
আনসারুল হক ইমরান
আমাদের ইসলামি অঙ্গনের রাজনীতিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল হজরত আল্লামা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহমতুল্লাহ আলায়হি’র। সেই নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে, বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলন, নাস্তিক-মুরতাদ-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন পর্যন্ত একাধারে প্রায় সবকয়টি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি মিডিয়া সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন অত্যন্ত সুচারুরূপে এবং নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে। ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরী শাখা ইত্যাদি সংগঠনে দীর্ঘ সময় প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল।
চুরানব্বই সালে হজরত মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি যখন নাস্তিক-মুরতাদ প্রতিরোধ মোর্চার ব্যানারে আন্দোলনের ডাক দেন, তখন মিডিয়া সমন্বয়ের দায়িত্ব ছিল হজরত আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহমতুল্লাহ আলায়হি’র ওপর। তখন থেকেই মূলত মিডিয়ার সাথে তাঁর সম্পর্ক গাঢ় হওয়া শুরু হয়। ইনকিলাবের একজন সিনিয়র সাংবাদিক ছিলেন, সেই সময়কার আন্দোলনের সূত্রে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক হয় ওয়াসেল সাহেবের। ওয়াসেল সাহেবরা তখন একদম তরুণ। নিউজ কীভাবে করতে হয়, কী কী বিষয় থাকতে হয় সেই সাংবাদিক তাঁকে শিখিয়েছিলেন আন্তরিকতার সঙ্গে। পরবর্তীতে ওয়াসেল সাহেব নিউজ লেখায় এতই দক্ষ হয়েছিলেন যে, যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রাম বা প্রোগ্রামের নিউজ তিনি যেভাবে লিখে দিতেন, পত্রিকাওয়ালারা হুবহু সেভাবে ছেপে দিত। ইনকিলাবের কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে আমার কথা হতো এ ব্যাপারে। তাঁরা বলতেন, ওয়াসেল সাহেব যে নিউজগুলো পাঠান, সেখানে সম্পাদনার কলম ধরা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাঁর নিউজ বরাবরই সুন্দর এবং মানসম্মত থাকে।
এখন তো সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ বা সংবাদমাধ্যমে যেকোনো সংবাদ পাঠানো অনেক সহজ, আগেকার সময়ে এমনটা ছিল না। খাতাকলমে প্রথমে নিউজ লিখতে হতো, তারপরে ফেক্সে কিংবা সরাসরি পত্রিকা অফিসে গিয়ে তা দিয়ে আসতে হতো। পত্রিকার সঙ্গে পরিচয় না থাকলে, সংবাদ ছাপা হওয়াও ছিল অনিশ্চিত। আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেব এই কাজগুলো অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে আঞ্জাম দিতেন। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে পরিচিতি থাকার সুবাদে এবং নিউজগুলো মানসম্মত থাকবার কারণে তাঁর কোনো নিউজই বাদ পড়ত না। বরং গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হতো।
সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং সম্পর্কও ছিল বেশ আন্তরিক। কে আমাদের বিরুদ্ধে লিখল, কে পক্ষে, সেটা দেখতেন না, বরং সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করতেন। তাঁদের কেউ অসুস্থ হলে দেখতে যেতেন সবার আগে। বর্তমানে একাত্তর টিভিতে কাজ করেন এক সাংবাদিক, হেফাজতের সময়ে যিনি নির্যাতিত হয়েছিলেন বলে দাবি করে থাকেন, তিনি একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেব বারবার তাঁকে দেখতে গেছেন, খোঁজখবর রেখেছেন। এই যে এই সম্পর্ক, যোগাযোগ, এসব কোনো কিছুই নিজের জন্য করেননি, সেরেফ দীনের স্বার্থে করেছেন।
