
হামমাদ রাগিব :
বাংলাদেশে ওলামায়ে কেরামের জীবনী সাহিত্য চর্চার দিকটি এখনও অনেক অপূর্ণ। মনীষী আলেমদের জীবনের বৈচিত্র্যময় দিকগুলো নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি। একটু-আধটু যাও হয়েছে বা হচ্ছে, দুএকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেগুলোও গতানুগতিক। অথচ জীবনী সাহিত্যে বাংলাদেশের বাইরের মুসলিম ও আলেম ঘরানার কাজ অনেক ব্যাপক ও সমৃদ্ধ।
ইসলাম বিষয়ক প্রথিতযশা লেখক ও সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ জীবনী সাহিত্যের গুরুত্ব বিষয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় বলেন, জীবনী সাহিত্য নিয়ে বাংলাদেশে আমাদের পরিমণ্ডলে যেভাবে কাজ হওয়া দরকার, সেভাবে হচ্ছে না। অথচ বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, জীবনের সঙ্গেই ইতিহাস জড়িত। একজন বড় মনীষীর জীবনের বৈচিত্র্যময় দিক, তাঁর জীবনযাপনের কৌশল ও তরিকা, অভিজ্ঞতা, সংকট-উত্তরণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে অনেক শিক্ষণীয় জিনিস থাকে। যা থেকে পরবর্তী প্রজন্ম অনেক উপকৃত হয়। পাশাপাশি এই জীবনী সাহিত্যের মাধ্যমে পূর্বসূরীদের সঙ্গে উত্তরসূরীদের একটা যোগসূত্রও স্থাপিত হয়। তাছাড়া পূর্বসূরীদের জীবনী সংরক্ষণ ও চর্চা উত্তরসূরিদের জন্য অপরিহার্য একটা দায়িত্বও বটে।
ধর্মীয় অঙ্গনে জীবনী সাহিত্যের চর্চাগত পরম্পরা এবং বাংলাদেশে এর সংকট নিয়ে কথা বলেছেন তরুণ আলেম ও লেখক মাওলানা মীযান হারুনও। ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে তিনি বলেন, ইসলামের ইতিহাসের শুরুর দিকে আমাদের সালাফগণ যদিও নিজেদের জীবনী লিপিবদ্ধ করাকে পছন্দ করতেন না, কিন্তু কিছুকাল পরে মুসলিম সমাজে যখন সভ্যতা সংস্কৃতি লেখালেখি ইত্যাদি বিষয়ে জাগরণ তৈরি হলো, সালাফের পরবর্তী উলামায়ে কেরামের অনেকে তখন নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো লিখে রাখার চর্চা শুরু করলেন। যিকরায়াতি, হায়াতি ইত্যাদি নামে তাঁরা নিজেদের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিজেদের আত্মজীবনী লিখে বা লিখিয়ে যেতে থাকলেন। ওলামায়ে কেরাম থেকে শুরু করে মুসলিম খ্যাতনামা শাসকবর্গও এই কাজে মনোযোগী ছিলেন। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলগুলোর মতো ভারত উপমহাদেশের মুসলিম শাসকবর্গও জীবনী সাহিত্য চর্চা তথা নিজেদের জীবনী সংরক্ষণের ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন। সুলতান মাহমুদ গজনবি, যিনি চারশো হিজরিতে, আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে শাসন করেছেন, তিনিও নিজের জীবনকালের নানা দিক সংরক্ষণ করিয়ে গেছেন। এমনকি মোঘল শাসকদের অনেকেই, সম্রাট বাবর, জাহাঙ্গীর, অনেকেই নিজেদের আত্মজীবনী সংরক্ষণ করেছেন। পরবর্তী উলামায়ে কেরাম, অর্থাৎ মুতাআখখিরিন বলে আমরা যাঁদেরকে চিনি, তাঁরাও জীবনী সংরক্ষণের ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন। ভারতবর্ষের নিকট অতীতের ওলামায়ে কেরাম, মুজাদ্দিদে আলফে সানি, মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি, মাওলানা আবুল হাসান আলি নদভি, প্রত্যেকেই নিজেদের ও পূর্বসূরী আলেমদের জীবনী সংরক্ষণের ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন ছিলেন। ফলে জীবনী সাহিত্যের ক্ষেত্রে হিন্দুস্তান ও আরব বিশ্বের আলেম ও ধর্মীয় ঘরানায় বেশ সমৃদ্ধ ও মানসম্মত কাজ আছে এবং হচ্ছে।
