শোক থেকে শক্তি : ইবনে হাজার আসকালানীর মহামারী চিন্তার সংকলন

সাবের চৌধুরী

নবীজি সাল্লাল্লামের সময়ে বা তার নিকট অতীতে আরবে খুব যে মহামারী হয়েছিল এমন নয়, কিন্তু পরবর্তী নানা সময়ে এটি ব্যাপকভাবে দেখা দিবে, এজন্য অনেকগুলো হাদীসে তিনি এ ব্যাপারে নানা মন্তব্য, দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়ে গেছেন। শিখিয়েছেন এ থেকে বেঁচে থাকার কৌশল ও নানা রকমের দোয়া। এবং জটিল কঠিন যেমনই হোক, সামগ্রিকভাবে সকল রোগের ব্যাপারে আমাদেরকে আশান্বিত করেছেন এই সংবাদ দিয়ে যে, পৃথিবীতে সকল রোগেরই অষুধ আছে। সঠিক অষুধটি যখন উপযুক্ত রোগের সাথে সংযুক্ত হয়, তখন আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় তা সেরে যায় (সহীহ মুসলিম)। রোগ ও তার চিকিৎসার ব্যাপারে এখানে মুসলমানদের মূল দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গিটি কী হবে তার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। অর্থাৎ, রোগ হলে চিকিৎসা নেওয়া, নতুন ভয়াল কোন রোগ দেখা দিলে ঘাবড়ে না গিয়ে এর অষুধ তালাশ করা; কেননা আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে এর প্রতিষেধক সৃষ্টি করে রেখেছেন, আমাদের দায়িত্ব হলো একে খুঁজে বের করা এবং সাথে এটাও বলছেন, সঠিক অষুধ হলেই যে রোগ সেরে যাবে তা-নয়; রোগ ভাল করার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা।

মহামারী সংক্রান্ত হাদীসসমূহ হাদীসের সংকলনগুলোতে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। কেউ আলাদা অধ্যায় আকারে সংকলন করেছেন, কেউ শিরোনাম না দিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে গ্রন্থিত করেছেন। হাদীসের ব্যাখ্যাকারগণ এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা লিখেছেন। যতটুকু জানা যায়, ইসলামের ইতিহাসে মহামারী নিয়ে সর্বপ্রথম আলাদা গ্রন্থ রচনা করেন ইমাম ইবনু আবিদদুনয়া, ২৮১ হিজরীতে। অর্থাৎ আজ থেকে হাজার বছরেরও আগে। গ্রন্থটির নাম—কিতাবুত্ত্বাওয়াগীন। এরপর এ হাদীসগুলো নিয়ে অসংখ্য স্বতন্ত্র পুস্তিকা রচিত হতে থাকে। আরেকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো ইমাম তাজ উদ্দিন সুবকি রহ. এর ‘জুজউন ফিত্ত্বাউন’। গ্রন্থগুলোতে হাদীসের সূত্র পর্যালোচনা, শব্দ বিশ্লেষণ, বক্তব্যের ব্যাখ্যা, বিধিবিধান, মহামারির উৎস ও প্রকার, মন্তব্য পরামর্শ ইত্যাদি নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে। এরপর ৮১৯ হিজরীর দিকে সেকালের লোকজন ইমাম ইবনে হাজার রহ. কে এ বিষয়ে বিস্তারিত একটি গ্রন্থ লিখতে অনুরোধ জানান। দুঃখজনকভাবে সে বছরই এক মহামারিতে তার দুই মেয়ে ফাতেমা ও আলিয়া ইন্তেকাল করেন। ইবনে হাজার রহ. সে বছর গ্রন্থটি শেষ না করে রেখে দেন। পাণ্ডুলিপিটি চূড়ান্ত করে প্রকাশ করেন ৮৩৩ হিজরীতে। এবং সে বছরও মহামারিতে তার বড় মেয়ে জাইন খাতুন গর্ভবতী অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ফলে, মহামারি নিয়ে লেখা অমূল্য এই গ্রন্থটির শরীরে লেগে আছে লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাবিধুর দুইটি স্মৃতির গভীর দাগ।

