যুগে যুগে আযহার যেভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার মোকাবেলা করেছে

মুজাহিদুল ইসলাম

‘মাননীয় ইমাম, আপনি তো আমাকে ক্লান্ত করে ফেলেছেন।’

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ৬৫তম মিশরীয় পুলিশ-দিবসে প্রেসিডেন্ট সিসি এভাবেই শায়খুল আযহারের প্রতি কথা ছুড়ে দেন। ধারণা করা হয়, ‘তালাকের ক্ষেত্রে মৌখিক নয়, শুধু লিখিত বক্তব্যই বিবেচ্য হওয়া উচিত’–সিসির এমন দাবির ব্যাপারে শায়খুল আযহারের অসম্মতি সিসিকে এ কথা বলতে বাধ্য করেছে। পাশাপাশি শায়খুল আযহার হয়তো সিসির বিভিন্ন ফরমায়েশ পুরণে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন, যা সিসির নিকট বেশ ক্লান্তিকর লেগেছে।

শায়খুল আযহার ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে এমন প্রকাশ্য বিরোধ এবারই প্রথম নয়। সিসি দীর্ঘ সময় হতে ইসলামি আদর্শ ও ইসলামের সার্বজনীনতায় বিশ্বাসী মুসলিমদের ওপর আক্রমণ হানার জন্য বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে ব্যবহার করে আসছেন। পাশাপাশি ‘বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ভাবমূর্তি ক্ষুর্ণ হচ্ছে’–এমন অজুহাতে সুন্নাহর প্রাচীন ব্যখ্যার পরিবর্তে শুধু কুরআনি ভাষ্যকে যথেষ্ট মনে করার ব্যাপারে সিসিপন্থী গণমাধ্যম প্রচারণা চালাতে থাকে। কিন্তু শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আযহারের দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আযহার ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপকে রেড লাইন হিসেবে গণ্য করে আসছে।

এমনই সময়ে শায়খুল আযহার মিলাদুন্নবির অনুষ্ঠানে মুসলিমদের আহ্বান জানান, ‘তারা যেন তাদের নবির সুন্নতে গৌরববোধ করে এবং প্রাচ্যবিদ ও হাল-আমলে তাদের লেজুড়দের উদ্ভট দাবী মোকাবেলায় এগিয়ে আসে।’ পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, এটা মূলত সিসি ও শায়খুল আযহারের দ্বন্দ্বের প্রকাশ্য উপস্থপনা।

আযহার ও মিশর-প্রশাসনের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। আযহার-প্রতিষ্ঠার পর হতে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। আযহার সবসময় তার স্বাধীন ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে আসছে; কখনো খোদ আযহার প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার আদায়ে বজ্রমুষ্ঠি ধারণ করেছে। কখনো বিবাদমান গ্রুপের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রেখেছে

আযহারের প্রতিষ্ঠা

৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মিশর, উত্তর আফ্রিকা ও পুরা আরব অঞ্চলে শিয়া ইসমাইলি মতাদর্শ প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে কায়রোতে একটি জামে মসজিদ তৈরি করা হয়। বাগদাদের সুন্নি শাসক আব্বাসিদের মোকাবেলাও এ আযহার-প্রতিষ্ঠার বিশেষ লক্ষ্য ছিল। কিন্তু একটু একটু করে মিশরের আহলুস সুন্নাহ জামাতের আলেমগণ এই জামে মসজিদে নিজেদের ভূমিকা বৃদ্ধি করতে থাকেন। আযহারে তাঁদের বিভিন্ন ইলমি হালকা এবং ছাত্র-শিক্ষক বাড়তে থাকে। একসময় আযহার শিয়া-সুন্নি সকলের জামিয়া হয়ে ওঠে। তবে সবকিছুই শিয়া ফাতেমি সালতানাতের পূর্ণ নজরদারি ও তদারকির ভেতর দিয়ে চলছিল। সালাহউদ্দিন আইয়ুবি যখন মিশরের ফাতেমি সালতানাতকে চ্যালেঞ্জ করে সেখানে আসেন, মিশরকে নতুন করে সুন্নি ইসলামে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সবচে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় এই আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি তাঁর মিশনে সফল হন; আল-আযহার বন্ধ করার নির্দেশ দেন। আল-আযহার একাধারে একশত বছর বন্ধ থাকে। বিপরীতে আইয়ুবি ও মামলুকরা দেশে অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসা তৈরি করতে থাকেন। এ সংস্কারের ফলে আযহার অন্য দু’টি প্রতিষ্ঠানের থেকে বিশেষ কোন বৈশিষ্টমণ্ডিত আর থাকে না। তৈরি হয় সালাহউদ্দিন আইয়ুবির প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায়ে সালাহিয়্যাহ, সুলতান কামিলের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায়ে কামালিয়্যাহ ও সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুবির প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় নাজমিয়্যাহ সালাহিয়্যাহসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।

