মুসান্না মেহবুব :
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ। উসমানি খেলাফতের ৩৪তম এবং কার্যত সর্বশেষ সুলতান। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি টানা কয়েক বছরের নির্বাসিত জীবনের বঞ্চিতি থেকে চিরবিদায় নেন পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত ভাগ্যাহত এ সুলতান। তারও আগে ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে উসমানি খেলাফতের সামরিক বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পশ্চিমাপন্থী সেনা অফিসারদের বিদ্রোহ ও চক্রান্তে তাঁর ক্ষমতাকে অনেকাংশে খর্ব করা হয়। আর এরমধ্য দিয়েই মূলত হাজার বছরের খেলাফত ব্যবস্থা বিলুপ্তির দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। পরে সময়ের পরিক্রমায় আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাফতের বিলুপ্তি সাধিত হয় ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে।
উসমানি খেলাফতের সর্বশেষ এ শাসক সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ নামে পরিচিতি। তিনি ছিলেন পূর্বতন সুলতান আবদুল মাজিদের পুত্র। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্ম। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি যখন খেলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তখন উসমানি সাম্রাজ্যের টালমাটাল অবস্থা। পশ্চিমা বিশ্বের ষড়যন্ত্র, আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল এবং বিশৃঙ্খলা বিশাল সাম্রাজ্য প্রায় গ্রাস করে নিয়েছিল। সুলতান আবদুল হামিদ এই টালমাটাল অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।
১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ডিসেম্বর সাম্রাজ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নিমিত্তে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তুর্কিদের জন্য সর্বপ্রথম সংবিধান প্রণয়ন ও কার্যকর করেন। এবং তাঁর প্রায় ৩৩ বছরের শাসনামলে তুরস্ক আধুনিক যুগে প্রবেশ করে। তিনি বিশেষ প্রচেষ্টায় ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি আইন, প্রকৌশল, ব্যবসায়, কৃষি ইত্যাদি বহুমুখী শিক্ষাদীক্ষার প্রসার ঘটান। টেলিগ্রাম ও রেলপথের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেন। এ ছাড়া সাম্রাজ্যের সবজায়গায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকেও তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। ইস্তাম্বুলো দারুল ফুনুন নামে একটি উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, পরবর্তী সময়ে যা ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয় নামে পৃথিবীজোড়া খ্যাতি অর্জন করে।
ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপরায়ণ ছিলের ইতিহাসের সর্বশেষ এ খলিফা। মুসলিম জাহানের সুখ-দুঃখের সাথি ছিলেন তিনি। ছিলেন বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী এবং পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধী। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ এবং ইহুদি ষড়যন্ত্রের ব্যাপারেও ছিলেন কঠোর।
তাঁর জীবনের একটি ঘটনা কেবল অসাধারণ নয় রীতিমত চোখ খুলে দেয়ার মতো বিস্ময়কর। ১৯০১ সালের কথা। Mizrary Qrasow নামক এক ইহুদি ব্যাংকার তাঁর দু’জন সহযোগীসহ ইস্তাম্বুলে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের রাজপ্রাসাদে আসেন এবং প্রতিনিধির মাধ্যমে সুলতানের কাছে নিম্নোক্ত প্রস্তাব পেশ করেন—১. উসমানীয় খিলাফতের সব ঋণ শোধ করে দেওয়া হবে। ২. উসমানীয় খিলাফতের জন্য শক্তিশালী নৌঘাঁটি তৈরি করে দেওয়া হবে। ৩. তুরস্কের উন্নয়নের জন্য ৩ কোটি ৫০ লাখ স্বর্ণমুদ্রা (Leera) বিনাসুদে প্রদান করা হবে।