গ্রন্থটির লেখক হাফেজ ইবনে হাজার রহ. এর পরিচয় লেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ, নানা শাস্ত্রে মহাপণ্ডিত এই মনীষী আক্ষরিক অর্থেই স্বনামধন্য। বিশেষত হাদীস শাস্ত্রের ইমাম হিসেবে এমনকি বাংলাদেশের গণপরিসরেও একজন প্রসিদ্ধ পুরুষ তিনি। তারপরও সাধারণ কিছু তথ্য উল্লেখ করা যেতে পারে। পুরো নাম আহমদ ইবনে আলী ইবনে হাজার। তবে, শুধু ‘ইবনে হাজার’ নামে পরিচিত ও প্রশিদ্ধ। শব্দদুটো তার কোন এক পূর্বপুরুষের উপাধি ছিল। এই মহান ব্যক্তি ও প্রতিভা ৭৭৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ছোটবেলায়ই বাবাকে হারান। পিতা ইন্তোকালের আগে একান্ত বন্ধু আবু বকর নূরুদ্দিনকে ওসিয়ত করে যান, তিনি যেন ছেলেটার দেখাশোনার ভার গ্রহণ করেন। ওসিয়ত মুতাবেক তিনি বাবার এই বন্ধুর কাছেই লালিত পালিত হন এবং বন্ধুও অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তার লালন পালন করে বড় করে তোলেন। মিশরের কায়রো অঞ্চলে ছিল তার বাড়ি। ফিকহের ক্ষেত্রে শাফেয়ী মাজহাবকে অনুসরণ করতেন এবং তিনি এ মাজহাবের বড় একজন ইমামে পরিণত হয়েছিলেন। দুই স্ত্রীর গর্ভে তার সন্তান হয়েছিল মোট ছয়জন। পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে মুহাম্মদ। এর মধ্যে তিনজন মহামারীতে শহীদ হন। তিনি জীবনভর অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। এর মধ্যে অনেকগুলো প্রকাশিত ও বহুল প্রচারিত এবং অনেক গ্রন্থ পাণ্ডুলিপি আকারে বিভিন্ন সংরক্ষণাগারে রয়েছে ও অনেকগুলো হারিয়ে গেছে কালের আবর্তনে। তাঁর অমর সৃষ্টি হলো সহীহ বুখারীর দুনিয়াজুড়ে বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী’। সুবিশাল এই গ্রন্থটি হাদীস-ব্যাখ্যার জগতে উজ্জ্বল এক মশালের মত। ৮৫২ সনে মিশরে ইন্তেকাল করেন মহান এই মনীষী।

মহামারি নিয়ে তিনি যে কিতাবটি রচনা করেন, এর আরবি নাম হলো : বাজলুল মা-উন ফি ফাদলিত্ত্বা-উন। গ্রন্থটিতে নানা পরিচ্ছেদে বিভক্ত পূর্ণ পাঁচটি অধ্যায়, একটি সমাপ্তিপর্ব ও ছোট্ট একটি আলাদা পরিচ্ছদ রয়েছে। এগুলোতে তিনি মহামারির সূচনা, পূর্ববর্তী জাতিগুলোর উপর মহামারির দুযোগ নেমে আসার কারণ, মুসলমানদের জন্য এটি কেন রহমত স্বরূপ, মহামারিতে নিহত মুসলমানের শাহাদাতের মযাদা লাভ করা, মহামারি আক্রান্ত এলাকা থেকে বের না হওয়া, এবং বাহির থেকে সে এলাকায় নতুন কেউ প্রবেশ না করা, মহামারির জীবানু সংক্রামক কি না, এটি দেখা দিলে কীভাবে এর মোকাবেলা করতে হবে, আক্রান্ত রোগীর সাথে কেমন আচরণ করা উচিত ইত্যাদি নানা বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। সেই সাথে ইসলামি সভ্যতায় শুরু থেকে ৮৪৮ হিজরী পযন্ত মহামারিগুলোর সংক্ষিপ্ত ইতহাসও ‍উল্লেখ করেছেন। আমার হাতে যে কপিটি আছে এটির পৃষ্ঠাসংখ্যা মোট ৪৫০. তবে মূল বইটি ৬৩ পৃষ্ঠা থেকে ৩৮৮—মোট ৩২৫ পৃষ্ঠা। ভাষা—আরবি। শুরুতে প্রকাশনা-সম্পাদকের ভূমিকা ও শেষে বি্স্তারিত সূচিত্র ও নানা রকমের নির্ঘণ্ট। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছেন দারুল আছিমাহ, রিয়াদ, সৌদি আরব। প্রকাশনা-সম্পাদনা করেছেন আহমদ ইছাম আল কাদির।

