
মাওলানা মুহম্মাদ ফখরুল ইসলাম :
হযরত মাওলানা আবুল ফাতাহ্ মুহাম্মাদ ইয়াহ্ইয়া রহ. ২০০২-২০১৭ ইং পর্যন্ত পনের বছর ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াহ (বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড) -এর সহকারী মহাসচিব পদে সুনাম-সুখ্যাতির সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বেফাকের যে কোন ক্রান্তিকালে ও সঙ্কটময় মুহূর্তে তিনি ছুটে গিয়েছেন। সঙ্কট সমাধানে বড়দের অংশীদার হয়েছেন। বেফাকের জন্য স্বপ্রণোদিত হয়ে তিনি শ্রম দিয়েছেন, ঘাম ঝরিয়েছেন, রাতের পর রাত তিনি নির্ঘুম কাটিয়েছেন। বেফাকের প্রয়োজনে লিখেছেন, বলেছেন, পরিকল্পনা করেছেন ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন হালাত ও প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে তাদের মুখোমুখি হয়েছেন।
বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া নানামুখী ঝড়-তুফানের মোকাবেলা করে আজ দেশব্যাপী এ প্রতিষ্ঠানের যে গ্রহণযোগ্যতা, সুনাম ও সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে এবং উত্তরোত্তর উন্নয়নের যে ধারাবাহিকতা দৃশ্যমান হচ্ছে, তার পেছনে মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.-এর অবদান অনেক বেশি। মুরব্বীগণের পরেই যারা মেধা ও ভালোবাসা দিয়ে বেফাককে এতদূর অগ্রসর করেছেন, তাদের শীর্ষে ছিলেন তিনি।
বেফাকের প্রকাশনা বিভাগ আর্থিকভাবে বর্তমানে একটি উল্লেখযোগ্য সফল অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছে। আজকের সুজলা-সুফলা অবস্থানে উন্নীত হওয়ার পেছনে মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ.-এর র্কম পরিকল্পনার মূখ্য ভূমিকা রয়েছে। বেফাকের উন্নতি-অগ্রগতির নেপথ্যে তাঁর অবদান স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি মনে করতেন, মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে হলে খ-িত চিন্তাকে বর্জন করতে হবে, বিচ্ছিন্ন নেতৃত্বকে পরিহার করতে হবে, পারস্পরিক সমালোচনা আর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির পূতিগন্ধময় অর্š—ঘাতী মানসিকতাকে পরিহার করতে হবে। বেফাককে আরো গতিশীল করতে হলে এবং জাতীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে হলে সারাদেশের নেতৃস্থানীয় উলামায়ে কেরামের সাথে সমন্বয় সাধন করতে হবে। দল-মত নির্বিশেষে সহযোগিতা, সহনশীলতা ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে এক ঐক্যমঞ্চে সবাইকে সমবেত হতে হবে। তাহলেই সঙ্কটময় মুহূর্তেও জাতির কল্যাণ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা যাবে। কওমী মাদরাসাসমূহের মাঝে ঐক্য ও উলামায়ে কেরামের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে একটি মজবুত প্লাটফরম তৈরীর চির কাঙ্খিত এক স্বপ্ন নিয়ে হযরতুল আল্লাম মাওলানা নূর হোছাইন কাসেমী দামাত বারাকাতুহুম ও হযরত মাওলানা আব্দুল জাব্বার রহ. ও অন্যান্যদের সাথে তিনিও আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন।