উসমানীয়রা যখন মিশরে প্রবেশ করে, তাদের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। অবশেষে যখন ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে মিশর সুলতান প্রথম সুলাইমানের অধীন হয়, উসমানীয়রা কায়রোর অনেক গ্রন্থাগার ও মামলুক-নিয়ন্ত্রিত মাদরাসা হতে প্রচুর বইপত্র নিয়ে যায়। ফলে এ সকল মাদরাসা এক ধরনের পশ্চাদপদতার শিকার হয়। কায়রোর বুকে আযহারের সোনালি ইতিহাসের কারণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান হতে জ্ঞানী-গুণী আযহারে যুক্ত হতে থাকেন। ধীরে ধীরে আবারও আযহার মিশরীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মিশরীয় সমাজের সংকট-সমাধানের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়।

আযহার ও সংশ্লিষ্টদের মর্যাদার কারণে আযহারের আলেমদের নাম সবসময় ‘আমাদের নেতা’ এবং শিক্ষার্থীদের নামের সাথে ‘নেতা’ শব্দ যুক্ত করেই সম্বোধন করা হতো। সরকারি ফরমানসহ সকল জায়গায় এভাবেই লেখা হতো। ১৫৬৬ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের প্রধান বিচারপতির এক রায়ে দেখা যায়, ‘মিশরের সুধীজন দুই প্রকার; আলেম-ওলামা ও আমির-উমারা।

আযহারের বিশেষ মূল্যায়ন

উসমানীয়রা সাধারণত তাদের কোনো একজন গভর্নর দ্বারা মিশর শাসন করতেন। মিশরের মামলুকরা তখন কাসেমি ও ফাক্কারি–দুই গ্রুপে বিভক্ত। তাদের মধ্যে প্রায়শই মতানৈক্য, এমনকি বিশৃঙ্খলা পর্যন্ত দেখা দেয়। ফলে উসমানীয়দের সেখানে শক্তি প্রয়োগ করতে হতো। ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে ফাক্কারি মামলুকরা অটোমানদের হস্তক্ষেপের আশংকায় শায়খুল আযহারের শরণাপন্ন হন। আযহারের শায়েখরা উসমানীয় গভর্নর ইব্রাহিম পাশার নিকট তাদের জন্য মধস্থতা করেন। গভর্নর তাদের ক্ষমার আদেশ দিয়ে বলেন, ‘সন্মানিত নেতা আলেমদের কথা রক্ষার্থে তাদের ক্ষমার আদেশ দেয়া হলো।’

আযহার-সম্প্রসারণ

উসমানি আমলে আযহারের পরিধি বৃদ্ধি পায়। ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে আমির আব্দুল্লাহ সম্প্রসারণ নীতিমালা গ্রহণ করেন। তারপর আজকের এই পরিধি।

