
ফাতেহ২৪ ডেস্ক
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় চলছে ভয়াবহ আগ্রাসন। কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন দেড় লাখের বেশি মানুষ। ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি।
এবার নতুন এক ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। মৃতদের দাফন করার জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা মিলছে না।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার বহু কবরস্থান প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নতুন কবর দেওয়ার জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহি। বাবার মরদেহ কোথায় দাফন করবেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাকে হিমশিম খেতে হয়েছে।
৪০ বছর বয়সী তার বাবা মোহাম্মদ গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় রাস্তার পাশে ছোট একটি দোকানে চা-কফি বিক্রি করতেন। গত ১০ জুন কথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে তার ঘাড়ে গুলি লাগে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
বাবার মরদেহ নিয়ে ওমর জেইতুন কবরস্থানে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, নতুন কবর দেওয়ার জায়গা প্রায় শেষ।
চলমান আগ্রাসন ও ব্যাপক প্রাণহানির কারণে কবরস্থানগুলোতে এখন ঠাসাঠাসি করে মরদেহ দাফন করা হচ্ছে।
অনেক কবরের কোনো স্থায়ী সমাধিচিহ্ন নেই। কোথাও শুধু একটি পাথর রাখা হয়েছে। তার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির নাম লেখা কাগজ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে জায়গার সংকট ও নির্মাণসামগ্রীর অভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ওমর আল জাজিরাকে বলেন, তিনি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অসংখ্য কবর দেখেছেন। চারদিকে বালুর পাহাড়। আর সেই বালুর নিচেই দাফন করা হয়েছে মানুষকে।
তার ভাষায়, কোথাও শুধু একটি পাথরের সঙ্গে শহীদের নাম লেখা কাগজ লাগানো হয়েছে। যুদ্ধের আগে যেভাবে কবর তৈরি ও প্রস্তুত করা হতো, এখন আর সেভাবে করার সুযোগ নেই।
বর্তমানে গাজায় একটি কবর তৈরিতে প্রায় ৫০০ শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ১৬৭ ডলার খরচ হয়। ওমরের পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না।
তার ওপর নতুন কবরের জন্য জায়গাও পাওয়া যাচ্ছিল না।
শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দাদার কবরেই বাবাকে দাফন করতে হয়েছে বলে জানান ওমর।
ভেঙে পড়েছে দাফনব্যবস্থাও
চলমান আগ্রাসনে গাজার সেবাব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। হামলার ঝুঁকির কারণে অনেক মৃতদেহ শনাক্ত করা এবং যথাযথভাবে দাফন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে নিখোঁজ হিসেবে গণনা করা হয়েছে।
অনেককে বাড়ির আঙিনায় দাফন করা হয়েছে। কোথাও তাবুর পাশে। কোথাও বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরে।
স্কুল ও হাসপাতালের চত্বরেও তৈরি হয়েছে অস্থায়ী কবর।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর হামলার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। এরপর পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং অস্থায়ী কবরস্থানে থাকা স্বজনদের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে।
তবে যুদ্ধবিরতির পরও হামলা বন্ধ হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও হামলায় অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজন হয়েছে নতুন দাফনস্থল।
গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালগুলোর প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ধ্বংস হয়েছে বহু কবরস্থান
কবরের সংকট শুধু বিপুল প্রাণহানির কারণেই নয়। আগ্রাসনে গাজার বহু কবরস্থানও ধ্বংস হয়েছে।
গাজার ধর্মীয় ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে।
এ ছাড়া ইস’রাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন এলাকায় কবরস্থানে প্রবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এতে দাফনের জায়গার সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
গাজার ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদালাল জানান, যুদ্ধ শুরুর আগেই গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলো প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
৬০ কবর থেকে এখন প্রায় ৬ হাজার
৫০ বছর বয়সী তাফেশ আবু হাতাব গত ১৯ বছর ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করছেন।
তার ভাষায়, চলমান আগ্রাসন তার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।
তিনি খান ইউনিসের একটি কবরস্থানে কাজ করেন। যুদ্ধ শুরুর সময় সেখানে ছিল প্রায় ৬০টি কবর।
এখন সেই কবরস্থানে প্রায় ৬ হাজার মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
যুদ্ধের একপর্যায়ে তাকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি পর্যন্ত কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে।
অবিরাম প্রাণহানি, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ এবং দাফনের জায়গার সংকট—সব মিলিয়ে গাজার মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হয়ে উঠছে।
সূত্র: আল জাজিরা