সিলেট, চট্্রগ্রাম ও উত্তরবঙ্গসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাদরাসাসমূহে সফর করেছেন। এই উদ্যোগে অনেক মাদরাসাই বেফাকের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। বোর্ডের বাইরে থাকা অনেক মাদরাসাই বোর্ডের অধীনে এসেছে। বিশেষ করে কওমী মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির স্বার্থে কওমী মাদরাসাকেন্দ্রিক আঞ্চলিক বোর্ডগুলোকে বেফাকের প্লাটফমে ঐক্যবদ্ধ করার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় তিনি ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তবে এই স্বীকৃতি কওমী মাদরাসার স্বকীয়তা রক্ষায় কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে কী না? এই স্বীকৃতির নেপথ্য সরকারের রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্র আছে কী-না? এই বিষয়টি তিনি খুব ভাবতেন, চিন্তা করতেন। সরকার কেন স্বীকৃতি দিতে চায়? এর উদ্দেশ্য বোঝার জন্যই তিনি একটি সরকারী চিঠি উদ্ধার করেছিলেন। মন্ত্রণালয়ের সেই গোপন চিঠি আর আলেমগণের সঙ্গে সরকারের দেয়া শর্তাবলীর মধ্যে দ্বিমুখিতা ছিল স্পষ্ট, তিনি তা উলামাদের সামনে পেশ করেছেন।
বাংলাদেশের কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সহকারী মহাসচিব হিসেবে ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক প্রসারে তাঁর অবদান অনেক। কওমী মাদরাসাগুলোর সঠিক পরিচালনা ও দিকনির্দেশনা, পড়ালেখার মান উন্নয়নে তিনি অবিরাম চেষ্টা করেছেন। পাঠ্যসূচীতে বেশকিছু সংস্কারমূলক কাজও করেছেন। পরিবর্তনশীল বর্তমানের মাধ্যমে গৌরবময় অতীত এবং মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের মাঝে সংযোগ রক্ষা করাই হল দরসে নিযামীর মূল শিক্ষা এবং মহান আকাবিরগণের দীক্ষা। তিনি এ দীক্ষায় দীক্ষিত ছিলেন। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, সংস্কার ও যুগপোযুগী করার জন্য তিনি তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রখেছিলেন।
[জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষিত সমাজের প্রয়োজনকে তিনি সহজেই অনুধাবন করতে পারতেন। মাদরাসার ছাত্ররা যুগ ও সময়ের প্রয়োজনে অর্থনীতিতে দক্ষ হওয়া দরকার তা অনুধাবন করে ইসলামী অর্থনীতির উপর গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং এই গ্রন্থকে এদেশের কওমী মাদরাসার বোর্ড জালালাইন জামাতের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
মাদরাসা দারুর রাশাদের স্বনামধন্য মুহাদ্দিস মাওলানা লিয়াকত আলী দামাত বারাকাতুহুম লিখেছেন-‘তার লেখা বইগুলোর মধ্যে দারুল উলূম দেওবন্দ : ইতিহাস, ঐতিহ্য অবদান এবং ইসলামী অর্থনীতির ওপর লেখা বই দুইটিতে গভীর ও বিস্তৃৃত পড়াশোনার ফসল সন্নিবেশিত করেছেন। প্রথমোক্ত গ্রন্থখানা আমাদের কওমী মাদরাসার ফযীলত স্তরে পাঠ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত। দারুল উলূম দেওবন্দের মাধ্যমে দীনী শিক্ষা, দীক্ষা ও ঐতিহ্য লালনের নবতর ধারার সূচনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি যেমন ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন।
মুসলিমদের শাসন ও জগদ্বিখ্যাত মণীষীদের সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাস তুলে এনেছেন এবং মোঘলযুগে আকবরী ফিতনার প্রতিরোধে হযরত মুজাদ্দিদে আলফেছানী রহ. এর আন্দোলনের প্রকৃতি ও মূলনীতির পাশাপাশি মোঘল শাসনের শেষ পর্যায়ে বিপর্যস্ত মুসলিম সমাজের পুনরুজ্জীবনে হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিছে দেহলভী রহ. -এর সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও কর্মসূচীর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, তেমনি জিহাদী আন্দোলনের মাধ্যমে উপমহাদেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে আলেম সমাজের প্রচেষ্টা ও অবদানের সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছেন। দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ইলমি, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এ প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম ও পরিচালনা ব্যবস্থার দার্শনিক বিশ্লেষণের পর তিনি উপমহাদেশ ও বিশ^ মুসলিমের জন্য দারুল উলূমের অবদানগুলো দফাওয়ারি উল্লেখ করেছেন। এ জন্যই গ্রন্থখানা আমাদের অঙ্গণে বহুল পঠিত একটি বিষয় এবং ফযীলত স্তরের পরীক্ষার একটি পূর্ণ পত্র। কওমী পড়–য়ারা যেন পূর্বসূরীদের গৌরবময় ইতিহাস পাঠ করে উজ্জীবিত হয়ে নিজেদের কর্তব্য ও দায় সম্পর্কে প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হতে পারে, সেই লক্ষ্যে বেফাকের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় গ্রন্থখানাও ফযীলত স্তরে পাঠ্য ও পরীক্ষার বিষয় ছিল। অত্যন্ত জরুরি বিষয় হলেও কওমী মাদরাসাগুলোর বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে বাস্তব সীমাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার ভার লাঘব করার উদ্দেশ্যে বর্তমানে বিষয়টি মুলতবি রাখা হয়েছে। ইতোপূর্বে হযরত মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারভী রহ. প্রণীত ‘ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ পাঠ্য ছিল। কিন্তু সেটি তাত্ত্বিক আঙ্গিকে রচিত হওয়ায় পাঠ্যতালিকাভুক্ত হওয়ার মতো উপযুক্ত একখানা গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হচ্ছিল। সেই চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যেই মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. ইসলামী অর্থনীতিকে নতুন আঙ্গিকে বিন্যস্ত করে এই গ্রন্থখানা প্রণয়ন করেছিলেন এবং আধুনিক অর্থনীতির সব অধ্যায় ও বিষয়বস্তু সামনে রেখে ইসলামী বিধি ও মূলনীতিগুলো ব্যাখ্যা করেছিলেন।’
বেফাকের কাছে তাঁর প্রত্যাশা :
তিনি মনে করতেন-উলামায়ে কেরামের ঐক্যের প্রতীক ও উলামা মাশায়েখের সবচে’ বড় প্লাটফরম এই বেফাক। এর দায়-দায়িত্ব অনেক। তাই এই বেফাককে নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল, বেফাকের কাছে তাঁর অনেক প্রত্যাশাও ছিল। আগামী শতাব্দীর চ্যালেজ্ঞ মোকাবেলায় বেফাকের কার্যাবলী কেমন হওয়া উচিত তা তিনি জামিয়া শারইয়্যাই মালিবাগ ঢাকা প্রকাশিত ৩০ সালা দস্তারবন্দী মহাসম্মেলন স্মারকে ‘বেফাকুল মাদারিস ও আমাদের প্রত্যাশা’ নামক এক প্রবন্ধে লিখেছেন। সেই প্রবন্ধের কিয়দাংশ এখানে উল্লেখ করছি- ‘বেফাকের নিকট আমাদের প্রত্যাশা অনেক। আমাদের সামর্থ্য সীমিত। তবু এই সীমিত সামর্থ্যের মাঝ দিয়ে বেফাক যে কাজগুলো সহজে বাস্তবায়ন করতে পারে তার কতিপয় আমরা নিচে উল্লেখ করছি।
ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবনের সর্বত্র আল্লাহর বিধানের অনুবর্তিতার চেতনা সমৃদ্ধ ও দ্বীনী জ্ঞানের প্রজ্ঞার অধিকারী, বসীরতসম্পন্ন, তাকওয়ার অধিকারী দক্ষ আলেমেদ্বীন তৈরি করা। সে জন্য যা যা প্রয়োজন সমকালীন পৃথিবীর অবস্থার নিরিখে সেগুলো চিহ্নিত করে, সে সব ক্ষেত্রের অনুকূল জনশক্তি গড়ে তোলাই মূলত: সময়ের দাবী পুরণের প্রকৃষ্টতম পন্থা। আমাদের মাদরাসাগুলো থেকে সেরূপ জনশক্তি গড়ে উঠছে কি না? এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য দেয়া বেফাকের অন্যতম দায়িত্ব। পঠন-পাঠনের মাঝ দিয়ে ছাত্র যদি চেতনাসমৃদ্ধ হয়ে গড়ে না উঠে, তাহলে যে স্থবির চেতনাহীন জনশক্তি গড়ে উঠবে তাতে পাঠ গ্রহণকারী ছাত্র ব্যক্তিগতভাবে হয়ত কিছুটা লাভবান হবে (যদি তার মাঝে চেতনা থাকে) তবে তার দ্বারা জাতীয় অগ্রগতি আশা করা যায়না। সেজন্য দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো থেকে যাতে চেতনাসমৃদ্ধ রিজাল গড়ে ওঠে, সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। সুচিন্তিতভাবে এর জন্য কর্মসূচী প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরী।
