মুশায়েরা : উপমহাদেশে মুসলমানি সাহিত্যের আলোকোজ্জ্বল ধারা

কাজী মাহবুবুর রহমান

মুশায়েরা উর্দু কবিতা (শের-শায়েরি) পাঠের আসর। উর্দু কবিতার উন্নয়ন, বিকাশ ও প্রসারে উর্দুসাহিত্যের ঐতিহ্যবাহী এ আসরের ভূমিকা অপরিসীম। উপমহাদেশে কখন থেকে মুশায়েরার প্রচলন শুরু হয় তা সঠিক করে বলা কঠিন। কবি আমীর খসরু (১২৫৩-১৩২৫) প্রথম উর্দু কবিতার প্রচলন করেন। সে সময় এই মুশায়েরার মাধ্যমে জনসাধারণ কাব্যচর্চার সংস্পর্শে আসার সুযোগ লাভ করে। মুশায়েরার মাহফিল তখন ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। কয়েকজন বিচারক থাকতেন। শের-শায়েরি-পাঠকের সামনে দীপাধারে করে মোমের প্রদীপ রাখা হতো। এ প্রদীপ সভাপতি বা আমিরে মুশায়েরার সামনেও রাখা হতো।

আল্লামা শিবলি নুমানির দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ষোল শতকের পূর্বেই ভারতে ফারসি সাহিত্যচর্চার অঙ্গনে মুশায়েরার প্রচলন ছিল। কবিরা তখন মুশায়েরার কবিতা রচনাপ্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন এবং তাঁদের কাব্যচর্চার মাধ্যমে কবিতার উৎকর্ষ সাধিত হতো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন দিল্লির কবি ও লেখকেরা উর্দু ভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন তখন রাজধানী দিল্লীতে মুশায়েরার ব্যাপক প্রচলন হয়। মুঘল আমলে মুশায়েরা শিল্প এক নতুন মাত্রা পায়। রাজকীয় আয়োজনেই নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতে থাকে মুশায়েরা-মজলিস।

বাংলাদেশেও বিভিন্ন পরিসরে মুশায়েরার আয়োজন হয়ে এসেছে। যার কদাচিৎ বর্তমানেও হচ্ছে। বাংলাদেশের আহসান মঞ্জিলের নবাব পরিবার মুশায়েরার জন্য খ্যাত। নবাব আহসান উল্লাহ কাব্যপ্রেমিক মানুষ ছিলেন৷ এবং তিনি নিজে উর্দু ও ফারসি কবিতা রচনা করতেন। মুশায়েরার আয়োজনও করতেন। নবাব আবদুল গনি ছিলেন সংগীতপ্রেমী মানুষ। তাঁর দরবারে গজল ও নাতের আসর বসত। নবাব গনি মহররম মাসে শহিদে কারবালার স্মরণে মর্সিয়া, সালাম, কাসিদা, নাত, নওহা ইত্যাদি পাঠের জন্য কবিদের উৎসাহিত করতেন। এছাড়াও বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে আহসান মঞ্জিলে জাঁকজমকের সঙ্গে মুশায়েরা অনুষ্ঠিত হতো।

আশরাফউজ্জামান তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, তা এ রকম : ‘ঢাকার রইস সম্প্রদায়ের ভাষাও ছিল উর্দু। কাজেই উর্দু ভাষা নিয়ে ঈদের দিনে কবিতার আসর জমে উঠত আহসান মঞ্জিলে। কবিরা এক এক লাইন করে কবিতা আওড়াতেন। আর মুশায়েরার মজলিস বাহ বাহ, মারহাবা, মাশাআল্লাহ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত। বেগম সাহেবারা অন্দরমহল থেকে আসরে পাঠাতেন জাফরানি শরবত আর ইরাকি খেজুর। দুধযোগে কাশ্মীরি চা-ও আসত সঙ্গে।’ নবাব খাজা আহসান উল্লাহ শাহীনের একটি শায়েরির কয়েকটি পঙ্ক্তি ছিল এমন : ‘দেল খোশহো কে ফাসলে গুল, গুলিস্তাঁমে ফের আয়ি হায়/ নাওয়েদে আয়েশ ও ইসরাত ফের সাবা গুলশান মে লায়ি হায়।/ খিলে হায় ফুল বো কালমুমে নহরে হার তরপ জারি/ মায় ইস রাতপে লা সাকি, ঘটাভি শার পেছায়ি হায়।

সৈয়দ মোহাম্মদ বাকের, তাবতা বাই ও আগা জান-ই-রানি ফারসি ভাষার উঁচু স্তরের কবি ছিলেন। প্রতি মাসে তাঁদের বাসভবনে ফারসি মুশায়েরার আসর বসত। কয়েকটি ঢাকাইয়া পরিবারেও নিয়মিত মুশায়েরার আসর বসত। হাকিম হাবিবুর রহমানের বাসভবনে প্রতি মাসে একবার মুশায়েরার আসর বসত। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে মুশায়েরার আয়োজন করা হতো।

মুশায়েরার পঠিত শেরশায়েরির মধ্য থেকে বাছাই করা শের ‘গুলদাস্তা’ নামের কাব্য পত্রিকায় প্রকাশ করে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হতো। কবি কাজী নজরুল ইসলাম কোনো এক মাঘী পূর্ণিমায় হাকিম সাহেবের বাড়ির ছাদে এক মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। কাজী নজরুলের গজল ও ইসলামি গান শোনার জন্য শহরের গণ্যমান্য ও সংগীতজ্ঞ বহু লোক এ সভায় এসেছিলেন। হাকিম সাহেবের মুশায়েরায় নবাববাড়ির কবিরাও অংশ নিতেন।

ঢাকার বকশিবাজারের হজরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকির বাসভবনে নিয়মিত মুশায়েরার আসর বসত। এখানে ড. আন্দালিব শাদানিসহ উপমহাদেশের অনেক কবি-মুশায়ের অংশগ্রহণ করতেন। পাকিস্তান আমলে ঢাকার নিমতলীর রেডিও পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার) থেকে প্রচারিত মুশায়েরা-অনুষ্ঠানে সমাজের বিশিষ্ট কবি ও সহিত্যিকরা উপস্থিত থাকতেন।

‘গুলিস্তান-এ শরফ’ গ্রন্থের লেখক সৈয়দ শরফউদ্দীন শরফ আল হুসাইনী তাঁর বেগমবাজারের বাসভবনে মুশায়েরার আসর জমাতেন। উর্দু কবি নওশাদপুরি তাঁর বাসভবনে মুশায়েরার আয়োজন করতেন। এখানে উর্দু ভাষাভাষী লোকজন ছাড়াও বাঙালি কবি-সাহিত্যিকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতেন। সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার, উর্দু সাহিত্যপ্রেমিক মরহুম আলহাজ মোহাম্মদ সাখী মিয়াও প্রায়ই মুশায়েরার আয়োজন করতেন।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে উর্দু বিভাগ ২০১৭ সনে একটি আন্তঃদেশীয় উর্দু সম্মিলন হয়েছিল। সেখানে ভারত থেকে চারজন উর্দু লেখক-গবেষক এসেছিলেন। আর বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে যারা উর্দু সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত তাদের একটি অংশ এতে যোগ দিয়েছিলেন। এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক আয়োজনগুলোর ভেতর একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে পরিণত হয়েছে উর্দু মুশায়েরা।

বাংলাদেশে উর্দু মুশায়েরার একটি কালজয়ী অধ্যায় চিরকাল রয়ে গেছে মিডিয়ার আড়ালেই। প্রতিবছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে জমকালো মুশায়েরার আয়োজন হতো। দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মাদরাসার কিতাব বিভাগের ছাত্ররা এতে অংশগ্রহণ করতেন। এটাকে শের-মুবাহাসা বা কবিতা-বিতর্কও বলা হতো। এক গ্রুপের উপস্থাপিত শেরের শেষ হরফ দিয়ে অপরপক্ষকে তাঁদের শের উপস্থাপন করতে হতো।

সান্ধ্যকালীন এই মুশায়েরা চলত গভীর রাত পর্যন্ত। সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ইত্যাদি অঞ্চলগুলোতে এ ধরনের মুশায়েরার জনপ্রিয়তা ছিল বেশি। ক্রমে ক্রমে মাদরাসাগুলিতে উর্দু-ফার্সির আবেদন কমতে থাকার সঙ্গে জনপ্রিয়তা হারায় মুশায়েরার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। এখনো কোনো কোনো মাদরাসায় ম্রিয়মান আলো নিয়ে জ্বলছে মুশায়েরা। তবে সহসাই তা বিলুপ্তির পথে৷

আজ (৫ মার্চ) মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় মুশায়েরা-অনুষ্ঠান। উর্দুবিভাগের আয়োজনে এই মুশায়েরা বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত রাজধানীর আর.সি মজুমদার আর্টস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।

উর্দু বিভাগের চেয়ারম্যান ডক্টর রশিদ আহমদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মুশায়েরায় কবিগণ বাংলা, উর্দু ও অন্যান্য ভাষায় তাদের কবিতা/ শায়েরী উপস্থাপন করবেন। মুশায়েরায় প্রধান অতিথি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া মুশায়েরায় বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

অনুষ্ঠানে কবি আসাদ চৌধুরী, রুহুল আমীন সিরাজী ও উর্দু কবিদের মধ্যে ঢাকার আহমদ ইলিয়াস, শামীম জামানবী প্রমুখ ছাড়াও চট্রগ্রাম, খুলনা ও সৈয়দপুরের খ্যাতনামা উর্দু কবিগণ তাদের কবিতা উপস্থাপন করবেন। একইভাবে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উপজাতিদের ভাষায় কবিতাও উপস্থাপন করা হবে।

উপমহাদেশে মুসলমানি সাহিত্যের আলোকোজ্জ্বল এই ধারাটিকে টিকিয়ে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে।

আগের সংবাদ‘বালোকোটে কেউ নিহত হয়নি’, অবশেষে স্বীকার করল ভারত
পরবর্তি সংবাদকলমের এক খোঁচায় চাকরি হারালেন একঝাঁক সংবাদকর্মী, হুমকির মুখে সাংবাদিকতা পেশার ভবিষ্যত