মাওলানা মীযান হারুন বলেন, কিন্তু আমাদের বাংলা অঞ্চলে ব্রিটিশ ও হিন্দু জমিদার শ্রেণির শোষণ ও নিপীড়নের দরুণ দীর্ঘ একটা কাল মুসলমানরা শিক্ষাদীক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ফলে বাংলা ভাষার সঙ্গে এখানকার ওলামায়ে কেরামের দূরত্ব তৈরি হয়। এ অঞ্চলে বড় বড় মনীষী আলেমদের দাওয়াতি কার্যক্রম বিপুল ও বিস্তৃত থাকলেও লেখালেখির সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ না থাকার কারণে সেসব কার্যক্রমের খুব কমই ইতিহাসের পাতায় স্থান নিতে পেরেছে। একই সঙ্গে জীবনী সংরক্ষণের কোনো প্রক্রিয়া না থাকবার কারণে হারিয়ে গেছে তাঁদের কর্মপদ্ধতি ও অবদানের বিস্তারিত দাস্তানও। জীবনী সংরক্ষণের সেই ঘাটতি এখনও আমরা পোষিয়ে উঠতে পারছি না। পাশাপাশি বহির্বিশ্বের ওলামায়ে কেরাম জীবনী সাহিত্যে যে কাজ করে গেছেন এবং করছেন, আমাদের দেশে সেই রকম কোনো কাজ এখনও হয়নি।
তবে জীবনী সাহিত্যে বর্তমানে যে একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে আমাদের ঘরানায়, এ ব্যাপারে একমত মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ ও মীযান হারুন। তাঁরা নিজেরাও জীবনীভিত্তিক কিছু কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিগত দশকের শুরুতে হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর বৃহৎ কলেবরের স্মারকগ্রন্থে কাজ করেছেন মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। আল্লামা গহরপুরী রহ.-এর ওপর প্রকাশিতব্য একটি স্মারকেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। আর মাওলানা মীযান হারুন আরবি ভাষায় বাংলাদেশি মনীষীদের জীবনীর ওপর কাজ করেছেন বেশ সমৃদ্ধ আকারে।
জীবনী সাহিত্যে কাজ করতে গিয়ে এর সংকট ও সমস্যাগুলোও তাঁরা উপলব্ধি করেছেন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। মাওলানা মীযান হারুন জানান, যেহেতু জীবনী সাহিত্যে আমাদের কাজ অপ্রতুল, তাই বাংলাদেশের মনীষী আলেমদের জীবনী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তথ্যের অভাব ও বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়েছে ব্যাপকভাবে। তিনি বলেন, মনীষী আলেমদের জীবনীর ওপর যে সমস্ত বই আছে, সেগুলো নিতান্তই গতানুগতিক। কোনো কোনোটা সরাসরি কপিপেস্টের দোষে দুষ্ট। তাছাড়া জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে জন্ম-মৃত্যু, অলৌকিক ঘটনা-গল্প—এগুলোই জোর পেয়েছে বেশি। ব্যক্তির জীবন-দর্শন ও চিন্তার দিকটা ফুটে ওঠেনি ওভাবে। ফলে জীবনী সাহিত্যের আন্তর্জাতিক যে মান, সেটা তো রক্ষা হয়ই নি, ব্যক্তির চিন্তা ও দর্শনের সামগ্রিক রূপটাও উঠে আসেনি। ফলে মাদরাসা-সংশ্লিষ্ট ছাড়া বাইরের বোদ্ধামহলের উপকৃত হবার মতো কিছু পাওয়া যায় না এসব জীবনীতে।
জীবনী’র তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহেও নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হবার কথা জানান এ দুই লেখক আলেম। মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, স্মারকগ্রন্থের লেখা সংগ্রহের জন্য বিভিন্নজনের কাছে যেতে হয়েছে, আমাদের সমস্ত ব্যস্ততা রেখে দেখা গেল অনেক দূরের পথ সফর করে একজনের স্মৃতিচারণ আনার জন্য গিয়েছি, কিন্তু তিনি আমাদেরকে সময় দিতে পারছেন না। এটা নানা কারণে হতে পারে। কিন্তু সমস্ত ব্যস্ততার পরও জীবনী সংগ্রহের এ দিকটার কথা বিবেচনা করে ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করা যায়। কিন্তু আমার মনে হয়, জীবনী সংগ্রহের এ গুরুত্বটা বা লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে ওভাবে পরিচিতি ও সংশ্লিষ্টতা না থাকবার কারণে এ ব্যাপারগুলো ঘটে। এটা যে কেবল জীবনী সংগ্রহের বেলায়, এমন না, লেখালেখি বা সাংবাদিকতার সুবাদে যেকেনো বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যার কাছে যাওয়া হলো, তিনি সহজে বক্তব্য দিতে রাজি হন না।
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, সবাই যে এমন করেন, তা না। ব্যতিক্রমও আছে। অনেককে এমন পেয়েছি, যাঁরা সমস্ত ব্যস্ততা একপাশে রেখে বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় আমাদের যথেষ্ট সময় দিয়েছেন।
