রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইন : ইফতা বিভাগগুলোর ভূমিকা নেই কেন?

হামমাদ রাগিব

বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা পরিসরে উল্লেখযোগ্য হারে মানসম্মত ইফতা বিভাগ রয়েছে। ইসলামি আইন বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা এবং পড়াশোনা হয় এ বিভাগগুলোতে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইন প্রণয়ন, পরিমার্জন ও পরিবর্তনের সময় এ বিভাগগুলোর কোনো ভূমিকা থাকে না। যেখানে দেশের অন্যান্য ঘরানার ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা সাধারণত আমরা দেখতে পাই।

বাংলাদেশের কোনো আইন প্রণয়ন পরিবর্তন কিংবা পরিমার্জনের সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের গবেষক, আইনবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ও বিভিন্ন এনজিও সংগঠন সে বিষয়ে নিজেদের বিশ্লেষণ ও মতামতের আলোকে খসড়া প্রস্তাবনা জমা দেয় সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। পরবর্তীতে বিল চূড়ান্ত করতে বসে এসব খসড়ার ওপর পর্যালোচনা করে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সংশ্লিষ্ট কমিটি। সিদ্ধান্তকৃত সেই বিলটিই পরে সংসদে উত্থাপিত হয় পাশ হবার জন্য।

এসব খসড়া প্রস্তাব পেশে ওলামায়ে কেরামের কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না। তাছাড়া কওমি মাদরাসার ইফতা বিভাগগুলোতেও, যেখানে ইসলামি আইন নিয়ে গবেষণা হয়, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন বিষয়ে মোটামুটি প্রয়োজন মাফিকও কোনো পড়াশোনা হয় না।

মুহাম্মদ সা. রিসার্চ সেন্টারের প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মাওলানা মনযূরুল হক বলছেন, ইসলামি আইনের পাশাপাশি ইফতা বিভাগগুলোতে যদি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন বিষয়ে মোটামুটি রকমের একটা ধারণাও দেওয়া হয়, তাহলে ইসলামের সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রের কোন কোন আইনের সংঘাত আছে, কোন কোন আইনে সামঞ্জস্য আছে আর কোন কোন আইনে সামঞ্জস্য-সংঘাত কোনোটাই নেই, মুফতিয়ানে কেরাম এ বিষয়ে সচেতন হতেন।

‘ইসলামি আইন ও বাংলাদেশি আইন : বৈপরীত্য ও সামঞ্জস্য’ বিষয়ে দীর্ঘ সময় গবেষণা করেছেন মাওলানা মনযূরুল হক। ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে তিনি বলেন, বাংলাদেশি আইনের মধ্যে মোটামুটি ৫৬টি আইন আছে এমন, যেগুলোর কোনো কোনো ধারায় ইসলামি আইনের সঙ্গে বৈপরীত্য থাকতে পারে। অথচ আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়, বাংলাদেশের আইন-কানুন ইসলাম পরিপন্থী।

মাওলানা মনযূরুল হক বলেন, বাংলাদেশের সবগুলো আইনকে প্রধানত তিনটি ভাগে ফেলা যায়। এক. ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন। দুই. ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন। আর তৃতীয় প্রকারটা হচ্ছে ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় ঠিক, তবে সাংঘর্ষিকও নয়।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরাম বা আমাদের দেশের প্রধান প্রধান ইফতা বিভাগগুলো কাজ করতে পারে। এবং কাজ করাটা অতি জরুরি। কাজটা হচ্ছে, বাংলাদেশি যে যে আইনের সঙ্গে ইসলামের সামঞ্জস্য রয়েছে এবং যে যে আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই কিন্তু বিরোধও নেই সে আইনগুলোকে আলাদা করে এগুলোর ওপর নিজেদের ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরা। এবং এগুলো যে ইসলাম-বান্ধব তা দেখানো। তবে সামঞ্জস্য ও বিরোধ যেসব আইনের সঙ্গে নেই, সেসব আইনের বিকল্প ইসলামি আইন থাকলে বা এরচেয়েও আরও উৎকৃষ্ট আইন থাকলে সেটা কেন উৎকৃষ্ট এবং অধিক জনবান্ধব তা উল্লেখ করে একটা খসড়াও পেশ করতে পারেন তাঁরা রাষ্ট্রপক্ষের কাছে।

