‘লড়কে লেঙ্গে আযাদী’ : দেশবিভাগের টাইমলাইন 

সাজ্জাদ আকবর

আমাদের এ ভারত উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের শুরু থেকে শত শত বছর ধরে মুসলিম ও হিন্দুরা স্বতন্ত্র ধর্মবিশ্বাস ও আলাদা জীবনাচরণের মাধ্যমে ধর্মীয় জীবনের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে পাশাপাশি বসবাস করে এসেছেন। তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের লক্ষ্য অর্জনে এই স্বাতন্ত্র্যচেতনা বড় ধরনের কোন সংঘাত সৃষ্টি করেনি।

কিন্তু বৃটিশ শাসনকালে হিন্দু মুসলমানের ধর্মীয় পার্থক্য তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে বিস্তার লাভ করে। শুধু তাই নয়, উনিশ শতকের হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দুদের মাঝে সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্যবোধ তীব্র হয়। বিশ শতকের শুরুতে প্রশাসনিক কারণে বঙ্গভঙ্গের ফলে বাঙালি মুসলিমদের উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হলে তার বিরুদ্ধে হিন্দুদের মারমুখী সংগ্রাম হিন্দু মুসলিম জাতি স্বাতন্ত্র্যের দিকটিকে আরো প্রকটভাবে উপস্থিত করে। এই ধারা দিন দিন শুধু বেড়েছে।

ব্রিটিশ শাসনকে ঘিরেই হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মীয় পার্থক্য তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের স্তরে স্তরে প্রভাব বিস্তার করে। এবং এরই ফলশ্রুতিতে ভাগ হয় ভারত। ভারতবিভাগের ঘটনাপ্রবাহকে নিম্ন ক্রমানুসারে সাজানো যেতে পারে :

৬ জুলাই ১৯০৫ : কলকাতা প্রেস প্রথম বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব পেশ করে।

 ১৭ জুলাই ১৯০৫ : বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক দেন সুবেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী।

৭ আগস্ট ১৯০৫ : কলকাতার টাউন হলে কাশিম বাজারের মহারাজা মাহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী প্রতিবাদ সভা করে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

 ২২ সেপ্টেম্বর ১৯০৫ : বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ঐক্যের প্রতীক হিসাবে রাখিবন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে রবি ঠাকুর ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেন।

 ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ : প্রশাসনিক কার্যক্রমকে সহজতর করার লক্ষে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কাঞ্জন প্রথমবারের মত বাংলাকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে ভাগ করে।

১৯০৬–০৭ : একশ্রেণির হিন্দুদের উস্কানিতে বঙ্গভঙ্গ ধর্মীয় ছোয়া পায়। সুবেন্দ্রনাথ বাংলা ভাগকে হিন্দুদের অপমান ও মুসলিমদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ দাবি করে পুরো ব্যাপারটিকে সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে পরিণত করে। ফলশ্রুতিতে কুমিল্লা, ঢাকা, পাবনা, রাজশাহী, মোমেনশাহীসহ বেশ কিছু স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রচুর লোক হতাহত হয়।

ফেব্রুয়ারী ১৯০৬ : বঙ্গভঙ্গের ব্যাপক ঘটনা প্রবাহে কলকাতাকেন্দ্রিক বর্ণহিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে ঢাকা কেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমানদের যে নীতিগত লড়াই, তারই রেশ ধরে ফযল হুসাইনের নেতৃত্বে মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় গঠিত হয় মুসলিম লীগ।

৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬ : বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু জমিদার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রবল আন্দোলনের পটভূমিতে ঢাকায় ১৯০৬ সালের শিক্ষা সম্মেলন শেষে সর্বভারতীয় মুসলিম প্রতিনিধিদের এক বিশেষ সভায় নওয়াব সলিমুল্লাহর প্রস্তাবক্রমে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ গঠিত হয়।

১২ ডিসেম্বর ১৯১১ : হিন্দুদের উপর্যপরি আন্দোলন ও সহিংসতা দাঙ্গার কারণে কেন্দ্রীয় রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান উপলক্ষে দিল্লির দরবার থেকে সম্রাট পঞ্চম জর্জ স্বয়ং বঙ্গবিভাগ রদ করেন।

 ২০ ডিসেম্বর ১৯১১ : বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়ায় উপমহাদেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে নওয়াব সলিমুল্লাহ লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে আট দফা দাবি পেশ করেন।

 ২৯ জানুয়ারি ১৯১২ : বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববাংলার মুসলিম জনমনে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়, তা প্রশমনের জন্য জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ তিন দিনের জন্য ঢাকায় আসলে একটি মানপত্রে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করা হয়।

 ফেব্রুয়ারি ১৯১২ : দাবি মেনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করা হলে কলকাতার হিন্দুরা বিভিন্ন অজুহাতে এর বিরোধিতা শুরু করে। কথিত আছে,  তাদের মধ্যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন।