এই তিন প্রস্তাবের বিনিময়স্বরূপ তারা সুলতানের কাছে ২টি জিনিস চায়—১. ইহুদিদের যেকোনো সময় ফিলিস্তিন সফরের অনুমতি দিতে হবে। পবিত্রস্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে তাদেরকে সেখানে অনির্ধারিত সময়ের জন্য অবস্থানের সুযোগ দিতে হবে। ২. জেরুজালেমের কাছে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের জন্য কিছু জমি বরাদ্দ দিতে হবে।
এখানে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, আগে থেকে পবিত্রস্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে ইহুদিরা জেরুজালেম আসলে ৩০দিন থাকার অনুমতি ছিল। এর পর তাদের ফিরে যেতে হতো।
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ প্রতিনিধির মাধ্যমে ইহুদিদের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাদের সাক্ষাৎ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ জাতীয় প্রস্তাব নিয়ে আর না আসারও হুকুম দেন। তিনি যে জবাব দেন তা সোনার অক্ষরে লিখে রাখার মত মূল্যবান, ‘অভদ্র ইহুদিদের জানিয়ে দাও, ঋণ উসমানীয় খিলাফতের জন্য লজ্জার কোন ব্যাপার নয়। ফ্রান্সের মতো দেশেরও ঋণ আছে, এতে তারা ক্ষতিগ্রস্থ নয়। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) যে ভূমি জয় করেন তা গোটা মুসলিম বিশ্বের সম্পদ। ইহুদিদের কাছে ফিলিস্তিনের ভূমি বিক্রি করে ইতিহাসে ঘৃণিত এবং জনগণ কর্তৃক প্রদত্ত দায়িত্বের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। ইহুদিদের বিপুল অর্থ থাকতে পারে কিন্তু শত্রুর অর্থ দিয়ে তৈরি প্রমোদ প্রাসাদে উসমানয়িরা লুকাতে পারে না।’
একই বছর জায়নবাদের নেতা Theodor Hertzl পুনরায় জেরুজালেম এসে সুলতানের সাক্ষাত কামনা করেন কিন্তু সুলতান সাক্ষাৎ প্রদানে রাজি হননি। সুলতান তাঁর প্রধান উজিরের মাধ্যমে তাদের কাছে এই বার্তা পাঠান যে, ‘এ পরিকল্পনা নিয়ে যেন আর অগ্রসর না হয়। আমি এক মুষ্টি মাটিও তাঁদের দেব না, যেহেতু আমি এর মালিক নই। এটা বিশ্ব মুসলিমের সম্পদ। মুসলমানরা ফিলিস্তিনের জন্য যুদ্ধ করেন এবং বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এ পবিত্র ভূমিকে রঞ্জিত করেন। ইহুদিদের কোটি কোটি টাকা থাকতে পারে। কোন দিন যদি ইসলামী খিলাফত ধ্বংস হয়ে যায় সেদিন তারা বিনা পয়সায় ফিলিস্তিন দখল করতে পারবে। কিন্তু আমি যতদিন বেঁচে থাকবো আমি আমার বুক তলোয়ারে বিদ্ধ হওয়া পছন্দ করবো তবুও ফিলিস্তিনের ভূমি ইহুদিদের হাতে থাক সেটা মানবো না। আমি জীবিত থাকতে আমার দেহের অঙ্গকে বিচ্ছিন্ন হতে দেবো না।’ (লন্ডন পোস্ট, ৬ সেপ্টেম্বর’১৪)
ইতিহাস কত নির্মম! মাত্র ৮ বছরের ব্যবধানে ১৯০৯ সালে ইহুদি চক্রান্তের ফলে আপোষহীন এ সুলতান ক্ষমতাচ্যুত হন। উসমানীয় সামরিক বাহিনীর পাশ্চাত্যপন্থি অফিসাররা সুলতান আবদুল হামিদের শাসনের বিরোধী ছিলেন। নব্যতুর্কি (Young Turks) নামে পরিচিত সেনা কর্মকর্তাগণ সাম্রাজ্যের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন গুপ্তসমিতি গঠন করেন। তাঁরা সুলতানকে জনৈক ইহুদি ধনকুবেরের গৃহে বন্দী করে রাখে এবং ইহুদিদের ফিলিস্তিন ভূমিতে বসতি স্থাপনের সুযোগ প্রদান করে।
আর এভাবেই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হন উসমানি খেলাফতের সর্বশেষ এ সুলতান। ১৯১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে ৬শ’ বছরের উসমানীয় খিলাফতের পরিসমাপ্তি ঘটে।