যুগ পরিবর্তশীল। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের রুচি-অভ্যাসের পরিবর্তন হয়। আজ থেকে এক শত বছর আগের পঠন-পাঠন পদ্ধতি সে সময় যতই উপকারী প্রমাণিত হোক, বর্তমান মানুষের কাছে তা রুচিশীল বলে গন্য না হওয়াই স্বাভাবিক। সে কারণেই মানুষ জাগতিক ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তনের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রটিও এর ব্যতিক্রম নয়। অথচ আমাদের শিক্ষাধারায় তেমন কোন পরিবর্তন সূচিত হয়নি। সেকালে যে গ্রন্থগুলোকে পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, তা সেকালের জন্য অবশ্যই উপযোগী ছিল। কিন্তু শত বছর পরও তার উপযোগীতা বহাল থাকার কথা নয়। অথচ সেগুলোকে আমরা পরিমার্জন করতে পারতাম না কি? কিন্তু কে নেবে সেই উদ্যোগ? এককভাবে সম্ভব না হলেও সামষ্টিক উদ্যোগের দ্বারা আমারা এসব সমস্যা নিরসন করে শিক্ষাকে আরো গঠনমুখী ও ফলপ্রসূ করতে পারি। বেফাকুল মাদারিসকে পরীক্ষা গ্রহণের সাথে সাথে এসব বিষয়েও লক্ষ্য দেয়া প্রয়োজন। বর্তমানে আমাদের দেশে যে দক্ষ জনশক্তি আছে তাদেরকে সম্মিলিতভাবে কাজে লাগিয়ে আমাদের সিলেবাসের পুুরাতন কিতাবগুলোর সংস্কার করা সম্ভব। উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ক্রমান্বয়ে দক্ষ শক্তি গড়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। কাজের ক্ষেত্র তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা সে দক্ষতা নিয়ে গড়ে উঠতে সচেষ্ট হবে।
আমাদের দরসের বহু কিতাব মতন ও শরাহর সমন্বয়ে রচিত। এতে মূল বিষয় উপলদ্ধির ক্ষেত্রে যথেষ্ট জটিলতা হয়। বিশেষজ্ঞ আলেম-উলামাদের সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠন করে এসব কিতাবের মতন ও শরাহ সম্বনয়ে অপ্রয়োজনীয় অংশ ফেলে দিয়ে একটি নতুন গ্রন্থ তৈরি করা যায়। যেমন শরহে জামী, শরহে বেকায়া, নুরুল আনওয়ার, মুখতাসার, শরহে আকাঈদ ইত্যাদি গ্রন্থ যদি পরিমার্জন করা যায় এবং এর সাথে পরবর্তীতে রচিত এসব বিষয়ের গ্রন্থাদি থেকে ভাল কোন তথ্য বা ব্যাখা পাওয়া গেলে তা সংযোজন করা হয়।
টীকায় কোন ভাল বিষয় থাকলে তা টীকায় না রেখে যদি মতনে যুক্ত করে দেয়া হয়, উপমা উদাহরণ না থাকলে যদি তা সংযোজন করে দেয়া হয়, দাঁিড়, কমা ও প্যারা বিভাজন করে যদি গ্রন্থগুলো ছাপার ব্যবস্থা করা হয়, তদুপরি যদি অধ্যায় শেষে তামরীন ও অনুশীলন সংযুক্ত করে দেয়া হয়, তাহলে ছাত্রদের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান আহরণ সহজ হবে এবং অল্প সময়ে তারা অনেক বেশি জ্ঞান আহরণ করেতে পারবে। অথচ এক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছনে পড়ে আছি, আর সেই প্রাচীন ও জটিল পন্থাকেই ছাত্রদের মেধা গড়ার মোক্ষম পদ্ধতি মনে করছি। এক যুগে একটি বিষয় প্রয়োজনীয় থাকে, অন্য যুগে তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় এটাই স্বাভাবিক।
যুগের প্রয়োজনে একটি বিষয়কে পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করা যেমন জরুরী তদ্রƒপ যুগের পরিবর্তনে অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পাঠ্যসূচী থেকে বাদ দেয়াও তেমনি জরুরী। অবশ্য মনে রাখতে হবে যে, দ্বীনি শিক্ষায় কিছু বিষয় আছে মৌলিক, যা কাল কালান্তরে একই রকম থাকবে। সেগুলোতে পরিবর্তনের কোন প্রশ্নই আসে না। কিন্তু কিছু থাকে আনুসাঙ্গিক ও সহযোগী বিষয়। মৌলিক বিষয়গুলো অপরিবর্তিত রেখে আনুসাঙ্গিক বিষয়গুলো যুগের প্রেক্ষিতে পরিবর্তন করে অগ্রগতিকে তরাšি¦ত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের আকাবির এধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমেই দ্বীনী শিক্ষাকে যুগের সাথে ক্রম আগ্রসরমান রেখেছেন।