একই সমস্যার কথা বলছেন মাওলানা মীযান হারুনও। তিনি বলেন, আমার বইয়ের জন্য জীবনী সংগ্রহ করতে নেমে অনেক আলেমের তথ্য-উপাত্তের জন্য তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু পরিবার থেকে ওভাবে সাড়া পাইনি। অনেক ক্ষেত্রে অসহযোগিতারও মুখোমুখি হয়েছি। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মনীষীদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে। বা ইন্তেকালের অনেকদিন পেরিয়ে যাবার কারণে তাঁরা ভুলে বসে আছেন গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়। ফলে অনেক আলেমের বিস্তারিত জীবনেতিহাস সংরক্ষণের চেষ্টা সত্ত্বেও তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না।
তিনি বলেন, মনীষী আলেমদের অনেকের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ইন্তেকালের বহু বছর পরে। যার ফলে তাঁর জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হারিয়ে যায়। তাই এ ব্যাপারে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। মনীষী আলেমদের জীবদ্দশায়ই যাতে তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংরক্ষণ করা যায়, বা তাঁর ইন্তেকালের পরপরই তাঁকে নিয়ে বিস্তারিত কাজ করে ফেলা যায়, সে ক্ষেত্রে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।
জীবনী সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ ভিন্ন আরেকটি বিষয়ের দিকে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, দেশের আলোচিত মনীষী যাঁরা, জীবদ্দশায় জাতীয়ভাবে যাঁরা কাজ করেছেন, পরিচিত ছিলেন, তাঁদের বাইরে মফস্বল এলাকাগুলোতেও এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যাঁরা রাজনৈতিকভাবে অতো পরিচিত না, বা জাতীয়ভাবে তাঁকে কেউ খুব একটা চেনেন না, কিন্তু নিজের এলাকায় তিনি নীরবে নিভৃতে অনেক বড় বড় এবং মহৎ পর্যায়ের কাজ আঞ্জাম দিয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন। অবস্থানগতভাবে হয়তো তিনি কোনো মাদরাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম কিংবা মক্তবের উসতাদ, কিন্তু স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় বা সামাজিক জীবনযাত্রায় তিনি বড় একটা সময়জুড়ে নানাভাবে কাজ করেন। জীবনী সাহিত্যে যাঁরা কাজ করবেন বা করছেন, তাঁরা এসব ব্যক্তিবর্গকে খুঁজে খুঁজে বের করে তাঁদের ধর্মীয় ও সমাজকল্যাণমূলক কাজগুলোর বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করতে পারেন। জীবনী সাহিত্যের বড় একটা খোরাক কিন্তু এসব নিভৃত ব্যক্তিত্বের কাজ ও জীবনযাপন থেকে তুলে আনা সম্ভব এবং দরকারিও।
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ আরও বলেন, জীবনী সাহিত্যের ওপর প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হলেও বেশ কিছু কাজ হয়েছে, কিন্তু এর অধিকাংশই গতানুগতিক। জন্ম-মৃত্যু ও অলৌকিক ঘটনাবলির মধ্যে সীমিত এসব কাজের পরিধি। আমার মনে হয়, এই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যক্তির চিন্তা ও দর্শন বিষয়ে আলোকপাত, তাঁর অভিজ্ঞতা ও চিন্তাকে বিশ্লেষণ—এমনতরভাবে কাজ করা এখন দরকারি। এতে জীবনী চর্চার মাধ্যমে ব্যক্তির চিন্তা ও দর্শন সম্পর্কে পরবর্তী প্রজন্ম উৎসাহ ও প্রেরণা লাভ করবে।
একই প্রস্তাব মাওলানা মীযান হারুনেরও। তিনি বলেন, বহির্বিশ্বের প্রচুর মনীষীর জীবনভিত্তিক কাজের অনুবাদ হচ্ছে বাংলা ভাষায়। মৌলিক কাজও হচ্ছে। সাম্প্রতিক কালে তা বেশ ব্যাপকতা লাভও শুরু করেছে। যা খুবই আশাজাগানিয়া। তবে এ ক্ষেত্রে জীবনীচর্চার আন্তর্জাতিক যে মান, বহির্বিশ্বের জীবনীগ্রন্থগুলোতে যেভাবে জীবনী সাহিত্য শৈল্পিক একটা কাঠামোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এই প্রচেষ্টায় আমাদেরও যত্নবান হতে হবে।