নমুনা স্বরূপ বইটি থেকে দুটো বিষয় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি।

প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে তিনি ইমাম আহমদ রহ. থেকে একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। এর শেষ অংশে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আর তা-উন বা মহামারি হলো আমার উম্মতের জন্য শাহাদাতের কারণ ও রহমত স্বরূপ এবং কাফেরদের জন্য শাস্তি স্বরূপ (পৃষ্ঠা : ৭৮)। পর্যালোচনাতে তিনি হাদীসটিকে হাসান বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এটি একটি গ্রহণযোগ্য হাদীস।

(কুফুরি কর্মটি আল্লাহ তাআলার নিকট নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ পাপ এবং সবচেয়ে বড় পাপ। এই পাপের কারণে আল্লাহ তাআলা শাস্তি দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে যারা কুফুরির পাশাপাশি জুলুমে মধ্যেও লিপ্ত থাকে, তার অপরাধ হয় দ্বিগুন। আর, মুমিনদের মধ্যে যখন কোন বিপদ দেখা দেয়, তখন তা দুই কারণে হতে পারে। এক হলো : এটা হয়তো তার কোন পাপের কারণে নয়, বরং পরীক্ষা ও মযাদা বৃদ্ধির জন্য, ফলে তা রহমত। আবার বিপদটি তার পাপের কারণেও হতে পারে। এ সময় সে যদি পাপ থেকে ফিরে আসে, তওবা করে ও আল্লাহ তাআলার অভিমুখী হয় এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করে, তাহলে সে শাস্তিটিও তার জন্য রহমতে পরিণত হয়। কিন্তু আমরা জানি না কোন পাপটি কীসের কারণে এসেছে। তাই, যে কোন বিপদের সময় সকল পাপ থেকে ফিরে এসে আল্লাহ অভিমুখী হয়ে আল্লাহ তাআলার জন্য ধৈর্য ধারণ করলে মুমিনের বিপদমাত্রই রহমত হিসেবে পরিগণিত হবে। সুতরাং কোন মহামারি যদি একই সাথে কাফের ও মুসলিম উভয় দলের মাঝে ছাড়িয়ে পড়ে, তখন এটি একইসাথে একদলের জন্য শাস্তি ও অপর দলের জন্য রহমত হিসেবে গণ্য হবে।––––লেখক।)

চতুর্থ অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ইবনে হাজার রহ. মহামারি আক্রান্ত এলাকায় বাইরে থেকে গিয়ে প্রবেশ করা ও ভেতরের লোকজন পালিয়ে বাইরে আসা সংক্রান্ত বিষয়টি অত্যন্ত দীর্ঘ আকারে আলোচনা করেছেন। আলোচনায় এসেছে কোন রোগ সংক্রমণ করতে পারে কি না সে বিষয়টিও। অসংখ্য সূত্র থেকে অনেকগুলো হাদীস এনে বিষয়টিকে মূল থেকে খোলাসা করার চেষ্টা করেছেন। এখানে আমরা সংক্রমণ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করছি।

