রাগিব রব্বানি:
বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে নারীদের জন্য নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই বিপাকে পড়তে হয় বাইরে বেরোনো নামাজি নারীদের। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় তাদেরকে নামাজ কাজা করতে হয়। মসজিদে পৃথকভাবে নামাজের ব্যবস্থা না থাকায় নামাজের সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা নামাজ আদায় করতে পারেন না।
অনেক সময় এসব নারীর সঙ্গে থাকা পুরুষ অভিভাবকরাও বিপাকে পড়েন। নারীকে একাকী বাইরে রেখে নামাজের জন্য মসজিদে ঢুকতে নিরাপত্তাবোধ করেন না। ফলে তাকেও নামাজ কাজা করতে হয়।
তরুণ আলেম ও লেখক এহসান সিরাজ ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, আমাদের দেশের মসজিদগুলোতে নারীদের নামাজ তো দূরের কথা তাঁদের প্রবেশাধিকারই একরকম নিষিদ্ধের মতো হয়ে আছে। অনেক মসজিদের কর্তৃপক্ষ এমন আছে, যাদের ধারণা মহিলাদের জন্য মসজিদে প্রবেশ করা ঠিক নয়। এই ধারণা ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসল্লিদের বড় একটি অংশের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে আছে।
আরিফ বিল্লাহ নামে রাজধানীর লালবাগ এলাকায় বসবাসকারী আরেকজন আলেম ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে জানান, তিনি তাঁর স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে দূরের কোনো সফরে বেরোলে নামাজ আদায়ে সমস্যায় পড়েন। রাস্তায় নামাজের সময় হলে কোনো মসজিদে মহিলাদের নামাজের ব্যবস্থা না থাকবার কারণে তাদের নামাজ কাজা করতে বাধ্য হন।
তিনি বলেন, একবার এক মসজিদে নামাজের জামাত শেষ হবার বেশ খানিকপর আমার স্ত্রীকে নিয়ে ঢুকেছিলাম নামাজ আদায়ের জন্য। কিন্তু মসজিদে থাকা মুরব্বি গোছের কয়েকজন মুসল্লি, এমনকি সেই মসজিদের মুয়াজ্জিনও আমাদেরকে প্রথমে বাধা দেন। তাদের ধারণা ছিল, নারীদের জন্য মসজিদে নামাজ আদায় জায়েজ নেই। পরে আমাদের অসুবিধার কথা খুলে বললে এবং মসজিদে নারীদের নামাজ আদায়ে সাধারণভাবে কোনো সমস্যা নেই বুঝিয়ে বললে তারা আমাদেরকে মসজিদের এককোণায় নামাজ আদায়ের সুযোগ দেন।
এ দিকে মাওলানা এহসান সিরাজ জানান, ধর্মপ্রাণ বা সাধারণ দীনদার অনেক নারী আছেন, নানা প্রয়োজনে তাদেরকে বাইরে বেরোতে হয়। বাইরে থাকাকালে নামাজের সময় হলেও তারা নামাজ আদায় করতে পারেন না নামাজের জায়গা না থাকার কারণে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে ছোটবড় প্রতিটা শহর-বন্দরেই পর্যাপ্ত মসজিদ আছে। নামাজের সময় হলে বাইরে থাকা পুরুষ মুসল্লিরা সহজেই নামাজ আদায় করে নিতে পারেন। কিন্তু বাইরে থাকা মহিলারা, যারা নামাজের প্রতি পাবন্দ, মসজিদে আলাদা কোনো ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে তাদের ক্ষেত্রে এ সুযোগ হয় না।
এহসান সিরাজ বলেন, নারীদের মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে আমাদের ওলামায়ে কেরাম নিরুৎসাহিত করেন, এটা ঠিক আছে। কিন্তু বাইরে থাকা নারীরা, যারা নামাজের নির্ধারিত সময়ের ভেতরে নিজের বাসা বা গন্তব্যে পৌঁছুতে পারবেন না, তাদের জন্য রাস্তার পাশের এবং শহর-বন্দরের মসজিদগুলোতে অন্তত বিশেষ ব্যবস্থা রাখা উচিত। যাতে করে তাঁরা নির্ধারিত সময়ের ভেতরে নামাজ আদায় করে নিতে পারেন।
