
কাজী মাহবুবুর রহমান
আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে ১৮৭১ সালে ফ্রান্সের প্যারিতে প্রলেতারীয় বিপ্লবীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রলেতারিয়েত শ্রেণির একটি বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়েছিল। সেটাকে ‘প্যারিস কমিউন’ নামে আখ্যায়িত করা হয়৷ গবেষকরা বলেন, সেটি ছিল ইতিহাসে প্রথম প্রলেতারীয় একনায়কত্বের সরকার। মূলত বুর্জোয়া ক্ষমতাসীন শ্রেণির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির মাঝে এই সংগ্রাম গড়ে ওঠে৷ বিপ্লবীরা সরকার গঠনে সক্ষমও হয়েছিল, তবে টিকিয়ে রাখতে পারেনি৷ মাত্র ৭২ দিন সেই সরকার টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয় তারা। ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ থেকে ২৮ মে।
প্যারিসের কমিউনার্ডগণ পুরনো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে কমিউনকে গঠন করে। ২৬ মার্চ প্যারিস কমিউন নির্বাচিত হয়ে ২৮ মার্চ তা ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ফ্রান্সের বুর্জোয়া শ্রেণি আক্রমণ চালিয়ে কমিউনকে ধ্বংস করে। এবং নিজেদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে।
বামপন্থী নেতারা এই কমিউন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন৷ মার্কস তাঁর আন্দোলনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘প্যারিস কমিউনের প্রতি চোখ ফেরান। সেটাই হলো প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব।’
প্যারিস কমিউনের প্রধান র্শত ছিল চারটি।
১) কোনো প্রকার স্থায়ী সেনাবাহিনী থাকবে না বরং সাধারণ জনগনের দ্বারাই তৈরি হবে সশস্ত্র বাহিনী। কমিউনের প্রথম ডিক্রিই ছিল স্থায়ী সৈন্যবাহিনীর বিলোপ ও সশস্ত্র জনগণ দিয়ে তার স্থানপূরণ।
২) একজন দক্ষ শ্রমিকের চেয়ে কোনো অবস্থাতেই কোনো সরকারি র্কমকর্তা বেশি বেতন পাবেন না। রাষ্ট্রের বড় চাকুরেদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমস্ত বিশেষ সুবিধা ও প্রতিনিধিত্ব ভাতাও দূর করা হয়েছিল। রাষ্ট্রের সমস্ত পদাধিকারীর বেতন হবে মজুরের বেতনের সমান।
৩) সরকারে সকল স্তরের র্কমকর্তাগণ অবশ্যই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হবেন এবং প্রয়োজনে তাদেরকে অপসারণের অধিকারও থাকবে।
৪) নির্ধারিত সময়ান্তে প্রত্যেক ব্যক্তিই অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পরিচালনার কাজে অংশগ্রহণ করবেন।
প্যারিস কমিউন এক দিক থেকে নির্যাতিত ও শোষিত মানুষের জন্য একটি ভালো উদ্যোগ ছিল। তবে কমিউনের উগ্রনীতি মানুষের জন্য ক্ষতিকরও ছিল৷ তারা সরকার গঠন করে প্রথমেই দেশ থেকে সমস্ত গির্জা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করে দেয়। এ ছাড়াও সমগ্র আন্দোলনটি আগাগোড়া শ্রেণিবৈষম্যের প্রশ্নে মানুষের মাঝে বিদ্বেষের জন্ম দেয়। তাদের দর্শনমতে অর্থনৈতিক কাঠামোগত উঁচু-নীচু মানুষের পাশাপাশি অবস্থান অসম্ভব বলে মনে করা হয়। বস্তুত অর্থ ও বিত্তের ভিত্তিতে মানুষের বহু স্তরের অবস্থান এবং এরই মাঝে সকলের নির্বিবাদ সহাবস্থান হচ্ছে প্রকৃতির দাবি৷
প্যারিস কমিউনের এইসব চরমপন্থার বিপরীতে ইসলামিক মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থার কল্পনা করা যায়। সম্প্রতি এর ক্ষুদ্র প্রমাণ মিলেছে ইন্দোনেশিয়ায়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইউসুফ সুলতান প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বয়ান করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় একটি গ্রামের কথা শোনা গেছে। আবাসিক প্রকল্প। নাম কাম্পুং ইসলামি তইবাহ। ‘কাম্পুং’ অর্থ গ্রাম আর ‘তইবাহ’ মানে পবিত্র। অতএব কাম্পুং ইসলামি তাইবার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ইসলামি পবিত্র গ্রাম।
কাম্পুং ইসলামি তাইবার নির্দিষ্ট কিছু অবস্থান-নীতিমালা রয়েছে। ১. কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক চলতে হবে। ২. পুরুষরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে মসজিদে পড়তে হবে। ৩. ধূমপান নিষিদ্ধ। ৪. নারীদের হিজাব পরতে হবে। ৫. এই এলাকা মিউজিকমুক্ত।
এই সামাজিক চুক্তিকে শ্রদ্ধা করেই সেখানকার আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। তাদের মাঝে পরস্পর কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু নিয়মপালিত হচ্ছে অক্ষরে অক্ষরে। এই ক্ষুদ্রগ্রামটি থেকে একটি বৃহৎ ধারণা তৈরি হতে পারে। নির্মোহ বিচারে কমিউনিস্ট আদর্শের চেয়েও ইসলাম প্রলেতারিয়েত জনগোষ্ঠীর প্রতি অধিক স্নেহশীল৷ সুতরাং আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের জন্য কাম্পুং ইসলামি তইবাহর আদলে ছোট ছোট এমন এলাকা তৈরি করার উদ্যোগ নিলে বৃহৎ একটি বিপ্লব সংঘটনের আশা কেবলই দূরাশা নয়৷
