মুসান্না মেহবুব:
২০০১ সালে ফতোয়া নিষিদ্ধের রায়ের প্রতিবাদে দেশ জুড়ে আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ ও বিডিআরের গুলিতে শাহাদত বরণ করেছিলেন দুই মাদরাসাছাত্রসহ ছয়জন আন্দোলনকারী। শহিদদের রক্ত-পিচ্ছিল এ পথ মাড়িয়ে দীর্ঘ দশ বছর পর হাইকোর্ট থেকে ফতোয়া নিষিদ্ধের রায় বাতিল করা হয়। ফলে বিশেষজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম কর্তৃক ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া প্রদানে আইনত আর বাধা থাকে না। বাধা থাকে না দেশের ফতোয়া বিভাগগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায়ও।
কিন্তু যে ছয় শহিদের রক্তের বিনিময়ে ফতোয়া নিষিদ্ধের রায় বাতিল হলো, যাদের জীবন দানের ধারাবাহিকতায় দেশের ফতোয়া বিভাগগুলোতে ইসলামি আইন নিয়ে গবেষণা ও ফতোয়া প্রদানের কাজ নির্বিঘ্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেই শহিদদের নিয়ে দেশের কোনো ফতোয়া বিভাগেই উল্লেখযোগ্য কোনো আলোচনা বা স্মৃতিচারণ নেই। নতুন প্রজন্মের ইফতা শিক্ষার্থীদের অনেকে জানেনই না এই আন্দোলন সম্পর্কে। যাঁরা জানেন, তাঁরা কেবল ছয়জন শহিদ হয়েছেন এ টুকুই জানেন, এই ছয়জনের পরিচিতি কিংবা আত্মদানের দাস্তান তাঁদের অজানা।
রাজধানীর কেরাণীগঞ্জে অবস্থিত বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাজুল ইসলামী থেকে গত শিক্ষাবর্ষে ইফতা সম্পন্ন করেছেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম। দুই বছরের শিক্ষাকালে মারকাজুল ইসলামীর ফতোয়া বিভাগে ফতোয়া আন্দোলন বা আন্দোলনে শাহাদতবরণকারী ছয় শহিদ সম্পর্কে কোনো স্মৃতিচারণ বা আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে মাওলানা রফিক জানান, এ ব্যাপারে দেশের ফতোয়া বিভাগগুলোতে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো আলাপ হয় না সাধারণত, তাই তাদের প্রতিষ্ঠানেও কোনো আলোচনা হয়নি।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে একটি মাদরাসায় কর্মরত আছেন। ফতোয়া আন্দোলন সম্পর্কে নানাজনের কাছ থেকে মৌখিক আলাপে তিনি জেনেছেন, আন্দোলনের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয়জন শাহাদত বরণ করেছেন এবং ধর্মীয় অঙ্গনে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে এ কারণে শহিদবাড়িয়া হিসেবে ডাকা হয়। তবে ছয় শহিদের নাম-ধাম কিংবা সেই সময়কার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মাওলানা রফিক বলেন, ফতোয়া বৈধ রাখার জন্য ছয়জন মানুষ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, এরই পরিপ্রেক্ষিতে ফতোয়াকে বৈধ ঘোষণা করে পুনরায় রায় দেওয়া হয়েছে, তাদের এই কুরবানি থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে। তাদের এই আত্মদানকে ফতোয়া বিভাগসহ ধর্মীয় অঙ্গনে স্মরণীয় করে রাখা উচিত বলে মনে করেন মাওলানা রফিক।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইফতা শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় এ বিষয়ে। তিনি বলেন, ফতোয়া আন্দোলন সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই নেই। তিনি যেখানে ইফতা পড়ছেন, সেখানেও কখনো এই আন্দোলন বা আন্দোলনে শাহাদতবরণকারীদের নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি কেবল ২০১৩ সালের হেফাজত আন্দোলনের কথা জানেন।
গাজীপুরের জামিয়া সাবিলুর রাশাদ মাদরাসাসহ একাধিক মাদরাসার ফতোয়া বিভাগে দায়িত্বপালন করেছেন মুফতী উবায়দুল হক খান। তিনি জানান, ইফতা বিভাগগুলোতে ফতোয়া আন্দোলন সম্পর্কে কোনো আলোচনা বা ছয় শহিদের স্মৃতি নিয়ে সাধারণত কোনো আলাপ হয় না। তিনি বলেন, আমি যে মাদরাসাগুলোতে ইফতা বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে এ বিষয়ে ছাত্রদের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি।
তবে ফতোয়া আন্দোলন ও ছয় শহিদের শাহাদত এ দেশের ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বলে মনে করেন তরুণ এ মুফতী। একই সঙ্গে দেশের ফতোয়া বিভাগগুলোতে অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও ছয় শহিদদের নিয়ে স্মৃতিচারণধর্মী আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রাখা দরকারি বলেও মতামত ব্যক্ত করেন তিনি।
তবে রাজধানীর জামিয়া রাহমানিয়া সাত মসজিদ মুহাম্মদপুরের শিক্ষক মুফতি সাঈদ আহমাদ বলছেন, কোনো শহিদ বা প্রয়াত ব্যক্তি নিয়ে নির্দিষ্টভাবে দিবস-কেন্দ্রিক আলোচনা বা আনুষ্ঠানিক স্মৃতিচারণের রেওয়াজ আমাদের মাদরাসাগুলোতে নেই। তাই ইফতা বিভাগগুলোতে ছয় শহিদ নিয়ে আলোচনা বা স্মৃতিচারণমূলক কিছু হয় না। তবে ইসলামি ঘরানার রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ফতোয়া আন্দোলনের ছয় শহিদসহ অন্যান্য আন্দোলন সংগ্রামে শাহাদতবরণকারীদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে স্মরণসভা করে থাকে। মাদরাসা-অঙ্গনে ব্যক্তিগতভাবেও এসব আন্দোলন-সংগ্রাম সম্পর্কে আলোচনা হয়। তাই সচেতন ছাত্র মাত্রই এসব আন্দোলন-সংগ্রাম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে। এবং এসবকে নিজেদের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করে।