মুসলিম শরীফের এক হাদীসে আছে—‘লা-আদওয়া’। অর্থাৎ, রোগের সংক্রমণ বলতে কিছু নেই। অন্য এক হাদীসে আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক কুষ্ঠরোগীকে ডেকে এনে এক প্লেটে খাবার খেতে বসিয়েছেন। আবার অন্যান্য হাদীসে আছে, তিনি বলেছেন, কুষ্ঠরোগী থেকে পালিয়ে বাঁচো, সিংহ দেখলে যেভাবে পালিয়ে যাও সেরকম। এমনিভাবে অন্য হাদীসে আছে অসুস্থ উটের মালিক যেন তার উটগুলোকে সুস্থ উটদের কাছে না নেয়। অন্য এক হাদীসে দেখা যায় এক কুষ্ঠ রোগীর হাত ছুঁয়ে বাইআত না নিয়ে তিনি বলেছেন, আমি তোমার বাইআত নিয়ে নিয়েছি, তুমি ঘরে ফিরে যাও। এ হাদীসগুলোর বাহ্যিক মর্ম থেকে ধারণা পাওয়া যায়, রোগের সংক্রমণ আছে এবং এ থেকে বেঁচে থাকবার কথাও বলা হয়েছে। ফলে ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। যেমন অন্য অনেকের মত ইবনে সালাহ রহ. এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে : এই সমস্ত রোগ নিজে নিজে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রাখে না। তবে, অসুস্থ ব্যক্তিটি যখন সুস্থ ব্যক্তির সাথে মেলামেশা করে, তখন আল্লাহ তাআলা এই মেলামেশাকে সুস্থ ব্যক্তির মধ্যে সেই রোগ সৃষ্টির কারণ বানিয়ে দেন। কিন্তু অন্যান্য কারণের মতই কখনো কখনো সেই কারণটি এখানে কার্যকর হয় না। ফলে, মেলামেশা সত্ত্বেও সে অসুস্থ হয় না।

তো, যে হাদীসে বলা হয়েছে সংক্রমণ বলতে কিছু নাই, তা বলা হয়েছে মূলত জাহেলি যুগে যে লোকজন বিশ্বাস করতো রোগের নিজের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা আছে, সে কুফুরি বিশ্বাসকে রোধ করার জন্য। আর দ্বিতীয় পযায়ের হাদীসগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলা যে মেলামেশাকে সংক্রমণের কারণ বানিয়ে দেন, তা থেকে সতর্ক থাকার জন্য। কিন্তু ইবনে হাজার রহ. এ ব্যখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তাঁর মতে এই ব্যাখ্যা সংক্রমণকে মো্টের উপর স্বীকার করে নেওয়া হয়। অথচ, হাদীসে পরিস্কার এসেছে সংক্রমণ বলতে কিছু নেই। সুতরাং একে তার আপন জায়গায় বহাল রাখতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে সংক্রমণ বলতে কিছু নেই। আর, দূরে থাকার পরামর্শ যে হাদীসগুলোতে দেওয়া হয়েছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে মানুষের বিশ্বাস যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ, দেখা গেল আক্রান্ত লোকের কাছে যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও ক্ষমতাবলেই তার সে রোগ হলো, তখন সে বিশ্বাস করে বসতে পারে, মেলামেশার কারণে রোগটি নিজ ক্ষমতাবলে তার গায়ে ছড়িয়েছে। এ বিশ্বাস তো সঠিক নয়। তাই বলা হয়েছে আগে থেকেই দূরে দূরে থাকো, যেন মনের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরীর সুযোগ সৃষ্টি না হয়। (পৃষ্ঠ ২৯২)

সে যাই হোক, মন্তব্য দু’দিকেই রয়েছে। বাকি মুসলমানমাত্রই এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই যে, আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও শক্তি ছাড়া সামান্য কিছুও ঘ্টতে পারে না। ধারালো কোন অস্ত্র দিয়ে সরাসরি গর্দানে কোপ বসালেও কাটতে হলে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও শক্তির প্রয়োজন হবে। সুতরাং, ভাইরাস যত বড় শক্তিশালীই হোক, সে নিজ শক্তিতে সংক্রমিত হতে পারে না। তবে, আল্লাহ তাআলা আপন ইচ্ছা ও শক্তিতে এই পৃথিবীটা ছোট-বড় নানা নিয়মের ভিত্তিতে পরিচালনা করেন। এই নিয়মের অর্থ হলো একই সূত্রে একটা জিনিস প্রায়শ সংঘটিত হওয়া। ফলে, এই সূত্রে ঘ্টনাটি ঘটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি না-ঘটাও একান্ত সম্ভব। সুতরাং কোন কিছুর ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতায় যদি দেখা যায় যে এটি সংক্রমিত হয়, তাহলে মুমিন হিসেবে আমাদের জন্য উচিত হবে ‘এই জিনিসের নিজের মধ্যে ছড়ানোর শক্তি নাই, ছড়ানোর শক্তি একমাত্র আল্লাহ তাআলার’—এই বিশ্বাসকে সুদৃঢ় রেখে সতর্কতা অবলম্বন করে চলা। এই পরিচ্ছেদের শুরুতে ইবনে হাজার রহ. ইবনে হাজার রহ. হযরত উমর রা. এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি সংক্ষেপে বলেই রচনার ইতি টানছি।