আযহারের অভিভাবক নিযুক্ত

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে আযহার-দেখাশোনায় একজন ‘শায়েখ’ নিযুক্ত করা হয়। তিনি এর স্বার্থ দেখভাল করবের। সাধারণত বড়-বড় আলেম ও ফকিহদের সহায়তায় আযহারের
শায়েখ নিযুক্ত করা হতো। আযহারের প্রথম শায়েখ ছিলেন শায়েখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ খুরাশি (১৬৯০)। প্রথম পাচঁজন ছিলেন মালেকি মাযহাবের। পরবর্তী শায়েখগণ ছিলেন শাফেয়ি মাযহাবের। কোনো কোনো প্রতিবেদন অনুসারে ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে উসমানীয়দের প্রবেশের সময়ই মূলত শায়খুল আযহারের পদ সৃষ্টি হয়। সময়ের সাথে সাথে শায়খুল আযহার মিশরের সকল মত-পথের মানুষের নিকট আস্থাশীল ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

মূলত উসমানী সালতানাতের প্রশাসনে আযহার-গ্রাজুয়েটদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আযহারের প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। আযহারে আনাদুলা, মরক্কো, পশ্চিম আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আলাদা আলাদা তাবু হতে থাকে।

আযহারের সাহসী ভূমিকার নেপথ্যে

ধর্ম ও রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে আযহারের স্বাধীনচেতা মনোভাবের পেছনে রয়েছে তার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। ওয়াকফ সম্পত্তি হতে আসা সম্পদ আযহার তার সন্তানদের প্রতি দু’হাতে খরচ করতে থাকে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক–কারও নিকট অর্থনৈতিক কারণে শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন হতো না আযহারের।

তাছাড়া আযহারের ইতিহাসে ফাতেমি, আইয়ুবি, মামলুক ও উসমানি–কেউই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার দুঃসাহস করেনি। বরং তারা এর সাথে আরও দান-অনুদান যুক্ত করতে থাকেন। নতুন নতুন ভবন ও গ্রন্থাগার যুক্ত করতে থাকেন। উসমানীয় মন্ত্রী হাসান পাশা আযহারে ফিকহে হানাফির ছাত্রদের জন্য হানাফি শিবির তৈরী করেন। আযহারে অবস্থানকারীদের মালসম্পদ রক্ষার জন্য অনেক রক্ষণাগার তৈরি করেন।

জনমানুষের আশ্রয়কেন্দ্র

ধর্মীয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক স্বকীয়তার কারণেই আযহার বিপদে-আপদে মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে পারে। ইতিহাসের পাতা এমন অসংখ্য ঘটনা দ্বারা অলংকৃত; কীভাবে আযহারের ছাত্র-শিক্ষক ও আলেম-ওলামা বিপদ-আপদে মানুষের কাতারে দাঁড়িয়েছেন, তা সবিস্তারে সংরক্ষিত আছে সেখানে।

তখন খ্রিষ্টাব্দ ১৭৮৬ সাল। হুসাইন বেগ তার সৈন্যদের নিয়ে হুসাইনিয়্যাহ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির বাড়িঘর দিন-দুপুরে লুট করে। তারা ক্ষুদ্ধ হন। করণীয় নির্ধারণে পরামর্শ করেন। সিদ্ধান্ত হয়, শায়খুল আযহার ইমাম ‘দারদির’-এর নিকট অভিযোগ জানানো হবে। পরের দিন সকলেই ইমাম দারদিরের নিকট উপস্থিত হলেন। তাঁরা শায়েখকে সবকিছু অবহিত করেন। শায়েখ ক্ষুদ্ধ হয়ে সকলের মধ্যে ঘোষণা দেন, ‘আমি আপনাদের সাথে আছি। আগামীকাল আমরা সবাই একত্রিত হবো। আপনাদের সাথে চড়ে ওদের বাড়িঘরের সম্পদ নিয়ে আসবো, যেভাবে ওরা আপনাদের বাড়িঘর লুট করেছে। হয় শহিদ হবো নয়তো আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করবেন।’ শায়েখ যুদ্ধের জন্য মিনারে মিনারে যুদ্ধবাজনার ঘোষণা দেন। চারদিক হতে মানুষ সম্ভাব্য যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য উপস্থিত হতে থাকে।

