
রাগিব রব্বানি
রাশেদ খান মেনন। আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দলের নেতা। সরকারের গত টার্মে মন্ত্রিত্ব পেলেও নতুন টার্মে এ ‘সৌভাগ্য’ থেকে বঞ্চিত হবার কারণে ক্ষোভের অন্ত নেই তাঁর। সচেতন মহলের ধারণা, তিনি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর তো আর সরাসরি এই ক্ষোভ ঝাড়তে পারেন না, ‘রুটিতে পিঁপড়ে’ উঠে যাবার একটা ব্যাপার আছে, তাই কওমি শিক্ষাসনদের স্বীকৃতি এবং ওলামায়ে কেরামের কিছু দাবি-দাওয়ার ওপর সরকারের নমনীয় ভাবকে উপলক্ষ করে সম্প্রতি সংসদে সেই ক্ষোভ ঝেড়েছেন এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী আলেমশ্রেণির ওপর।
তাঁর ক্ষোভের এই বহিঃপ্রকাশ থেকেই বোঝা যায় সরকারের চলতি টার্মে তাঁর গুরুত্বহীনতার জন্য কতটা মনোপীড়ায় ভুগছেন তিনি। কিন্তু মনোপীড়ায় ভুগলে যে কেউ এত নীচু ও হীনভাষায় বিষোদগার করতে পারে, বিজ্ঞজনেরা মনে করছেন, রাশেদ খান মেননের এই বক্তব্য না শুনলে বোধহয় কেউ জানতে পারত না।
এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সর্বজনমান্য বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব আল্লামা শাহ আহমদ শফীর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, ‘তেঁতুল হুজুরে’র আবদারের পরিপ্রেক্ষিতে নাকি জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরিবতর্ন কতটা আনা হয়েছে, দাবি অনুযায়ী পুরোটা আনা হয়েছে কি না, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ থাকলেও, যতটুকু পরিবর্তন এসেছে তাতেই ক্ষুব্ধ গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় মানুষের চেতনা-বিরোধী এই রাজনীতিক।
প্রধানমন্ত্রী কিংবা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তাঁর ওপর যদি আবার ‘নাখোশ’ হয়ে যান, এই চিন্তা থেকেই হয়তো কওমি শিক্ষাসনদের স্বীকৃতিকে তিনি ‘সাধুবাদ’ জানিয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে এই শিক্ষাধারা ও শিক্ষাধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরকে নিতান্ত ‘অভদ্র’ ভাষায় কটাক্ষ করে একদিকে যেমন নিজের নীচু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, অন্যদিকে কওমি স্বীকৃতি নিয়ে বিপরীতমুখী বক্তব্যের অবতারণা করেছেন।
মেনন দাবি করেছেন, হেফাজতে ইসলামের ওপর সরকারের নমনীয় মনোভাবের কারণে তাঁরা নাকি দেশজুড়ে ‘মোল্লাতন্ত্র’ ছড়িয়ে দিচ্ছেন। বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেই তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। কারণ, হাজার বছর ধরে এ দেশের মাটি ও মানুষের যাপিত জীবনে মেননের কথিত ‘মোল্লাতন্ত্র’ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বরিত হয়ে আসছে, নতুন করে এই ‘তন্ত্র’ ছড়িয়ে দেওয়ার কিছু নেই।
মেনন আরও দাবি করেছেন, হেফাজতের ‘মোল্লাতন্ত্রী’রা নাকি ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করছেন সমাজে। উদাহরণ হিসেবে তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ ও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের কথা বলেছেন। কিন্তু কবে কোথায় হেফাজতে ইসলাম বা এ দেশের ইসলামি নেতৃত্ব এরকম আক্রমণ করেছে তা উল্লেখ করেননি। সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন, হেফাজত বা উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন বক্তব্য বিবৃতি ও সেমিনারে সংখ্যালঘু এবং অমুসলিমদের অধিকারের ব্যাপারে কতটা জোরালো ও সচেতনতামূলক বক্তব্য রাখেন। মেনন এমন একটি ঘটনাও দেখাতে পারবেন না, যেখানে হেফাজত বা ইসলামি নেতৃত্বের কেউ কোনো সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ করেছে।
এ দেশের কাদিয়ানি সম্প্রদায় ইসলাম ধর্মের মহান ও সর্বশেষ নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে শেষনবি না মেনে মানুষের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, এর প্রতিবাদ ও তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণার দাবির বিপক্ষে গিয়েও বিষোদগার করেছেন মেনন। খতমে নবুওতের ব্যানারে ওলামায়ে কেরামের এই যৌক্তিক দাবিকে ‘পাকিস্তানি কায়দা’র দাবি বলে কটাক্ষ করেছেন। অথচ দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সমস্ত আলেমের ঐক্যমত্য দাবি, এই সম্প্রদায় নিজেদের মুসলিম ঘোষণা করে জনসমাজে যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তা বন্ধ করতে তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হোক। অমুসলিম ও সংখ্যালঘু হিসেবে ইসলামের নাম ও পরিভাষা সমূহ পরিত্যাগ করে তারা তাদের ধর্ম প্রচার করতে আলেমদের কোনো আপত্তি নেই।
ইসলাম ও আলেম সমাজের বিরুদ্ধে মেননের এই বিষোদগারকে নিতান্ত কুৎসিত, অমার্জিত এবং রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির ক্ষুণ্নতা বলে অভিহিত করেছেন সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরাম। তাঁর এই বক্তব্য প্রচারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিজ্ঞ মহল মনে করছেন, সংসদের মতো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানীয় স্থানে বসে মেননের এই বিষোদগার বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এজন্য তাঁর যথোপযুক্ত শাস্তির দাবিও তুলছেন ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী।
