মুর্শেদী, মারেফতি ও জারি : বাংলা ভাষায় ধর্মীয় গানের ধারা

জুনায়েদ ইশতিয়াক

এ অঞ্চলে ইসলাম হাজার বছর ধরে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। জীবন, জগত ও প্রকৃতি বিষয়ক বিবিধ মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রদানে ইসলামের বিশিষ্টতা প্রাচ্যের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে। এর ধারাবাহিকতায় ইসলামকে কেন্দ্র করে শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনসহ জীবনমুখী নানারকম কর্ম দানা বেঁধেছে। এতে ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক জটিলতার বিশেষ প্রভাবে আরব ও পারসিয়ান ধারাবাহিত হিন্দুস্তানি শিল্পের চাইতে স্বতন্ত্র ধারার সৃষ্টি হয়েছে। উপনিবেশ আমলের অশিক্ষা ও ‘ধারাবাহিক’ অপপ্রচারে বাঙালি মুসলমানের মনে অতীত নিয়ে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে তার জীবন ও জগত হারিয়েছে অতীতের ঐতিহ্য ও সিলসিলা। এর অংশ হিসেবে গান ও সংগীতের অঙ্গনেও এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক সিলসিলার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

মনে রাখা ভালো যে, বর্তমানে গান, কবিতা ও পদ্যের মধ্যে যে পার্থক্য করা হয়, সেটা খুব বেশি দিনের নয়। এখন কবিতা ‘পড়তে’ হয়, গাওয়া যায় না। মধ্যযুগে কবিতাও গাওয়া যেত। বরং প্রধানত গাওয়ার উপযোগী করেই কবিতা লেখা হতো। ফলে পদ্য, কবিতা ও গানের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। জটিল দার্শনিকতার চাইতে, তৎকালীন ইসলামি চিন্তায় সামাজিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক অধিকার ও বীরত্ম-কেন্দ্রিক তৎপরতা প্রবল ছিল, ফলে, কেন্দ্রে ছিল মানুষ। সনাতন চিন্তা ও সাহিত্যের সাথে তর্ক ও বাহাছে তাই স্বতন্ত্র শিল্পকর্মের ধারা জারি হয়। সে ধারা থেকে আরও কিছু উপধারা। উপধারাগুলোর মধ্যে বাংলা সংগীতের ধারার মধ্যে মারেফতি, মুর্শিদি, জারি ও মাইজভাণ্ডারী গান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একে সাধারণভাবে মারেফতি বা ফকিরালি গান হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, যদিও এর ভেতরে অনেক শাখা, প্রশাখা ও জটিলতা আছে।

মরমী সংগীত : ‘সেই জ্যোতি নুরে ত্রিভূবন নির্মিলা’

মারেফতি বা ফকিরালি গানের পোশাকি নাম ‘মরমী সাহিত্য’। সাধারণ তত্ত্ব অতীত গভীর তাত্ত্বিক আলোচনাকে মরমিয়া বলে। যে কবি বা কবিতা মরমিয়া দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন, তাকে বলা হয় মরমী। এই সুরময় ভুবনের দিগন্ত বিশাল হলেও দিনক্ষণ ঠিক করে এর গোড়াপত্তন হয়নি। হওয়া সম্ভব নয়। অনেকে মনে করেন মরমী গানের সুর লহরীর প্রচলন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের চর্যাগীতি থেকে। কারো মতে মুসলিম সূফী-সাধকদের ইসলামের শাশ্বত পয়গাম ও কালজয়ী বাণী নিয়ে এ দেশে আগমনকাল থেকেই ‘ছামা সঙ্গীতের’ প্রচলন হয়েছে। সেখান থেকেই এর সূচনা।