সংবাদ চলে যায় মামলুকি নীতিনির্ধারকদের নিকট। মামলুক সুলতান ইবরাহিম বেগ জনসাধারণের মধ্যে শায়েখ দারদিরের মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পর্কে ছিলেন অবগত। সম্ভাব্য বিপদ আচঁ করতে পেরে একজন আমিরকে শায়েখের নিকট পাঠান। তিনি শায়েখের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এবং আগামীতে আমিররা সংযত থাকবেন বলে শায়েখকে প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি হুসাইন বেগকে ভর্ৎসনাসহ লুণ্ঠিত সবকিছু ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।

দখলদার নেপোলিওন ও আযহারের প্রতিরোধ

নেপোলিওন যখন মিশরে আসে, অনেকে এটাকে মিশরের আলোকযুগ-হিসেবে বিবেচনা করলেও আযহার ঠিকই এর পেছনে ঔপনিবেশিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য আছে বলে বুঝতে পারে। বরং ১৭৯৮ ও ১৮০০ সালের বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে এই আযহারই ছিল। আযহারের কিছু সন্তান বিপ্লবপরিচালনার জন্য গোপনে ফরাসিদের অগোচরে আযহারেই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। রবিউস সানি মাসের ২১ তারিখের সকালবেলায় আযহারের একজন শায়েখ শহরে ঘোষণা দিতে লাগলেন, ‘আল্লাহর ওপর যারা বিশ্বাস রাখে, তারা যেন আযহারে উপস্থিত হয়। আজ কাফিরদের সাথে আমাদের লড়াই করতে হবে।’ ইতিহাসের বরাবর নিয়মে দখলদাররা এখানেও কিছু ধর্মীয় মানুষকে তাদের দখলদারিত্ব-বৈধতা দানে ভাড়া করে। কিন্তু আযহারের মহান শায়েখরা ঠিকই দখলদার শক্তির মোকাবেলা করার জন্য গোপন প্রতিরোধ-প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

১৭৯৮ সালের অক্টোবরে যখন কায়রোতে প্রথম বিপ্লব হয়, নেপোলিওন ঠিকই বুঝতে পারে, বিপ্লবের বাগডোর আযহারেই। নেপোলিওন সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত আযহারে কামানের গোলা নিক্ষেপের আদেশ দেয়। আযহারের প্রবীণ শায়েখগণ কৌশলগত কারণে নেপোলিওনের সাথে সাক্ষাত করেন। এবং আপস করেন। কিন্তু ফরাসি সৈনিকরা আযহারে ঢুকে সবকিছু তছনছ করে ফেলে; থালাবাসান নষ্ট করা, ছাত্রদের ট্রাংক-সুটকেস লুট করা, বইপত্র ও কুরআনকে পদদলিত করাসহ এমন কিছু নাই যা তারা করেনি। এমনকি যাদেরকেই সামনে পেয়েছে,তাকে উলঙ্গ করে বের করে দিয়েছে।

আযহারের ইতিহাসে এটা ছিল বড় ভয়ানক সময়। নেপোলিওন আযহারকে মানুষের সামনে ছোট করার জন্য স্বেচ্ছায় আযহার ত্যাগ করছিল না, বরং আযহারের ইমামের সুপারিশের অপেক্ষা করছিল, যাতে তিনি সুপারিশ করেন। তবে এটা মানুষদের চোখ খুলে দেয়; ফ্রান্স তাদের মুক্তির জন্য আসেনি, বরং এসেছে দখল করতে। নেপোলিওন বিপ্লবের পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দানকারী আযহারের ৬ জন শায়েখকে ফাঁসির আদেশ দেয়। এভাবে আযহার নেপোলিওন ও তার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-লড়াই অব্যাহত রাখে। একসময় নেপোলিওন মিসর-ত্যাগে বাধ্য হয়। তার উত্তরসূরী ক্লেবর আলেপ্পো হতে আসা এক আযহারি ছাত্রের হাতে নিহত হয়। অবশেষে তারা পুরোপুরি তাদের তল্পিতল্পাসহ মিশর ত্যাগ করে।

