
মুসান্না মেহবুব
তুর্কি জনগণের কাছে তাঁদের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান কতটা প্রিয়, ২০১৬ সালের সেনাবাহিনীর ব্যর্থ অভ্যূত্থান-চেষ্টায় পুরো বিশ্ব তা অবাক হয়ে দেখেছে। এরদোগানের এক আহ্বানেই সেনাবাহিনীর শক্তিশালী একটি অংশের সেই অপচেষ্টাকে তুর্কি জনগণ জানবাজি রেখে রুখে দিয়েছিল। তুর্কিদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শাসকের প্রতি জনসাধারণের ভালোবাসার এমন নজির দ্বিতীয়টি নেই।
২০১৬ সালের ১৫ জুলাই রাতটা এখনও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে তুর্কি জনগণের। সে রাতে আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে সেনাবাহিনীর শক্তিশালী একটা অংশ অভ্যুত্থান চালাতে ট্যাংক-কামান নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। আর অভ্যুত্থান রুখতে তাদের বিরুদ্ধে খালি বুকে মুকাবেলায় নামে তুরস্কের জনগণ। যার ফলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২৫০ জনেরও বেশি লোক নিহত এবং ২ হাজারেরও বেশি লোক আহত হন।
ঘড়ির কাঁটায় রাত তখন ১টা বাজে। ইস্তাম্বুলের বসফরাস ব্রিজ বন্ধ করে দিয়ে এর আশে-পাশে অবস্থান নেয় অভ্যূত্থানে অংশ নেওয়া সৈন্যরা। তারা তুর্কি পার্লামেন্টে রকেট হামলা চালায়।
বিদ্রোহীরা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। প্রেসিডেন্ট এরদোগান রাষ্ট্রীয় কাজে তখন ইজিয়ান প্রদেশে অবস্থান করছিলেন।
এ সময় প্রেসিডেন্ট এরদোগানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন তুরস্কের আপামর জনসাধারণ। পুলিশের পাশাপাশি তাদের সঙ্গেও অভ্যুত্থানকারীদের রাতভর সংঘর্ষ চলে। ১৬ জুলাই সকালেও দেশটির বড় বড় শহরে বিস্ফোরণ, গুলি ও সংঘর্ষ চলে।
আরও পড়ুন : এরদোগান : ফেরিওয়ালা থেকে তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধান
কয়েক ঘণ্টা ধরে নৈরাজ্যকর অবস্থা চলার পর ওই দিন সকালে ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রেসিডেন্ট এরদোগান। সেখানে দেওয়া ভাষণে তিনি পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান। প্রেসিডেন্ট এরদোগান অভ্যুত্থানের পেছনে দেশটির ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনের জড়িত থাকার অভিযোগ আনেন।
সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। বসফরাস সেতুর ওপর অবস্থান নেওয়া অভ্যুত্থানকারী সেনারা আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে। এ সময় শত শত সেনার আত্মসমর্পণের দৃশ্য টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেছে। দুপুরের দিকে আঙ্কারায় নিজের কার্যালয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম বলেন, অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে প্রায় তিন হাজার সেনাসদস্যকে আটক করা হয়েছে।
ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে তুর্কি সরকার। অভ্যুত্থানের পরপরই দেড় লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয় এবং আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে আটক করা হয়।
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইজমিরের একটি আদালতে বিচারের মুখোমুখি হন ২৮০ জন সাবেক সেনা সদস্য। ১০৪ সাবেক সেনা সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরও ৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির এক খবরে বলা হয়েছে, ১০৪ জন সাবেক সেনা সদস্যের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার পাশাপাশি প্রেসিডেন্টকে হত্যা চেষ্টার ষড়যন্ত্রে সহায়তার অভিযোগে ২১ জনের ২০ বছরের এবং একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য হওয়ার কারণে ৩১ জনের সাত এবং ১১ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