উল্লেখ্য যে, মরমী সঙ্গীত ও বাউল গানকে অধুনা যুগে যদিও এক করে দেখা হয়, কিন্তু গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল ও অন্যান্যদের কাছে এর ভাবধারায় ভিন্নতা রয়েছে বলে অভিমত পাওয়া যায়। কারণ হিসেবে বলা হয়, মরমী সঙ্গীত হচ্ছে সূফীবাদের বহিঃপ্রকাশ। যা মূলত তাওহিদ (স্রষ্টার একত্ববাদ) ও রিসালতের (পয়গাম্বরের কাহিনী) উপর ভিত্তি করে রচিত এবং বাউল মতবাদ হচ্ছে স্রষ্টাই জীব জীবই স্রষ্টা ইত্যাদি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই একে ভারতীয় বেদান্তের অদ্বৈত্যবাদ দ্বারা প্রভাম্বিত বলে ড. আশরাফ সিদ্দিকী ধারণা করেন। অবশ্য একেও সরলভাবে ব্যাখ্যার সুযোগ নেই। কেননা মুসলিম সূফীদের একাংশের মধ্যে ওহদাতুল অজুদ বা সর্বেশ্বরবাদ প্রচলিত ছিল। মুজাদ্দিদে আলফে সানির ঐতিহাসিক বাহাছেও এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বিষয় ও প্রকরণ : ‘অজুদে মজুদ আছে লীলার কারখানা’

মরমী সংগীতকে বলা হয় মর্মবাদীদের হৃদয়ের আলাপন। নিছক ভোগ বিলাস, আহার-বিহারের দুনিয়াদারীর ঊর্ধ্বে উঠে মরমী কবিরা তাদের প্রাণের কথাকে গানে গেয়ে থাকেন। তাই বলা হয়, অতিন্দ্রীয় অনুভূতির মর্মমূল থেকে উৎসারিত বাণী ও সুরই মরমী সংগীত। আরো বলা হয়ে থাকে, সঙ্গীত ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির আত্মার পরিচয়ের নিশান বহন করে। সঙ্গীত মানুষের আত্মার গভীরের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত, মুর্শিদী-মারফতি, জারি-সারি, পাঁচালী, পদাবলী, গজল, ভক্তিগীতি, ভজন-কীর্তন, কাওয়ালী প্রভৃতি সঙ্গীতের এক বিশাল ভান্ডারে সমৃদ্ধ আমাদের সুরময় ভুবন। উল্লেখ্য, সংগীত হৃদয়ের ছন্দে ছন্দিত না হলে তা অন্য হৃদয়ে আসর বা প্রভাব রাখতে পারে না। আল্লামা ইকবাল বলেছেন–দীল ছে যো বাত নিকাল্তি হ্যায় আছর রাখতি হ্যায়।

সাধক-ফকিরদের চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফলে মানুষকে শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে তুলতে রচিত হয় পুঁথি পুস্তক, রাগ ও মরমী সংগীত। যার প্রধান বিষয়বস্তু নামায, রোজা, হজ, যাকাত, ইসলামি ইতিহাস, ঐতিহ্য, কাহিনী ইত্যাদি। যার থেকে ধীরে ধীরে পীর আউলিয়ার নির্জন সাধনাগারে আধ্যাত্মিক ওয়াজ নসিহতসহ হৃদয় হতে উচ্চারণ হয় ছন্দের। পরে এটিই মুর্শিদি বা ফকিরালি গান বা মরমী সংগীত নামে খ্যাত হয়। এর সাথে সংযুক্ত হয় এই অঞ্চলের নদীপ্রাধান্য, গ্রামীণ প্রকৃতির ঐশ্বর্য ও আশেকি-বিরহের নানা অনুষঙ্গ। কালে সনাতন ও বাউল ধারার প্রভাবও এর মধ্যে পড়ে। এ নিয়ে শরিয়তি, মারেফতি ও সর্বধর্মবাদের বাহাছও বহুল চর্চিত হয়েছিল।

যেমন বিখ্যাত কবিয়াল জালাল উদ্দীন খাঁ ‘ধরাট’ বা প্রশ্ন রেখেছিলেন ‘আল্লা বলতে কেউ নাই এ সংসারে /মিশে গেছে আলো হাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তালাশ কর কারে?’ জালালের প্রতিপক্ষ বাউল ইদ্রিস এই ধরাটের উত্তর দিয়েছিলেন নেত্রকোণার আরেক প্রখ্যাত বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের একটি গানের সাহায্য নিয়ে- ‘জালাল তুমি ভাবের দেশে চল, আল্লাকে দেখবে যদি চর্মচক্ষের পর্দা খোল/গিয়া তুমি ভাবনগরে চেয়ে থাকো রূপ নেহারে, সজল নয়নে ফটোগ্রাফ তোল/মনরঙে প্রেমতরঙ্গে তোমার দিলের কপাট খোল/দেখবে তোমার মাবুদ আল্লা সামনে করে ঝলমল।’

