বৈশাখী শোভাযাত্রার বিরোধিতা : মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কি হস্তক্ষেপ করছে প্রশাসন?

রাগিব রব্বানি

পহেলা বৈশাখ ১৪২৬ খ্রিষ্টাব্দ যতই ঘনিয়ে আসছে, নববর্ষ উদযাপনের নামে নানা মাত্রিক আয়োজনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে রাষ্ট্র থেকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি এসব প্রস্তুতিকে রঙচঙ ছড়িয়ে নিউজ করতে ব্যস্ত গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ। তাদের দাবি, পহেলা বৈশাখে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে এমন উৎসব পালন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ।

কিন্তু পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পালিত মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ অধিকাংশ রীতিনীতিকে মুসলিম বাঙালিদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ মানতে নারাজ সমাজের বড় একটি অংশ। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষও এ দিনটিতে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান-আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন না।

ওলামায়ে কেরাম তীব্রভাবে বিরোধিতা করেন পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ করে এমন আয়োজন-অনুষ্ঠানের। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের মৌসুমে বিভিন্ন মাহফিল-সেমিনার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নানা প্লাটফর্মে এর বিরুদ্ধে তারা জনসচেতনতামূলক কথা-বার্তা বলেন।

ফলে ধর্মীয় ঘরানায় এ সম্পর্কে একটা সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। ধর্মপ্রাণ সাধারণ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরাও আলেমদের অনুসরণে এ উৎসবের বিরোধিতা করে অনলাইনে নানা মাত্রিক কথাবার্তা বলেন। কেউ কেউ উৎসব পালনে উৎসাহী কারও কারও সঙ্গে অনলাইনের কল্যাণে জড়িয়ে পড়েন বিতর্কে। যার দরুণ কয়েক বছর ধরে পহেলা বৈশাখ এলে অনলাইনে দুটো পক্ষ দাঁড়িয়ে যায়। একপক্ষ পহেলা বৈশাখের পক্ষে, অপরপক্ষ বিরুদ্ধে।

অনলাইনে এ ধরনের তর্কাতর্কি বেড়ে যাওয়ায় এ বছর পহেলা বৈশাখের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রশাসনিকভাবে তা রোধ করার জন্য বিশেষভাবে তৎপর হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পহেলা বৈশাখের বিপক্ষে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁদের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে, উৎসব ঘিরে নানা রকমের গুজব ছড়ানো হয় অনলাইনে। তাই এই গুজব বন্ধে তৎপর হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সচেতন মহলের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখা হয়, তাহলে পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা যাঁরা করেন, তাঁরা তো নিজেদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থেকেই এমন বিরোধিতা করেন। পহেলা বৈশাখে উৎসবের নামে সম্প্রতি যে সংস্কৃতির চর্চা চালু হয়েছে, তাঁদের বক্তব্য, সেটা এই কয়েক বছর আগেও ছিল না এবং তা মুসলিম বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে কোনোভাবেই যায় না। এর পক্ষে নানা ধরনের যুক্তিও তাঁরা পেশ করেন। এসবকে গুজব আখ্যায়িত করে যদি তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর হয়, তবে এটা কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হবে না?

এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম তরুণ চিন্তক আলেম, দ্য কুরআনিক হোম-এর রিসার্চ ফেলো মাওলানা মনযূরুল হকের সঙ্গে।

মাওলানা মনযূর বিষয়টাকে একটু খোলাসা করে বলতে গিয়ে জানান, আমি মনে করি দেশ এবং ধর্ম এ দুটো আমার দুই চোখ। ধর্ম যদি আমার ডান চোখ হয়, দেশ অবশ্যই বাম চোখ। কথাটা বলেছিলেন ভারতের মাওলানা মাহমুদ মাদানি। তো ধর্মের বিধি-নিষেধ রক্ষা করে দেশজ ঐতিহ্যকে যতটা মানা যায়, আমরা অবশ্যই ততটা মানি এবং পালন করি।

বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক কালে যে উৎসবগুলোর আয়োজন হয়, তার অনেকগুলোকেই ইসলাম সমর্থন করে না। একজন মুসলিম হিসেবে তাতে অংশগ্রহণ কারও জন্যই কাম্য নয়।

তবে এখানে মনে রাখতে হবে, ইসলাম সমর্থন করে না, এমন বিষয়গুলো দুটো ভাগে বিভক্ত। একটা হলো এমন বিষয়, যেটা ইসলামকে সরাসরি আঘাত করে। আর আরেকটা হলো ইসলামকে যা আঘাত করে না, তবে ইসলাম এমন বিষয়ের বিরোধিতা করে। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়, সেটা এই দ্বিতীয় প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এটা ইসলামকে আঘাত করে না ঠিক, তবে এমন আয়োজন-অনুষ্ঠানের কঠোর বিরোধিতা করে ইসলাম।

ইসলামকে যে বিষয়গুলো সরাসরি আঘাত করে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধরনের আপোষ করা চলবে না, শক্তভাবে তা প্রতিরোধ করাই তখন দায়িত্ব হয়ে পড়বে। আর ইসলামকে আঘাত করে না, তবে ইসলামে তা অসমর্থনযোগ্য—এমন বিষয়ে ইসলামের শান্তিপূর্ণ দাওয়াতি পদ্ধতিই আমাদের অবলম্বন করা উচিত।

সুতরাং বৈশাখী উৎসবের ব্যাপারে আমাদেরকে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতেই জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। বৈশাখী উৎসব যাঁরা উদযাপন করে, তারা কিন্তু প্রাকটিসিং মুসলিম না। ইসলামের মূল বাণী সম্পর্কে তাঁরা ওয়াকিবহাল নন। আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে তাঁদের পর্যন্ত ইসলামের মূল বাণী পৌঁছে দেওয়ার তদবির করা। তাহলে বৈশাখী উৎসবসহ উৎসবের নামে আরও যত ইসলাম-অসমর্থিত কালচার আছে, তা এম্নি এম্নিই রোধ হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় যে বিষয়টা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের সংবিধানে কিছু ক্ষেত্রে কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে লাগাম টানার বিধানও আছে। যেমন রাষ্ট্র-বিরোধী কোনো কথা বা যে কথায় সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়—ইত্যাদি বেশ কয়েকটব ব্যাপারে প্রশাসন বা সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে।

পহেলা বৈশাখ নিয়ে যে নির্দেশনাটা এসেছে আইজিপি মহোদয়ের পক্ষ থেকে, সেটা হলো পহেলা বৈশাখের বিরুদ্ধে কেউ গুজব ছড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। গুজবের কারণে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, সুতরাং এ ক্ষেত্রে প্রশাসন হস্তক্ষেপ করতেই পারে।

কিন্তু দেখতে হবে, পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁদের কথার মধ্যে গুজবের কিছু আছে কি-না। যদি থাকে, তবে তো অবশ্যই এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আমরাও চাই। ইসলামও গুজবধর্মী কথাবার্তার তীব্র বিরোধিতা করে।

তবে কেউ যদি ইসলামের আলোকে বা অতীত বাস্তবতার আলোকে এই উৎসবের বিরোধিতা করেন, আর প্রশাসন যদি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যায়, তবে অবশ্যই সেটা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ। এর তীব্র নিন্দা জানানো উচিত সকলের।

আগের সংবাদছাত্রলীগ নেতা হত্যা মামলায় ৪ জনের ফাঁসির আদেশ
পরবর্তি সংবাদখালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি চাইলে বিবেচনা করবে সরকার : তথ্যমন্ত্রী