নারীদের মসজিদে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে জানতে চেয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে কথা বলেছিলাম দেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতি ও রাজধানীর শায়খ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মাওলানা মীযানুর রহমান সাঈদের সঙ্গে। তিনি এ মাসআলার শরয়ি দৃষ্টিকোণ ব্যাখ্যা করে বলেন, নারীদের জন্য মসজিদে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনাও নাই, চাহিদাও নাই। ইসলাম নারীদেরকে এ ব্যাপারে বরং নিরুৎসাহিত করেছে। তবে হ্যাঁ, তাদের জন্য মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের সুযোগ রেখেছে, মসজিদে প্রবেশ করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ না।
মাওলানা মীযানুর রহমান সাঈদ বলেন, সহিহ বুখারির হাদিস, আম্মাজান হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের কয়েক বছর পর সমাজের সামগ্রিক পরিবেশ দেখে বলেছিলেন, আমার নবি যদি এখন দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে নামাজের জন্য নারীদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন। অনুরূপ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর শাসনামলে নারীদের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁদেরকে মসজিদে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।
মীযানুর রহমান সাঈদ বলেন, এটা ছিল নবিজির ইন্তেকালের পর সমাজের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আম্মাজান আয়েশার মতামত এবং হজরত উমরের ফরমান। তবে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবৎকালের পরিবেশ দেখে বলে গেছেন, নারীদেরকে তোমরা মসজিদে আসতে বাধা দিয়ো না। তবে তাদেরকে এটা বলে দাও যে, মসজিদে এসে নামাজ আদায়ের চেয়ে তাদের জন্য ঘরের ভেতরে নামাজ আদায়ই অধিক সওয়াবের কাজ। অর্থাৎ নারীদের মসজিদে এসে নামাজ আদায়কে নবিজি নিষেধও করেন নাই, আবার পছন্দও করেন নাই। বরং নিরুৎসাহিত করেছেন।
ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করার পর মুফতী মীযানুর রহমান সাঈদ বলেন, বর্তমান জামানায় যদি নারীদের জন্য মসজিদে আলাদা ব্যবস্থা করে তাদেরকে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের জন্য আহ্বান করা হয়, তাহলে এটা হাদিস ও সুন্নাহর পরিপন্থী কাজ। তবে হ্যাঁ, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অনেক নারী বাইরে বের হন, বাইরে থাকতে থাকতেই তাঁদের নামাজের ওয়াক্ত চলে যায়, এসব নারীর কথা বিবেচনায় রেখে শহর-বন্দর বা রাস্তার পাশের মসজিদগুলোতে নারীদের জন্য নামাজের আলাদা ব্যবস্থা রাখা যায়। রাখা দরকারিও, নইলে তাদের নামাজ কাজা হয়ে যায়, এটা অনেক বড় গোনাহ।
তিনি বলেন, নামাজের আলাদা জায়গা রাখার ক্ষেত্রে তা মসজিদের ভেতরেই হতে হবে যে, এমন না। বরং মসজিদের পাশের যেকোনো অংশেই করা যায়। কারণ, তাদের জামাতে অংশগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই, আলাদাভাবে পড়ে নিলেই হবে। তবে মসজিদের ভেতরে যদি করা হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ পর্দার ব্যবস্থা রাখা আবশ্যক। এবং একই সাথে এটাও সতর্কতার সঙ্গে মসজিদের ইমামগণ আলোচনায় রাখবেন, এ ব্যবস্থা স্থানীয় নারীদের জন্য নয়, কেবলই বহিরাগত নারীদের জন্য।