মুর্শিদি : ‘সকলি ছাড়িয়া দয়াল ধইরাছি চরণ তোমার’

‘মুর্শিদ’ শব্দটি আরবি; এর শব্দমূল ‘এরশাদ’, অর্থ আদেশ-উপদেশ দেওয়া। যিনি মুরিদ বা ভক্তকে আদেশ-উপদেশ দেন এবং জিকিরাদি দ্বারা অধ্যাত্মপথে পরিচালিত করেন, তিনিই মুর্শিদ। এক কথায়, মুর্শিদ হচ্ছেন আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা বা পথপ্রদর্শক। মানুষের আত্মিক ও ধর্মীয় সংশোধনে মুর্শিদের ভূমিকার বিশেষ গুরুত্ত আছে ইসলামি সভ্যতায়। এই আঞ্চলে আরবি ভাষা ব্যাপকভাবে প্রচারিত না হওয়ায় আরবি কিতাবাতি সাধারণদের স্তরে চর্চিত হয়নি। মাদরাসা ও ইলমি হালাকা ব্যাপক প্রসার লাভ করেনি। ফলে পীর-মুর্শিদ ভিত্তিক ওয়াজ-নসিহত-বাহাছ-মুনাজারায় ইসলাম চর্চিত হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় মুর্শিদি ধারার সংগীত রচিত হয়েছে।

মুর্শিদি গানের সুর মূলত করুণ ও কান্নাভরা। ভক্ত-হূদয়ের অক্ষমতা, অজ্ঞানতা ও অপ্রাপ্তির বেদনা থেকে এই কান্না উত্থিত হয়। বিচ্ছেদ, মারফতি, ধুয়া, এমনকি বাউল গানেও মুর্শিদের প্রশংসা এবং আশ্রয় ও করুণা প্রার্থনার কথা আছে। বাণী, সুর ও গায়নরীতির তুলনামূলক বিচার দ্বারা মুর্শিদি গানকে আলাদাভাবে চেনা যায়। মুর্শিদি গান সাধারণত বিলম্বিত লয়ে গাওয়া হয়, কিন্তু তার সঙ্গে দ্রুতলয়ের সুর মিশ্রিত হলে এক মনোরম সুর তৈরি হয়। মুর্শিদকে বন্ধু ও মাশুক হিসেবেও চিত্রায়িত করা হয়।

মরমী কবি শাহনুর প্রেম বিরহে লিখেন–

বন্ধু তর লাইগা-রে আমার তনু জর জর
মনে লয় ছাড়িয়া যাইতাম, থইয়া বাড়ি ঘর
অরণ্য জঙ্গলার মাঝে আমার ভাঙ্গা ঘর
ভাইও নাই বান্ধবও নাই কে লইবে খবর

মুর্শিদি গানে মুর্শিদ কিংবা পীরকে আখেরাতের ওসিলা হিসেবে গ্রহণ করার একটা প্রবণতা আছে। গানে গানে এমন একটা বার্তা পৌঁছানো হয় যে, বোঝা যায়, মুর্শিদই তাকে আখেরাতের সমস্ত হিসেব-নিকাশে সহযোগিতা করবেন এবং তাকে সেখানে সকল মুসিবত থেকে উদ্ধার করবেন। ব্যাপারটা ইসলাম সিদ্ধ না। কিন্তু যেহেতু সেকালে এই অঞ্চলে ইসলামের পরিশুদ্ধ শিক্ষা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে পারেনি, তাই গান ও কবিতার মধ্যে এসব গলদ ধারণার অন্তর্ভুক্তি ঘটেছিল।

জারি

জারি গান পয়ার ছন্দে রচিত আখ্যানমূলক গাথা বা পাঁচালি। ‘জারি’ ফারসি শব্দ, অর্থ ক্রন্দন, বিলাপ বা প্রচার করা। এর উদ্ভব কারবালার হূদয়বিদারক বিয়োগান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সেই ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করার জন্য মুহররম মাসের প্রথম দশদিন হযরত ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারবর্গের সদস্যদের স্মরণে মর্সিয়া এবং জারি গান গীত হয়ে থাকে। পরে অবশ্য এ বিষয়টি ছাড়াও জারি গানের আঙ্গিক ও সুরে অন্য অনেক বিষয় স্থান পেয়েছে।

