি মামলা দায়ের করে। যার মধ্যে অধিকাংশই তথ্যপ্রমাণের অভাবে পুলিশ চার্জশিট গঠন করতে পারেনি। কিন্তু অসম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর অসম গণ পরিষদ পরবর্তী নির্বাচনে জিতে ক্ষমতা দখল করে এবং সবকটি মামলা বন্ধ করে দেয়।
এই গণহত্যার তদন্ত করতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ত্রিভুবন প্রসাদ তিওয়ারির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই কমিশনের রিপোর্ট স্পর্শকাতর বলে ২০১৮ অবধি জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা হয়নি। অসম গণ পরিষদ বা AGP গণহত্যার ব্যাপারে তথ্য লোকানোর দায়ে অভিযুক্ত। এমনকি এই গণহত্যার ব্যাপারে কোনো শিক্ষামূলক গবেষণাকেও অাসামে বাধাদান করা হয়।
তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, বিবিসি