মাওলানা মনযূর আরও বলেন, ইসলামের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক যে আইনগুলো থাকতে পারে, পরিমাণে কিন্তু এগুলো খুব বেশি নয়, বিস্তরভাবে এগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। এবং এটা উচ্চতর এবং মানসম্মত ইফতা বিভাগগুলোর জন্য খুব কঠিন কাজ না। পর্যালোচনা পূর্বক সাংঘর্ষিক আইনগুলো কেন সাংঘর্ষিক এবং এর বিপরীতে ইসলামি আইনগুলো কেন অধিক উপযোগী ও কার্যকরী তার একটা খসড়া রাষ্ট্রপক্ষের কাছে পেশ করা যায়।

তিনি বলেন, এসবের বাইরে বিভিন্ন সময় যে নতুন নতুন আইনের খসড়া তৈরি হয়, সেসব আইনে যদি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু থাকে, তাহলে ওলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে তার একটা স্পষ্ট পর্যালোচনা আসা দরকার। পর্যালোচনায় ইসলামি আইনের সঙ্গে নতুন আইনের সংঘাতটা কোন জায়গায়, ইসলামের আলোকে এর বিকল্প কী হতে পারে, বিকল্পের সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা কী—তা ফুটিয়ে তুলতে হবে। এবং পর্যালোচনাটি যথাযথ পন্থায় রাষ্ট্রপক্ষে আইনের খসড়া যারা তৈরি করছেন, তাদের সামনে পেশ করতে হবে।

মনযূরুল হক বলেন, সিস্টেম অনুযায়ী এভাবে যদি আগানো যায়, তাহলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইনে এ দেশের ওলামায়ে কেরাম ও উচ্চতর ইসলামি আইন গবেষণাগার তথা ইফতা বিভাগগুলো আলাদা একটা ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

তবে ব্যাপারটাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন রাজধানীর বাইতুল উলুম ঢালকানগর মাদরাসার প্রধান মুফতি মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিসবাহ। তিনি বলছেন, রাষ্ট্রের আইন ও নীতি বিষয়ে কাজ করা ইফতা বিভাগগুলোর দায়িত্ব না। এখানে মূলত শরয়ি মাসআলা-মাসায়েল এবং ইসলামি আইন বিষয়েই গবেষণা করা হয় এবং শরয়ি জিজ্ঞাসার জবাব প্রদান করা হয়।

ইসলামি আইনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আইনের তুলনা বিচারকে ঝুঁকিপূর্ণও মনে করছেন মুফতি হাবিবুল্লাহ মিসবাহ। তিনি বলছেন, রাষ্ট্রীয় আইনের সঙ্গে ইসলামি আইনের সংঘর্ষ আছে অনেক জায়গায়, এখন এ নিয়ে ইফতা বিভাগগুলো থেকে কথা বললে বিভিন্ন মহলের উস্কানিতে রাষ্ট্রপক্ষের সন্দেহের তীর নিক্ষিপ্ত হতে পারে। এবং ব্যাপারটা হিতে আরও বিপরীত হতে পারে। তাই এ রিস্ক সাধারণত আমাদের ইফতা বিভাগগুলো নিতে চায় না।

ইসলামিক ল’ রিসার্চ সেন্টারের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মাওলানা শহীদুল ইসলাম বলছেন, ইফতা বিভাগ তথা শরিয়া আইন নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইনে তাঁদের ভূমিকা না থাকার প্রথম কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের ল’ ম্যাকিংয়ে শরিয়া আইনের কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকা। যার দরুণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শরিয়া-আইনবিদরা কাজ করার কোনো সুযোগ পান না।

তবে তারপরও মতামত দানের জায়গা থেকেও তাঁরা একটা ভূমিকা রাখতে পারতেন, ব্যাপারটা স্বীকার করে শহিদুল ইসলাম বলছেন, শরিয়া আইন নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেন, তাঁরা সাধারণত রাষ্ট্রীয় আইন নিয়ে মাথা ঘামান না। যার দরুণ মতামতের জায়গা থেকেও তাঁরা কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এজন্য ইসলামি আইন বিষয়ে বাংলাদেশে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা হচ্ছে, সে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাডেমিকভাবেই শরিয়া আইনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইনের প্রাথমিক পড়াশোনাটা অন্তর্ভুক্ত রাখলে রাষ্ট্রের আইন বিষয়ে মৌলিক একটা ধারণা লাভ করতে পারবেন শরিয়া-আইনবিদেরা। এবং এর উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রের যেকোনো আইন প্রণয়ন পরিবর্তন বা পরিমার্জনের সময় তারা মতামত দানের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবেন।

আগের সংবাদফিলিং স্টেশনের পেছনে মিলল ফুটফুটে এক নবজাতকের মৃতদেহ
পরবর্তি সংবাদসৌদি আরবের রাজকীয় অতিথি হয়ে হজ পালন করতে গেলেন ক্রাইস্টচার্চে আহত-নিহতদের পরিবার