পাঠ্যক্রমে সাহাবি-বিদ্বেষ: আলেমরা যা বলছেন

পাঠ্যক্রমে সাহাবি-বিদ্বেষ: আলেমরা যা বলছেন

রাগিব রব্বানি :

আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যবইয়ে একাধিক সাহাবিকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা অন্তর্ভুক্ত থাকার প্রতিবাদে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দেশের আলেম সমাজ। অবিলম্বে অভিযুক্ত পাঠ্যবইয়ে সংশোধনী আনারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

গত ২৬ জানুয়ারি ‘আলিয়া মাদরাসার বইয়ে সাহাবি-বিদ্বেষ’ শিরোনামে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলে বিষয়টি দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিগোচর হয়। তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, হজরত মুআবিয়া, আমর ইবনুল আস এবং মহানবীর স্ত্রী আয়েশা রাদি.-কে নিয়ে এমন বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা মাদরাসার সিলেবাসে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে!

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতী ফয়জুল্লাহ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এ ব্যাপারে। তিনি বলেন, নবিয়ে করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে আমরা তথা পরবর্তী উম্মতের জন্য অনুসরণীয় দল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদার কথা কুরআন-হাদিসে বারবার বিবৃত হয়েছে। তাঁদের সকলকে বলা হয়েছে মাহফুজ। নবিজির স্নেহছায়া ও সান্নিধ্য পেয়ে তাঁরা সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁদের যে কারও সম্পর্ক বিদ্বেষমূলক কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই। অথচ তাঁদের মধ্যে সম্মানিত এবং প্রসিদ্ধ একাধিক সাহাবিকে নিয়ে আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যবইয়ে মানহানিকর এবং চরম অপমানমূলক কথাবার্তা সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে, একটি কুচক্রী মহল সাহাবি-বিদ্বেষী প্রজন্ম তৈরির পায়তারা করছে। সরকারের উচিত এই কুচক্রী মহলকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মুফতী ফয়জুল্লাহ আরও বলেন, সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। সারা পৃথিবীতে ইসলামের প্রচার এবং প্রসার প্রথমত তাদের হাত ধরেই হয়েছিল। এখন যদি এই সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে আঙ্গুলি ওঠানো যায় তাহলে পুরো ইসলামকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়। এই জন্যই মূলত তাদের সম্পর্কে বিষোদগার এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ বাক্যাবলি পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করা হয়েছে।

মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে উদ্দেশ করে মুফতী ফয়জুল্লাহ বলেন, অবিলম্বে অভিযুক্ত পাঠ্যবইয়ে সাহাবিদের সম্পর্কে বিবৃত ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও বিষোদগারমূলক বাক্যাবলি সংশোধন করতে হবে। অন্যথায় ওলামায়ে কেরাম বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।

এ ব্যাপারে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে কোনো সিলেবাসে এ ধরনের কথাবার্তা সংযোজন করা চরম পর্যায়ের ধৃষ্টতা। মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বোর্ডকে অবিলম্বে অভিযুক্ত বইয়ে সংশোধনী আনতে হবে। অন্যথায় ওলামায়ে কেরাম আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।

এ দিকে ইসলামী আন্দোলনের আমীর মুফতী রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, সাহাবিদেরকে আকাশের তারকার সাথে তুলনা করেছেন নবিজী। যে কেউ একজন সাধারণ সাহাবিকে অনুসরণ করলেও সে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে। সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে কুরআনের আয়াতে আল্লাহ বলেন, আমি সাহাবিদের উপর খুশি, তারাও (সাহাবীরা) আমার উপর খুশি। সাহাবায়ে কেরাম হচ্ছেন সত্যের মাপকাঠি। কোনোভাবেই তাঁদের সমালোচনা করা যাবে না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ঐক্যমত এটার ওপরেই। অথচ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের সিলেবাসে সম্মানিত একাধিক সাহাবিকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক কথা বলা হয়েছে। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবিলম্বে এই পাঠ্যবইয়ে সংশোধনী আনার জোর দাবি জানান পীর সাহেব চরমোনাই।

এদিকে আহলে হাদিস ঘরানার ওলামায়ে কেরামও এই ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। শাইখ আবু বকর মুহাম্মাদ জাকারিয়ার কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সকল সাহাবায়ে কেরাম আমাদের কাছে সমালোচনার ঊর্ধ্বে। কোনোভাবেই তাদের সমালোচনা করা যাবে না। আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যবইয়ে দুই মহান সাহাবিকে নিয়ে যে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং গর্হিত কাজ। সংশ্লিষ্টদের কাছে আমাদের জোর দাবি থাকবে, অনতিবিলম্বে যেন বিদ্বেষমূলক এসব কথাবার্তা পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে সঠিক ইতিহাসের আলোকে ইসলামের ইতিহাস ছাত্রদেরকে পড়তে দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, আলিয়া মাদরাসার দাখিল নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যভুক্ত ইসলামের ইতিহাস বইয়ের ১৪৯ নং পৃষ্ঠা থেকে ১৫৪ নং পৃষ্ঠা পর্যন্ত স্থানে স্থানে সাহাবি হজরত মুআবিয়া এবং আমর ইবনুল আস সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক বিশেষণ ব্যবহৃত হয়েছে। এক জায়গায় নবিজির স্ত্রী হজরত আয়েশা রাদি. আনহা সম্পর্কেও করা হয়েছে বিষোদগার।

বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রকাশিত এ বইটির রচনা সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন মোহাম্মদ আনোয়ার মাহমুদ এবং ইশরাত জাহান। ২০০৩ সালে বইটি প্রথম মুদ্রিত হয়। ২০০৯ সালের নভেম্বরে পরিমার্জিত সংস্করণ বের হয় এবং ২০১৭ সালে তা পুনর্মুদ্রিত হয়।

আগের সংবাদরবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রতি ব্যয় প্রায় ৫ লাখ টাকা হলেও আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ৬৮১ টাকা!
পরবর্তি সংবাদ‘মধ্যপ্রাচ্য শান্তি’ পরিকল্পনায় পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী করার প্রস্তাব