আবার নতুন যুগের প্রয়োজনের নিরিখে কিছু বিষয়ের সংযোজন করারও প্রয়োজন থাকে। যুগের অগ্রগতি থেকে আমি চোখ বন্ধ করে রাখলেও যুগ কিন্তু থেমে থাকবে না। তাই যুগের প্রয়োজনকে সামনে রেখে আমাদের কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন প্রয়োজন তা নির্ধারণ করত: সে বিষয়ে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। অন্ধগোড়ামী নয় বরং প্রজ্ঞার আলোকে সমকালীল যুগে আমাদের সামনে চলার নীতি কি হবে, তা নির্ধারণ করে সে জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সিলেবাস সংস্কারের কাজটি দ্রুতগতিতে করতে হবে এবং আমাদেরকে প্রতিযোগিতা মূলক এগিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় আমরা পিছিয়ে পড়ব।
এ বিষয়ের প্রতিও বেফাকুল মাদারিসের নযর দেয়া প্রয়োজন। ইসলাম ধর্মের মূল বিষয় কুরআন, সুন্নাহ থেকে উৎসারিত প্রধান বিষয়গুলো হল, আকাঈদ, ফিকাহ, তাফসীর, হাদীসের ব্যাখা বিশ্লেষণ ইত্যাদি। এসব কিছুর উৎসগ্রন্থগুলো আরবী ভাষায় প্রণীত। এজন্য আমাদের ছাত্রদের আবরী ভাষায় দক্ষতা থাকা একান্ত অপরিহার্য। বিগত শতাব্দীগুলোতে যেসব আলেম আরবী ভাষায় দক্ষ ছিলেন তারাই বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। তারাই জাতির জন্য অবদান রেখে গেছেন বেশি। অথচ আমাদের কওমী মাদরাসাগুলোতে আরবী সাহিত্য খুব গুরুত্ব সহকারে পড়ানোর পরও আরবী সাহিত্যে দক্ষ ছাত্র খুব কমই তৈরি হয়। কেন এমনটি হচ্ছে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। আমাদের ধারণামতে আরবী সাহিত্যের পাঠদান পদ্ধতিতে জটিলতার কারণেই এক্ষেত্রে আমরা প্রত্যাশা অনুয়াযী ফল পাচ্ছি না।
নাহু সরফের কিতাব পড়ে পড়ে ছাত্ররা অজ¯্র সময় ব্যয় করে, অক্লান্ত পরিশ্রমও করে। কিন্তু দশ লাইন শুদ্ধ আরবী তৈরির যোগ্যতা তাদের হয় না। এ জন্য নিচের দিকের ক্লাসগুলোতে অন্যান্য বিষয়ের চাপ কমিয়ে আরবী সাহিত্যের উপর তামরীনমূলক ক্লাস চালু করা প্রয়োজন। ছাত্রদরকে সাহিত্যের কিতাবের তাহকীক লিখিয়ে মুখস্থ শোনার চেয়ে তার দ্বারা আরবী তৈরি করানোর প্রতি জোর দেয়া প্রয়োজন। এজন্য এ বিষয়ে দক্ষজনদের সাথে পরামর্শ করে আমাদের প্রাথমিক ক্লাসগুলোর পাঠ্যবিন্যাস কিভাবে করা প্রয়োজন তা স্থির করা একান্ত অপরিহার্য। এটা সময়ের অন্যতম দাবী।
আগামী শতাব্দীর চ্যালেজ্ঞ মোকাবেলায় বেফাকের কার্যাবলী কেমন হওয়া উচিত তার কতিপয় দিক উল্লেখ করা গেল।
ক. ছাত্রদের আদর্শিক চেতনায় উজ্জীবিত করণের পদক্ষেপ গ্রহণ।
খ. সমকালীম অবস্থার প্রেক্ষিতে নিজস্ব কর্মক্ষেত্রের জন্য দক্ষ জনশক্তি হিসেবে ছাত্রদের গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ।
গ. পাঠ্য পুস্তক পরিমার্জন।
ঘ. যুগপ্রেক্ষিতে নতুন বিষয়ের সংযোজন।
ঙ. অপ্রয়োজনীয় বিষয় পাঠ্যসূচী থেকে বিলুপ্ত করণ।
চ. অনুশীলন সংযোজন ও দাঁড়ি, কমা ও প্যারা বিভাজন করে পাঠ্য পুস্তকসমূহ পূন:মুদ্রণের ব্যবস্থা করণ।
ছ. পাঠ্য বিন্যাস।
জ. পাঠদান পদ্ধতির সংস্কার করণ।
ঝ. শিক্ষার্থীদের ভাষাগত মানোন্নয়নের প্রতি লক্ষ্য দেওয়া। ঞ. উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করা ও তার জন্য বিষয়ভিত্তিক উন্নত ও উপযুক্ত সিলেবাস প্রণয়ন করা।