নব্বইয়ের দশক থেকে ২০১০/১১ পর্যন্ত ইসলামি ঘরানার জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলন-সংগ্রামের যে নিউজগুলো হতো, সবকয়টি নিউজই তাঁর হাতে লেখা। তিনি নিজে লিখে দিতেন নিউজগুলো। ২০১০/১১-এর পর আমি সংযুক্ত হয়েছি তাঁর সঙ্গে। এর পরের অনেকগুলো নিউজ হয়তো আমাদের লেখা, কিন্তু ওগুলোও তাঁর তত্ত্বাবধানে। এই সময়টায় হজরত আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি’র ইন্তেকাল তাঁকে বেশ শোকগ্রস্ত করে ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যু অবধি বোধহয় এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কারণ, আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি’র জীবদ্দশায় তিনি যেভাবে কর্মস্পৃহ ছিলেন, ইন্তেকালের পর সেই স্পৃহা অনেকখানিই ম্লান হয়ে গিয়েছিল। প্রিয় ব্যক্তিত্বের ইন্তেকালে কেমন উদাসীন থাকতেন সবসময়।
২০১০/১১ সালের পর আমরা যখন মিডিয়া সমন্বয়ের দায়িত্বে আসি, ওয়াসেল সাহেব নানাভাবে আমাদের পরামর্শ দিতেন। অনেক সময় তিনি নিজেই নিউজ লিখে দিতেন। সর্বশেষ, উনার ইন্তেকালে দিন দশেক আগে কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি সংক্রান্ত একটা প্রোগ্রাম শেষে আমি হুজুরের সঙ্গে রিকশায় করে ফিরছিলাম। হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম, প্রোগ্রামের নিউজ কোথায় বসে লেখা যায়? হুজুর বললেন, চকবাজারে তোর রুমে বসেই লিখি, চল।
কথামতো আমার রুমে এলেন। আমি নিউজ লিখে তাঁকে দেখালাম। কাজ সম্পন্ন হবার ফাঁকে ফাঁকে অনেক গল্প করলেন সেদিন। আমানিয়া হোটেলে আমাকে নিয়ে নাশতা করলেন। বিদায়ের সময় কিছু হাদিয়াও গুঁজে দিলেন হাতের মুঠোয়।
হুজুরের সেদিনের আচরণে আমি অবাক হয়েছিলাম। হুজুর সাধারণত এত কথা বলেন না। এম্নিতে সবার সঙ্গে অমায়িক ও সীমাহীন আন্তরিক ছিলেন, তবে কথাবার্তায় খুব মিতব্যয়ী ছিলেন। প্রয়োজনের বেশি কথা বলতেন না। কিন্তু হুজুরের সেদিনের কথাবার্তা এত মনখোলা ও প্রাণবন্ত ছিল যে, ব্যাপারটা আমাকে বেশ অবাক ও চমৎকৃত করল। কিন্তু আমি জানতাম না, তাঁর সঙ্গে এটাই আমার শেষ কাজ, এই জীবনে নিউজ লেখার জন্য তিনি আমাকে আর দিকনির্দেশনা দেবেন না।
এর দিন দশেক পরেই হুজুরের ইন্তেকাল হয়। আমি কল্পনাও করতে পারিনি, এভাবে ফেসবুকের নিউজফিডে হঠাৎ করেই হুজুরের মৃত্যুসংবাদ আমাকে শুনতে হবে।
ইসলামী ঐক্যজোটের রাজনীতি করে এসেছেন হুজুর জীবনভর। মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি’র ইন্তেকালের পর দলের নানা সিদ্ধান্তে তিনি একমত ছিলেন না। কিন্তু এ কারণে দলত্যাগ বা অন্য কোনো দলে যোগদানের চিন্তা তিনি কখনো করেননি। ইসলামী ঐক্যজোটকে তিনি মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি’র রেখে যাওয়া আমানত মনে করে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ অবধি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
এ দেশের ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামে মিডিয়া সমন্বয়ের দায়িত্ব তিনি যেভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গিয়েছেন, এবং তাঁর ইন্তেকালে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে এই জায়গাটায়, তা কখনোই পূরণ হবার নয়। হুজুরকে নিয়ে গত একবছরে অনেকবার আমি লিখতে বসেছি, কিন্তু লিখতে বসলে আমার কলম দিয়ে শব্দ বেরোয় না। কেমন অন্ধকার লাগে চারদিক। হুজুরকে নিয়ে অনেক স্মৃতি জমে আছে মনের মনিকোঠায়, কিন্তু লিখতে বসলে কিছুই বেরোয় না কলম দিয়ে। এ এক অসহ্য যন্ত্রণা।
আল্লাহ তাআলা হুজুরকে জান্নাতের আলা মাকাম দান করুন, মহান প্রভুর দরবারে এটাই আমাদের মিনতি।
শ্রুতলিখন : হামমাদ রাগিব