ফলে অঞ্চল-বিশেষে এ গানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও কোনো কোনো অঞ্চলে এর বিষয়বৈচিত্র্য রয়েছে। মক্কার জন্মকথা, জহরনামা, সাদ্দাদের জারি, শাহজালালের জারি, সোহরাব-রোস্তমের জারি ইত্যাদির পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ব্যঙ্গরসাত্মক বিষয়, পরিবার-পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ক জারি গান সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ছোট ছোট আকারে বিশেষ সুরে যে গান গাওয়া হয় তাকে বলে মর্সিয়া, আর বয়াতি আলাদা সুরে বিস্তৃতভাবে যে গান পরিবেশন করে তাকে বলে জারি গান। এছাড়া ধুয়ার সুরে যখন ঘটনা প্রকাশ করা হয় তখন তাকে বলে ধুয়া গান। মুহররম উপলক্ষে এ তিনটি ধারায়ই গীত পরিবেশিত হয়।

জারি গানের উদ্ভবকাল অনুমাননির্ভর। কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত বাংলা কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায় সতেরো শতকে। কবি মুহম্মদ খান ১৬৪৫ সালে মকতুল হোসেন শীর্ষক কারবালা-কেন্দ্রিক একখানি শোকগাথা রচনা করেন। এটিকেই জারি গানের আদি নিদর্শন হিসেবে মনে করা হয়। মুগল আমলে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পারস্য থেকে বহু শিয়া মুসলমান এদেশে এসেছিলেন, যাঁদের অনেকেই এখানে রাজদরবারে উচ্চপদে আসীন ছিলেন। তাঁদেরই উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতি হিজরি সনের প্রথম মাস মুহররমের প্রথম দশ দিন কারাবালার করুণ ঘটনাকে স্মরণ করে আনুষ্ঠানিক পর্ব পালনের সূচনা হয়।

বাংলাদেশে জারি গানের যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লক্ষ করা যায় তাঁর মূলে রয়েছে কারবালা প্রান্তরে রসুল-দৌহিত্র ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারবর্গের করুণ পরিণতি, যা সকল শ্রেণীর মানুষের আবেগকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। এ উপলক্ষে এক সময় শুধু মর্সিয়া গীত হতো, পরবর্তীকালে জারি গানও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ‘মাতম জারি’ বলতে যে জারি গানের কথা জানা যায় তা মুহররম উপলক্ষেই গীত হয়। এছাড়া পালার আঙ্গিকেও জারি গান হয়। এসব গান এত ব্যাপকতা পায় যে, এক সময় হিন্দুদের দুর্গাপূজা উপলক্ষেও জারি গান পরিবেশিত হতো বলে জানা যায়।

শরিয়ত-মারেফত

বাংলাভাষায় মরমী যে সংগীতগুলো চর্চিত হয়েছে, তার সবই যে মারেফতি ধারার, সেটা বলা বেশ মুশকিল। কারণ এর উল্লেখযোগ্য অংশ মারেফতি থাকলেও এতে শরিয়তি ধারার গান এবং পদ্য ছিল। অতীতে মাসআলা মাসায়েল এবং ওয়াজ-নসিহতের সংকলন সাধারণত পদ্য আকারেই হতো। ফলে এদিক থেকে দেখতে গেলে দেখা যাবে, শরিয়ত-মারেফাত–উভয়ধারার গান ও পদ্য এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, যে, শরিয়ত ও মারেফাতের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ, তা ইসলামি ইতিহাসের একটা মৌলিক বিরোধ। ইসলামি ইতিহাসে এই দুই পক্ষ উলামায়ে জাহের ও উলামায়ে বাতেন বলে পরিচিত। শরিয়ত নিয়ে যে সমস্ত উলামায়ে কেরাম কাজ করেছেন, তাদেরকে উলামায়ে জাহের আর মারেফত নিয়ে যারা ছিলেন তাদের উলামায়ে বাতেন বলে অভিহিত করা হয়। এই দুই পক্ষের মধ্যে নানা তর্ক ও বিরোধ আছে। উলামায়ে জাহের মনে করেন, মারেফত নিয়ে যারা কাজ করছেন, তারা শরিয়তের জাহিরে আমল ও হুকুম আহকাম থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। আর উলামায়ে বাতেন দাবি করেন, বাতেনি আমলগুলোই হচ্ছে সবকিছুর মূল। উলামায়ে জাহেররা এই মূল জিনিস থেকে মনোযোগ সরানোর কারণে সত্য থেকে অনেক দূরে রয়েছেন।