ট. ছাত্রদের তরবিয়ত ও আমল-আখলাক গঠনের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া ও এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ঠ. প্রতিষ্ঠানসমূহে ছাত্রদের মেধা বিকশিত হওয়ার অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
ড. যেসব এলাকায় মাদরাসা নেই সেখানে মাদরাসা গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ঢ. সকল প্রকার বাতিল প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় কর্মসূচী দান, জনমত গড়ে তোলা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।
আমরা আশা করি ক্রমান্বয়ে বেফাক এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করে এদেশের শিক্ষাধারায় একটি নতুন বিপ্লবের সূচনা করতে বলিষ্ঠ প্রত্যয়ে অগ্রসর হবে। এজন্য বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামকে মুক্ত মনে জাতির ভবিষ্যত বিনির্মাণের চেতনায় এগিয়ে আসতে হবে। আর মেধাকে মূল্যায়ন করে তাদের জন্য কর্মক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিতে হবে বেফাকুল মাদারিসকে।
বেফাকের ভবিষ্যত দৃষ্টিভঙ্গি অগ্রসরমান চেতনার ভিত্তিতে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন। বস্তুত বলিষ্ঠ ইচ্ছাই মানুষের অগ্রে চলার পথ রচনা করে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন।’
বেফাকে তাঁর কর্ম ও অবদান সম্পর্কে শীর্ষ আলেমদের মূল্যায়ন :
[
*বেফাকের সিনিয়র সহসভাপতি হযরত মাওলানা আশরাফ আলী দামাত বারাকাতুহুমের অভিমত: ‘বেফাকের বিভিন্ন সভায় তাঁর উপর আরোপিত হত বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যা তিনি যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে বাস্তবায়ন করতেন। বেফাক থেকে প্রকাশিত অধিকাংশ গ্রন্থনা তার স্বরচিত বা সম্পাদিত ছিল। এছাড়াও এযাবত বেফাকের সার্বিক উন্নয়নে রয়েছে তার যথেষ্ট অবদান।’
*বেফাকের এক দরদী কা-ারী হযরতুল আল্লাম মাওলানা নুর হোছাইন কাসেমী দামাত বারাকাতুহুম মাওলানা আবুল ফাতহ রহ.-এর জানাযার পূর্ব মুহূর্তে মরহুমের বেফাকে কর্মমুখর জীবনকে এভাবে মূল্যায়ন করেছেন- ‘তিনি দক্ষব্যবস্থাপক ও লেখক ছিলেন। বিগত পনের বছর ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াহ (বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড) -এর সহকারী মহাসচিব পদে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের একজন আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন। বেফাকুল মাদারিসকে জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ার ক্ষেত্রে যাদের অবদান রয়েছে, তাদের মধ্যে মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. -এর দৃঢ় অবদান অনস্বীকার্য। বেফাকের যে কোন লেখালেখির প্রয়োজন হয়েছে, যখন যা বলা হয়েছে সাথে সাথে তিনি তা প্রস্তুত করে দিয়েছেন। তাঁর এই অবদান ভুলার মতো নয়।’
*বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা আযহার আলী আনোয়ার শাহ দামাত বারাকাতুহুমের মূল্যায়ন- ‘১৯৮৩ ইং সালের পর থেকেই বেফাকের সাথে তার সম্পৃক্ততার সূচনা হয়। কারণ বেফাকের প্রাথমিক যুগে তো সে নিবেদিন প্রাণ হয়ে কাজ করত। অতপর বেফাকের মধ্যযুগ তথা ২০০০ ইং সন থেকে আমৃত্যু সে সহকারী মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। বেফাকের বিভিন্ন মিটিংয়ে ও অন্যান্য সময়ে মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. আমার প্রতি উস্তাযসুলভ ব্যবহার ও যে মান্যতা প্রদর্শন করেছে, তাতে আমি যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছি। অনেক