আযহারের স্তম্ভকে নষ্ট করা

ফরাসি হামলার পর আযহার দৃশ্যপট হতে অনুপস্থিত থাকেনি। মামলুক ও উসমানীয়রা আবারও নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করে দেয়। মিশরীয়দের সাথে ফরাসিদের বিরুদ্ধে লড়াইকারী উসমানীয় সেনা কমান্ডের অধীন ‘আরনাউত ব্রিগেড’-এর প্রধান মুহাম্মাদ আলি পাশা ক্লিন ইমেজের জন্য আযহার ও জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টিতে পড়েন। তাঁকে তাদের পরামর্শ মোতাবেক চলার শর্তে মিশরের দায়িত্ব দেয়া হয়। চতুর মুহাম্মাদ পাশা দেখলেন, ক্ষমতার চ্যালেঞ্জ ও যে কোনো প্রতিরোধ আযহার হতেই আসে, তাই আযহারের ভূমিকা হ্রাস করার জন্য আযহারিদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করেন। অর্থবিত্ত ও পদপদবীর টোপে একশ্রেণীর আলেমকে হক ও জননন্দিত আলেমদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেন। এভাবে আযহারের ইমাম শায়েখ উমর মুকাররামকে দেশান্তরিত করা হয়। একসময় আযহারের শায়েখদের ভূমিকা সংকুচিত করে আনা হয়। একপর্যায়ে আযহারের নিয়ন্ত্রণ-রহস্য ও অর্থনৈতিক স্বকীয়তার উৎস আওকাফের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হন মুহাম্মদ পাশা।

মুহাম্মাদ আলি পাশা-কর্তৃক আযহারের ভূমিকা হ্রাস করার ফলে ইরেজদের জন্য সহজেই মিশরের দখল নেয়া সম্ভব হয়। কারণ, মুহাম্মাদ আলি মিশরের সকল প্রভাবক শক্তিকে শেষ করে দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও দখলদার ইংরেজদের প্রতিরোধে আযহার ভূমিকা রেখেছে। জামাল আব্দুল নাসের আযহারের ভূমিকাকে পুরো ব্যাকফুটে পাঠিয়ে দিলেও আরব ও ইসলামি বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত ও হেফাজত ছাড়াও প্রভাবশালী প্রভাবকহিসেবে অবশিষ্ট ছিল।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচে ভয়াবহ বিষয় হলো, মুহাম্মাদ আলি পাশা ও জামাল আব্দুল নাসির যা করেছেন, সিসি তার পুর্বসূরীদের অতিক্রম করে এখন ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে ও সুন্নাতে নববির সার্বজনীনতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিসি ও শায়খুল আযহারের মধ্যকার বিরোধ এমন নয় যে, একজনের জন্য আরেকজনের স্পেস সংকুচিত হচ্ছে তাই অপরকে কোণঠাসা করা দরকার। বরং শরিয়তের ইলম ও শিক্ষাদান বিষয়ে আযহারের ইতিহাসে কোনো সুলতান বা প্রেসিডেন্ট হস্তক্ষেপ করার দুঃসাহস দেখায়নি, যা বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেখাবার চেষ্টা করছে।

সূত্র : আলজাজিরা

আগের সংবাদলক্ষ্মীপুরে গৃহবধূকে দলবেঁধে গণধর্ষণ
পরবর্তি সংবাদব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মসজিদে অগ্নিসংযোগকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জেলা ইসলামী ঐক্যজোটের