৩১ ডিসেম্বর ১৯১২ : বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়া হিসাবে প্যান ইসলামি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ মুসলিম নেতৃবৃন্দের মধ্যে ‘স্বাধিকার আদায়ের’ বাসনা জোরদার হয়ে ওঠলে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিল সদ্য প্রণীত গঠনতন্ত্রে স্বায়ত্তশাসনের (self government) দাবি অন্তর্ভুক্ত করে।

 ২২ মার্চ ১৯১৩ : মুসলিম লীগের লাখনৌ অধিবেশনে তা অনুমদিত হয়।

 ৭ মার্চ ১৯১৭ : ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার খসড়া বিল তৈরির ঘোষণা দেয়।

 ১৯২১ : নওয়াব সলিমুল্লাহর দান করা কয়েকশো বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯১৬ : মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে একটি শাসনতান্ত্রিক চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা লাহোর চুক্তি নামে পরিচিত।

 ১৯১৯ : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হিন্দু মুসলিম পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যৌথ অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়৷

 জুন ১৯২০ : হিন্দু মুসলিম নেতৃবৃন্দ ইংরেজ সরকারকে অসহযোগিতার নীতি কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং ৩১ আগস্ট মুসলমানরা তুর্কি খেলাফতের খেলাফত দিবস পালন করে। সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, খিলাফত কমিটি ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ কলকাতার এক অধিবেশনে মিলিত হয়ে অসহযোগ আনদোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করে।

 ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৩ : কংগ্রেস নেতা সি আর দাস মুসলিম নেতা ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ নামক রাজনৈতিক চুক্তি সম্পাদন করে।

 ১৯২৮ : ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস হঠাৎ করে পূর্ব সম্পাদিত ‘লাখনৌ চুক্তি’ অস্বীকার করে বসে। এই বিশ্বাসঘাতকতার ফলে হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের নীতিগত ভিত্তি ধসে পড়ে।

 ১৯২৯ : মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় ১৪ দফা দাবি উত্থাপন করে। কিন্ত কংগ্রেস নেতৃত্ব সে দাবিও অগ্রাহ্য করে।

 ১৯৩০ : লন্ডনে তিন দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র প্রশ্নে হিন্দু–মুসলিমদের দাবি দাওয়ার সামঞ্জস্য বিধানের জন্য। ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধানের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়।

 ২৩ মার্চ ১৯৪০ : শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রথমবারের মত মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আওয়াজ ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়।

 ১৯৪৫ : বৃটিশ সরকার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের প্রতিনিধিত্বের দাবি যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় আইন সভা ও প্রাদেশিক আইন সভার নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় আইন সভার প্রতিটি আসনে নিরঙ্কুশ বিজয় পায় এবং প্রাদেশিক আইন সভার ১১৯ আসনের ১১৩ টিতে জয়লাভ করে।

 ১৯৪৬ : সর্বপ্রথম বৃটিশ কেবিনেট মিশন প্রস্তাব পেশ করে যে, হিন্দু অধ্যুষিত দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের প্রদেশ সমন্বয়ে গ্রুপ–ক, পশ্চিমাংশের মুসলিম অধ্যুষিত সিন্ধু, পাঞ্জাব, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত ও বেলুচিস্তান সমন্বয়ে গ্রুপ–খ, এবং পূর্বাংশের মুসলিম অধ্যুষিত বাংলা ও আসাম নিয়ে গ্রুপ–গ গঠিত হবে। এবং এর বাইরে হায়দরাবাদ, জুন্ম ও কাশ্মিরকে করদমিত্র স্বাধীন রাজ্য হিসাবে রাখা হবে। কিন্তু কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সম্মতি না থাকায় এ প্রস্তাবনা বাতিল করা হয়।

১৪,১৫ আগস্ট ১৯৪৭ : বৃটিশ ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান আধিরাজ্য ও ভারত আধিরাজ্য নামক দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করা হয়। সেই সাথে বৃটিশ ভারতের কর্তত্বাধীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভেঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ( ভারত) ও পূর্ব বাংলা / পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ (পাকিস্তান) গঠিত হয়। একইভাবে পাঞ্জাব প্রদেশ ভেঙ্গে পাঞ্জাব প্রদেশ (পাকিস্তান) ও পাঞ্জাব রাজ্য (ভারত) গঠিত হয়।

লেখক : অধ্যয়নরত, ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট অ্যান্ড রিসার্চ, ঢাকা

তথ্যসূত্র : ১. দেশবিভাগ : ফিরে দেখা– আহমদ রফিক ২. আমাদের জাতিসত্বার বিকাশধারা : মোহাম্মদ আবদুল মান্নান

আগের সংবাদকাশ্মীরিদের সঙ্গে সংহতি : দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিলেন ইমরান খান
পরবর্তি সংবাদ১০ বছরে গুম হয়েছেন ৫০৭ জন