শূরার মিটিংয়ে আমি সভাপতি ছিলাম। আমার যৌক্তিক যে কোন সিদ্ধান্তের সমর্থন করত সে। মনে পড়ে, স্টাফদের বেতন বাড়ানো নিয়ে যে মিটিং হয়েছিল, সেই মিটিংয়ে আমি সভাপতি ছিলাম। তখন আমি স্টাফদের বেতন ৫০% বাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত দিলাম। তখন অনেকেই আমার সিন্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তবে সে সময়ও মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. আমার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা তুলে ধরে জোড়ালোভাবে সমর্থন জুগিয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি-বেফাকের উন্নতি ও অগ্রগতির পেছনে দুইজন ব্যক্তির ত্যাগ, কুরবানী ও মেহনত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
একজন সাবেক মহাসচিব মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদী রহ.। আর অপরজন হল মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, তাদের নাম পর্যন্ত এখন নেওয়া হয়না এবং বেফাকের পক্ষ থেকে তাদের কর্মময় জীবনের উপর একটি আলোচনা সভাও হয়নি। মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. ছিলেন মহাসচিব অব্দুুল জাব্বার রহ. এর খুব আস্থাভাজন। সে মনপ্রাণ দিয়ে বেফাকের উন্নতি অগ্রগতির ব্যাপারে দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিত এবং মিটিংয়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট ভূমিকা রাখত। বেফাকের বিভিন্ন দুর্যোগকালেও মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. ভূমিকা ছিল অপরিসীম। আওয়ামী লীগের গত আমলে ২০১৩ ইং সনে একটি পক্ষ বিশেষ একজনের নেতৃত্বে কওমী মাদরাসার স্বীকৃতি নেওয়ার ব্যাপারে উঠেপড়ে লাগে। তখন বেফাকের মাঝে ফাটল সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সে সময় মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. উদ্ভুত এই পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট জোরালো ভূমিকা রেখেছিল।’
*বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াহ -এর আরেক সহকারী মহাসচিব জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়্যাহ এর প্রিন্সিপাল হযরত মাওলানা মাহফুযুল হক সাহেব দামাত বারাকাতুহুম আবুল ফাতাহ রহ. এর জানাযার পূর্বে বক্তব্যে বলেছেন: ‘২০০৫-২০১৫ পর্যন্ত প্রায় এগারটি বছর বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ায় দু’জন কাছাকাছি থেকে বেফাকের সুখে-দুখে, কঠিন পরিস্থিতিতে একসাথে কাজ করার আল্লাহ তাআলা সুযোগ দিয়েছিলেন। সেই হিসাবে বলতে পারি যে, যোগ্যব্যক্তি, চতুর্দিক সম্পর্কে সতর্ক আবার কর্মঠ, এটা এই যামানয় নাই বললেই চলে। মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহম্মাদ ইয়াহইয়া রহ., তাঁর মাঝে আল্লাহ তাআলা এই তিন গুণের সমাহর ঘটিয়ে ছিলেন। একদিক দিয়ে যোগ্যতার কোন কমতি ছিল না। চতুর্দিক সম্পর্কে খুবই সচেতন এবং সতর্ক ছিলেন এবং অত্যন্ত কর্মঠ ছিলেন।
ডায়াবেটিক্সসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত থেকেও বেফাকুল মাদারিসের যেকোন কঠিন পরিস্থিতিতে কী করা দরকার এবং তার অগ্রগতির জন্য কী করা প্রয়োজন? শত ব্যস্ততার মধ্যেও এই জাতীয় বিষয়টাকে সবসময় প্রধান্য দিতে দেখেছি। বিগত দুই বছর বেফাক আরো কঠিন পরিস্থিতি পার করেছে। প্রতিটা পদে পদে, প্রতিটা মুহূর্তে মুহূর্তে মুরব্বীয়ানে কেরামসহ বেফাকের সকলের মধ্যেই মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. -এর কর্মস্থলে অনুপস্থির শূন্যতা অনুভূত হয়েছে।’