এই উভয় ধারাই ইসলামের ইতিহাসে, এমনকি বাংলাদেশের মুসলিম সংস্কৃতির ইতিহাসেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে এমন অনেক কবিয়াল ও শিল্পী ছিলেন, যারা উভয় ধারাকে একটা সামঞ্জ্যস্যতার ভেতর দিয়ে গুরুত্ব দিতেন। হয়তো কোনো সময় জাহেরের দিকে আবার কোনো সময় বাতেনের দিকে জোর দেওয়া হতো। কিন্তু এই কবিয়াল ও শিল্পীদের একটা বড় অংশ কিন্তু সহিহ ও বিশুদ্ধ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট ও এর অনুসারী ছিলেন। তবে এর মধ্যে নানা ধরনের ভুল-ত্রুটিও অবশ্য ছিল। এবং মারেফতি ধারা বলতে যেটা প্রচলিত, সেটা পরবর্তীতে বাউল ধারার সঙ্গে সংমিশ্রণের কারণে নানা ধরণের ভ্রান্তির মধ্যে পতিত হয়েছিল।

মরমী সংগীত কেন এখনও প্রাসঙ্গিক

মরমী সংগীতগুলো একটা দীর্ঘ সময় ধরে চর্চিত হয়েছে এবং বিষয় ও কন্টেন্টে অনেক বৈচিত্র আছে। আমাদের বর্তমান কালে ইসলামি ভাবধারার সংগীতের যে চর্চাটা আছে সেটা আসলে আধুনিক অথবা বিদেশি সংগীতকে কেন্দ্র করে এবং অনুকরণ করে তৈরি হয়েছে। ফলে এর মধ্যে এই অঞ্চলের সিলসিলা বা বৈশিষ্ট্য গ্রহণের প্রবণতা কম। ফলে সাধারণ ঘরানার মানুষ যদিও এখন ইসলামি ভাবধারার সংগীত ব্যাপকভাবে শুনছেন, কিন্তু এর সাথে যদি ঐতিহ্যবাহী মরমী সংগীতগুলোর সংযোগ ঘটানো যেত, তাহলে দেখা যেত সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামি ভাবধারার সংগীতের জনপ্রিয়তা আরও ব্যাপক হতো, এবং এ জনপ্রিয়তা স্থায়ীও থাকত। পাশাপাশি বোদ্ধা মহলেও আলাদা গ্রহণযোগ্যতা পেত। কারণ, তখন এটা হতো এ অঞ্চলের মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা, ভাব, লয় ইত্যাদির কাছাকাছি। মানুষ যেটাকে সহজে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, ঐতিহ্যবাহী যে সংগীতগুলো আছে, সেগুলো সবই যে ইসলামসম্মত, তা ভাবার দরকার নাই। ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো ধারা বা বৈশিষ্ট্য যদি এর কোনো গানে থাকে, সেটা অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। মূল কথা হচ্ছে, মরমী ধারাটা যতটুকু ইসলামের সাথে যায়, ততটুকু যদি আমরা গ্রহণ করে বর্তমানকার ইসলামি ভাবধারার সংগীতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করতে পারি, তাহলে ইসলামি সংগীতের নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচিত হবার আশা করা যায়। তবে মরমী ধারাকে হুবহু কপি করতে হবে, ব্যাপারটা এমনও না। এ থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ, নানা বৈশিষ্ট্য সংযোজন–ইত্যাদিভাবে উপকৃত হওয়া যেতে পারে। আর এ জন্যই এ সংগীতগুলো এখনও প্রাসঙ্গিক।

আগের সংবাদগীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আহমদ আবদুল্লাহ’র মুখোমুখি
পরবর্তি সংবাদচট্টগ্রামের ‘বড় কারী’ আল্লামা আবদুল গনী’র ইন্তেকাল, বাদ আসর জানাজা