ইবনে আব্বাস রা. বলছেন, একবার উমর রা. শামের দিকে রওয়ানা করলেন। যখন সার্গ এলাকায় পৌঁছুলেন, তখন সমর সেনাপতি গণ—আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ ও তার সঙ্গীগণ—তার সাথে দেখা সাক্ষাত করলেন। তারা জানালেন, শামে মহামারি দেখা দিয়েছে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, তখন উমর ইবনুল খাত্তাব আমাকে প্রথম সারির মুহাজিরদেরকে ডেকে আনতে বললেন। আমি নিয়ে এলাম। তিনি তাদের সাথে পরামর্শ করলেন শামে ঢুকবেন কি না। তারা নিজেরা এ ব্যাপারে একমত হতে পারলেন না। কেউ বললেন, আপনি একটা উদ্দেশ্য নিয়ে বের হয়েছেন, সুতরাং ফিরে যাওয়া উচিত হবে না। আবার কেউ বললেন, আপনার সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামের অবশিষ্ট সাহাবাগণ রয়েছেন। আমরা মনে করি তাদেরকে নিয়ে এই দুর্যোগের ভেতর প্রবেশ না করা ভালো। এরপর উমর রা. আনসার সাহাবাগণকে ডাকলেন। তারাও একক কোন পরামর্শ দিলেন না। এরপর তিনি কুরাইশ গোত্রের প্রবীন বয়স্ক লোকদের সম্মিলিত পরামর্শ মুতাবেক ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

সে সময় আবু উবাইদা রা. বললেন, আপনি কি তাকদীর থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন? উমর রা. জবাবে বললেন, হ্যাঁ, আমরা এক তাকদীর থেকে অন্য তাকদীরের দিকে যাচ্ছি। এরপর তিনি একটা উদাহরণ দিয়ে বললেন, ধরো তোমার অনেকগুলো উট রয়েছে। এগুলোকে নিয়ে তুমি একটা উপত্যকায় গেলে। উপত্যাকাটিতে দুইটি প্রান্ত রয়েছে। একটিতে ভালো ঘাস আছে এবং অপরটি ঘাসশূন্য। এখন তুমি যদি উটগুলোকে ঘাসের ভূমিতে চড়াও, তাহলে কি আল্লাহ তাআলার তাকদীর অনুযায়ী চড়াবে না? এমনিভাবে যদি ঘাসশূন্য ভূমিতে চড়াও, তাহলেও কি তাঁর তাকদীর অনুযায়ীই চড়াবে না? এমন সময় আবদুর রহমান ইবনে আউফ এসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীস শুনালেন : তোমাদের কেউ যখন কোন এলাকায় মহামারির সংবাদ শুনে, তাহলে সে যেন সে এলাকায় প্রবেশ না করে। এবং সে যে এলাকায় আছে, তাতে যদি এ জিনিস দেখা দেয়, তাহলে সে যেন তা থেকে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের না হয়। হাদীসটি সহীহ বুখারী মুসলিমসহ অনেক সংকলনের মধ্যে রয়েছে। (পৃষ্ঠা ২৪২)

আগের সংবাদমহামারী নিয়ন্ত্রণ : ইসলামী নির্দেশনা
পরবর্তি সংবাদজারিফ মহামারী : মৃত্যুদায়গ্রস্থ বসরা শহর