*বেফাকের আরেক সহসভাপতি ও ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব, মুফতী ফয়জুল্লাহ সাহেব ‘বেফাকের অগ্রগতিতে’ মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ.-এর কর্মযজ্ঞ ও অবদানকে এভাবে মুল্যায়ন করেছেন- বেফাকের আজকের যে অবস্থান, এই অবস্থানের পিছনে হযরত মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. -এর অবদানকে যুগ কোনদিন অস্বীকার করতে পারবে না।
বেফাকের এই সিস্টেম, এই সৌন্দর্য, এই আলো এবং এই খুশবো ছড়িয়ে দেয়ার পিছনে হযরত মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.-এর অবদানকে যদি আমি শীর্ষে বলি, আমার মনে হয় তা ভুল হবে না।’
*শেখ জনূরুদ্দীন র. দারুল কুরআন চৌধুরীপাড়া মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মাদ আবূ মূসা দামাত বারাকাতুহুমের মন্তব্য: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১২ ইং. সালের কথা। বেফাকের ইতিহাসে ‘সবচে’ সুন্দর কাউন্সিল। এই ঐতিহাসিক কাউন্সিল শেখ জনূরুদ্দীন র. দারুল কুরআন মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। সারা বাংলাদেশ থেকে বরেণ্য উলামা ও মাশায়েখ এই কাউন্সিলে তাশরীফ আনেন। কাউন্সিলের আয়োজক বেফাক হলেও সার্বিক তত্বাবধানের দায়িত্ব উস্তাদে মুহতারামের উপর ছিল। মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম, প্যা-েলসহ অন্যান্য দায়িত্বও হুজুরের উপর ছিল। সাথে মালিবাগ জামিয়ার মুহাদ্দিস উস্তাদে মুহতারামের অনুজ মাওলানা নজরুল ইসলামও ছিলেন। উস্তাদে মুহতারাম রাহ. প্রধান সঞ্চালক ছিলেন। সাথে জামিয়া রাহমানিয়ার মাওলানা মাহফুজুল হক দামাত বারাকাতুহুমও ছিলেন। কাউন্সিলের পুরো দায়িত্বে ছিলেন বেফাকের দীর্ঘদিনের কান্ডারী মহাসচিব হযরতুল আল্লাম আব্দুুল জাব্বার জাহানাবাদী রাহ.।
উস্তাযে মুহতারামের সাথে মাওলানা আব্দুল জাব্বার রাহ.-এর বেশ সখ্যতা ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। আরেক মনীষী হলেন, আল্লামা নূর হোছাইন কাসেমী দামাত বারাকাতুহুম। এই তিন আকাবির প্রায় সকল কাজ একসাথে করতেন। দিনে রাতে চব্বিশ ঘন্টায় যে কোন বিষয়ে নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ হত। বেফাকের কাউন্সিলেও এর ব্যতয় ঘটেনি। উস্তাযে মুহতারাম রাহ. সেদিন তিলাওয়াতে কালামে পাকও হামদ ও নাতের পর বেফাকের ঐতিহ্য ও অবদান নিয়ে যে দরদভরা দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন, উলামা –মাশায়েখ যুগ যুগ ধরে তা স্মরণ রাখবে। উস্তাযে মুহতারাম রাহ. বলেছিলেন, ‘বেফাক জাতীয় প্রতিষ্ঠান। আমাদের আবাবির ও আসলাফের রেখে যাওয়া আমানত। উলামায়ে কেরামের ঐক্যের প্রতীক এই বেফাক। উলামা-মাশায়েখের সবচে’ বড় প্লাটফরম এই বেফাক। এটি শুধুমাত্র একটি বোর্ড নয়। এর দায়-দায়িত্ব অনেক। তাই আজকে আমরা যারা এই কাউন্সিলে হাযির হয়েছি, আমাদের দায়িত্বও অনেক। সামনের পাঁচ বছরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদেরকে সুচিন্তিত মতামত পেশ করতে হবে। যাতে যোগ্য, অভিজ্ঞ, পরীক্ষিত ও আমানতদার নেতৃত্ব আসে।’
পাঁচ বছর পর আরেকটি বেফাকের কাউন্সিলতো হয়ে গেল কিন্তু দরদভরা আরেক আবুল ফাতাহ ছিল কী? ছিল কী তাঁর সেই হৃদয় নিংড়ানো আবেদন! আল্লাহ হযরতকে জান্নাতের উচ্চাসন নসীব করুন।’
আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল দ্বীনী খেদমতকে কবুল করুন এবং তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন, আমীন!
উস্তাযুল হাদীস, শেখ জনূরুদ্দীন র. দারুল কুরআন মাদরাসা, চৌধুরীপাড়া, ঢাকা
